বহুরূপী

Table of Contents

লেখক-পরিচিতি

বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান নাম সুবোধ ঘোষের জন্ম ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বর, বিহারের হাজারিবাগে। আদি নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুর মহকুমার বহর গ্রামে। হাজারিবাগের সেন্ট কলম্বাস কলেজে পড়াশোনা করেছেন।

তাঁর কর্মজীবন ছিল অসাধারণ বর্ণময়। বাসের কন্ডাক্টর, টিউটর, ট্রাক ড্রাইভার, এমনকি সার্কাস পার্টিতে ক্লাউনের ভূমিকা পর্যন্ত — বহু পেশায় তাঁকে যেতে হয়েছে। এই বিচিত্র জীবনের অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে অসামান্য সমৃদ্ধি ও মানবিক গভীরতা। ত্রিশ দশকের শেষ থেকে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা‘-র রবিবাসরীয় বিভাগের সহকারী হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর হয়েছিলেন।

‘অনামী সঙ্ঘ’ নামের তরুণ সাহিত্যিকদের বৈঠকে বন্ধুদের অনুরোধে একইসঙ্গে দুটি গল্প লেখেন — ‘অযান্ত্রিক’ এবং ‘ফসিল’ — যা বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ আলোড়ন তৈরি করে। ‘অযান্ত্রিক’ তাঁর প্রথম গল্প। উল্লেখযোগ্য অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘পরশুরামের কুঠার’, ‘শুক্রাভিসার’, ‘ফসিল’, ‘তিলাঞ্জলি’, ‘গঙ্গোত্রী’, ‘একটি নমস্কারে’, ‘রিয়ামা’, ‘ভারত প্রেমকথা’, ‘জতুগৃহ’, ‘কিংবদন্তীর দেশে’, ‘ভারতীয় ফৌজের ইতিহাস’, ‘ক্যাকটাস’ প্রভৃতি।

ছোটোগল্পের পাশাপাশি তিনি বহু উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিণী’ স্বর্ণপদক এবং ‘আনন্দ পুরস্কার’ তাঁর পাওয়া উল্লেখযোগ্য সম্মান। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ তাঁর জীবনাবসান ঘটে।


রচনার উৎস ও পটভূমি

শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না
শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না

‘বহুরূপী’ গল্পটি সুবোধ ঘোষের ‘গল্পসমগ্র’-এর তৃতীয় খণ্ড থেকে সংগৃহীত। গল্পটির পটভূমি একটি বাংলা শহরের সবচেয়ে সরু গলি, যেখানে ছোট্ট ঘরে বাস করেন এক দরিদ্র বহুরূপী।

‘বহুরূপী’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ — যে বহু রূপ ধারণ করতে পারে। গল্পের মূল চরিত্র হরিদা এই বহুরূপী পেশার মানুষ। তিনি কখনো পাগল, কখনো কাপালিক, কখনো বৃদ্ধ কাবুলিওয়ালা, কখনো হাট-কোট-প্যান্টলুন-পরা ফিরিঙ্গি কেরামিন সাহেব — বিভিন্ন রূপে ছদ্মবেশ ধরে সামান্য পয়সা রোজগার করেন।

গল্পটির মূল বিষয় হল এই হরিদার জীবনের সবচেয়ে বড়ো বহুরূপী-সাজের অভিজ্ঞতা — ধনী জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সন্ন্যাসীর ভূমিকায় অভিনয়। এই অভিনয়ে সে একশো এক টাকার প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে নিজের শিল্পীসত্তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখে — আর সেইসঙ্গে গল্পটি হয়ে ওঠে একজন প্রকৃত শিল্পীর নিষ্ঠা ও আত্মমর্যাদার মর্মস্পর্শী আখ্যান।


পাঠ-সারসংক্ষেপ

প্রথম ভাগ: হরিদার পরিচয় ও জীবন

শহরের সবচেয়ে সরু গলির ভিতরে ছোট্ট একটি ঘরে বাস করেন হরিদা। এই ঘরটিই তাঁর জীবনের ঘর, আর কথক ও তাঁর বন্ধুদের সকাল-সন্ধ্যার আড্ডার জায়গা। চা-চিনি-দুধ কথকরাই নিয়ে আসেন, হরিদা শুধু উনানের আগুনে জল ফোটান। সত্যিই — হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেকসময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না। অর্থাৎ হরিদা অত্যন্ত গরিব।

তবু হরিদার জীবনে একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে। কোনো অফিসের চাকরি বা দোকানের বিক্রয়কারীর কাজ — ঘড়ির কাঁটা সামনে বেঁধে দিয়ে নিয়মের মধ্যে রোজ একটা কাজ করতে যাওয়া — হরিদার জীবনের পছন্দ নয়।

বরং মাঝে মাঝে বহুরূপী সেজে তিনি বেরিয়ে পড়েন, মানুষকে আনন্দ দেন, কিছু পয়সা রোজগার করেন। কখনো বাউল, কখনো কাপালিক, কখনো বৃদ্ধ কাবুলিওয়ালা, কখনো হাট-কোট-প্যান্টলুন-পরা ফিরিঙ্গি কেরামিন সাহেব — যে-কোনো সাজেই তিনি মানুষকে অবাক করে দিতে পারেন।

একবার তিনি পুলিশ সেজে দয়ালবাবুর লিচু বাগানের ভেতরে দাঁড়িয়েছিলেন। ভয়ে কেঁদে ফেলেছিল ছেলেগুলো। স্কুলের মাস্টারমশাই এসে ক্ষমা চেয়েছিলেন। পরে মাস্টারমশাই আট আনা নিয়ে তখন তাঁর অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন সেই নকল-পুলিশ হরিদা। পরদিন মাস্টারমশাই জেনেছিলেন কাকে আট আনা ঘুষ দিয়েছেন — কিন্তু তিনি একটুও রাগ করেননি, বরং প্রশংসা করলেন: সত্যিই খুব চমৎকার পুলিশ সেজেছিল হরি!

একবার বাইজির ছদ্মবেশে হরিদার রোজগার হয়েছিল আট টাকা দশ আনা। একটা পাগলের ভূমিকায় বাসের দিকে ছুটে গেলে বাসের ড্রাইভার কাশীনাথ ধমক দিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় ভাগ: সন্ন্যাসীর গল্প ও হরিদার পরিকল্পনা

একদিন আড্ডায় কথক ও বন্ধুরা হরিদাকে শোনায় জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা এক অসাধারণ সন্ন্যাসীর কথা। সাতদিন ধরে জগদীশবাবুর বাড়িতে ছিলেন এই সন্ন্যাসী — হিমালয়ের গুহায় থাকেন, সারা বছরে মাত্র একটি হরীতকী খান, এছাড়া আর কিছু খান না। সন্ন্যাসীর বয়সও নাকি হাজার বছরের বেশি বলে অনেকে মনে করেন। জগদীশবাবু তাঁর পায়ের ধুলো পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন — কারণ সে ধুলো ছিল ‘সে ভয়ানক দুর্লভ জিনিস’।

জগদীশবাবু ধনী কিন্তু কৃপণ মানুষ। তবু সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো পাওয়ার জন্য তিনি একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ে ধরলেন — বাধ্য হয়ে সন্ন্যাসী পা এগিয়ে দিলেন, নতুন খড়ম পরলেন আর সেই ফাঁকে জগদীশবাবু পায়ের ধুলো নিলেন। বিদায় দেওয়ার সময় জগদীশবাবু একশো টাকার একটি নোট জোর করে সন্ন্যাসীর ঝোলার ভেতরে ফেলে দিলেন। সন্ন্যাসী হাসলেন আর চলে গেলেন।

এই গল্প শুনে হরিদা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলেন — খুব গভীর হয়ে গেলেন তিনি। কথকরা বুঝতে পারেন, হরিদার মাথায় নতুন কোনো মতলব চটফট করছে। হরিদা তাদের বললেন — আজ সন্ধ্যায় জগদীশবাবুর বাড়িতে একটা জবর খেলা দেখাবেন।

তৃতীয় ভাগ: বিরাগীর আগমন — বিস্ময়কর সন্ধ্যা

সেই সন্ধ্যাটা ছিল অসাধারণ — চারদিকে চাঁদের মিষ্ণ, শান্ত উজ্জ্বলতা, ফুরফুরে বাতাস। জগদীশবাবুর বাড়ির বারান্দায় একটি চেয়ারে বসে আছেন জগদীশবাবু — সাদা চুল, সাদা দাড়ি, সৌম্য, শান্ত ও জ্ঞানী মানুষ।

হঠাৎ বারান্দার সিঁড়ির দিকে দুই বিস্ফারিত চোখে অপলক হয়ে গেলেন জগদীশবাবু। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছেন এক আগন্তুক — আদড় গা, তার উপর ধবধবে সাদা উত্তরীয়, পরনে ছোটো বহরের সাদা থান। মাথায় কুরকুর করে উড়ছে শুকনো সাদা চুল। ধুলো মাখা পা, হাতে একটি ঝোলা, সে ঝোলার ভিতরে শুধু একটা বই — গীতা। কোনো জটাজূটধারী সন্ন্যাস নয়, হাতে কমণ্ডলু নেই, চিমটে নেই, গৈরিক আসনও নেই।

এই আগন্তুক মানুষটি যেন এই জগতের সীমার ওপার থেকে হেঁটে হেঁটে চলে এসেছেন। শীর্ণ শরীরটাকে প্রায় অশরীরী মনে হয়। কী অদ্ভুত উদাত্ত, শান্ত ও উজ্জ্বল দৃষ্টি!

উঠে দাঁড়ালেন জগদীশবাবু — ‘আসুন।’

আগন্তুক হাসলেন — ‘আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়ো?’

জগদীশবাবু কিছু ভেবে বললেন — ‘কেন? কেন আপনি একথা বললেন মহারাজ?’

বিরাগী বললেন — ‘আমি মহারাজ নই, আমি এই সৃষ্টির মধ্যে এককণা ধুলি। কিন্তু আপনি বোধহয় এগারো লক্ষ টাকার সম্পত্তির অহংকারে নিজেকে ভগবানের চেয়েও বড়ো বলে মনে করেন। তাই ওখানেই দাঁড়িয়ে আছেন, নেমে আসতে পারছেন না।’

সেই মুহূর্তেই সিঁড়ি ধরে নেমে আসেন জগদীশবাবু — ‘আমার অপরাধ হয়েছে। আপনি রাগ করবেন না।’

চতুর্থ ভাগ: বিরাগীর দর্শন ও অর্থ প্রত্যাখ্যান

জগদীশবাবু বিরাগীকে কয়েকদিন থাকার অনুরোধ করেন। বিরাগী বলেন — ‘বাইরের খোলা আকাশ থাকতে আর ধরিত্রীর মাটিতে স্থান থাকতে, আমি এক বিষয়ীর দালান বাড়ির ঘরে থাকব কেন, বলতে পারেন?’

জগদীশবাবু ঠান্ডা জল চাইলে বিরাগী সে জল খেলেন না। ‘এদিকে ভবেতোষ আমার কানের কাছে ফিসফিস করে — না, হিরদা নয়। হতেই পারে না।’ এভাবে পাঠক বুঝতে পারে বিরাগী আসলে হরিদা।

বিরাগী জগদীশবাবুকে জীবনের অর্থ বোঝান — ‘পরম সুখ কাকে বলে জানেন? সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া।’ ‘ধন জন যৌবন কিছুই নয় জগদীশবাবু। ওসব হলো সুন্দর সুন্দর এক-একটি বন্ধন।’

এরপর জগদীশবাবু একটি থালি এনে প্রণামী হিসেবে একশো এক টাকা বিরাগীর পায়ের কাছে রেখে বলেন — ‘এই প্রণামী, এই সামান্য একশো এক টাকা গ্রহণ করে আমাকে শান্তি দান করুন বিরাগীজি। আপনার তীর্থ ভ্রমণের জন্য এই টাকা আমি দিলাম।’

বিরাগী হাসেন — ‘আমার বুকের ভিতরেই যে সব তীর্থ। ভ্রমণ করে দেখবার তো কোনো দরকার হয় না।’

সিঁড়ির উপর অচলভাবে একটা মিনিট দাঁড়িয়ে রইলেন বিরাগী। তারপর বলে উঠলেন বিদায়ের কথা — ‘আমি যেমন অনায়াসে ধুলো মাড়িয়ে চলে যেতে পারি, তেমনই অনায়াসে সোনাও মাড়িয়ে চলে যেতে পারি।’

বলতে বলতে সিঁড়ি থেকে নেমে গেলেন বিরাগী। একশো এক টাকার থলিটা সিঁড়ির উপরেই পড়ে রইল। সেদিকে ফিরেও একবার তাকালেন না বিরাগী।

পঞ্চম ভাগ: হরিদার স্বীকারোক্তি ও গল্পের তাৎপর্য

পরে কথক ও বন্ধুরা হরিদার কাছে এসে জানতে পারে এই অসাধারণ অভিনয়ের কথা। অনাদি বলে — ‘কী আশ্চর্য! চমকে ওঠে ভবেতোষ — হিরদা, আপনি তাহলে সত্যিই বের হয়েছিলেন! আপনিই বিরাগী?’

হরিদা হাসেন — ‘হ্যাঁ রে ভাই।’

অনাদি বলে — ‘এটা কী কাণ্ড করলেন হরিদা? জগদীশবাবু তো অত টাকা সাধলেন, অথচ আপনি একেবারে খাঁটি সন্ন্যাসীর মতো সব তুচ্ছ করে সরে পড়লেন?’

হরিদা বলেন — ‘কী করব বল? ইচ্ছেই হলো না। শত হোক… শত হোক, একজন বিরাগী সন্ন্যাসী হয়ে টাকা-ফাকা কী করে স্পর্শ করি বল? তাতে যে আমার চরিত্রের ঢং নষ্ট হয়ে যায়।

এরপর ভবেতোষ জিজ্ঞেস করে — তাহলে কি আর কখনো জগদীশবাবুর কাছে যাবেন না?

হরিদা চেঁচিয়ে হেসে ওঠেন — ‘যাবই তো। না গিয়ে উপায় কী? গিয়ে অন্তত বকশিশটা তো দাবি করতে হবে?’

‘বকশিশ?’ চেঁচিয়ে ওঠে ভবেতোষ। ‘সেটা তো বড়োজোর আট আনা কিংবা দশ আনা।’

হরিদা বিড়ি মুখে দিয়ে লজ্জিতভাবে হাসেন — ‘কী আর করা যাবে বল? খাঁটি মানুষ তো নয়, এই বহুরূপীর জীবন এর বেশি কী আশা করতে পারে?’

এই শেষ উক্তির মধ্যে হরিদার জীবনের করুণ বাস্তবতা এবং একজন প্রকৃত শিল্পীর মর্মবেদনা দুটোই মিশে আছে।


বিশেষ শব্দার্থ,বহুরূপী প্রশ্ন উত্তর

বহুরূপী প্রশ্ন উত্তর
বহুরূপীর খেলা
শব্দঅর্থ
দুর্লভযা সহজে লাভ করা যায় না
খড়মকাঠের জুতো
আঁচআগুনের তাপ
কাপালিকতান্ত্রিক সন্ন্যাসী বিশেষ
কমণ্ডলুসন্ন্যাসীদের ব্যবহৃত মাটি বা কাঠের বা ধাতুর তৈরি পাত্রবিশেষ
রিপুকাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য — এই ছয়টি
পরমার্থঅন্তর্যামী, পরম সত্য
অদৃষ্টভাগ্য, নিয়তি
বিরাগীযে সংসারের বিষয়-আশয় থেকে মুক্ত, বৈরাগ্যসম্পন্ন
উত্তরীয়চাদর, উপরে গায়ে দেওয়ার কাপড়
পরমার্থঅন্তর্যামী
প্রণামীপ্রণাম করার সময় অর্পিত অর্থ বা উপহার


প্রশ্নোত্তর

ক · বহুরূপী প্রশ্ন উত্তর: অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান: ১)

বিরাগীর আগমন
বিরাগীর আগমন

১. ‘বহুরূপী’ গল্পটি কোথা থেকে সংগৃহীত?

উত্তর: গল্পটি সুবোধ ঘোষের ‘গল্পসমগ্র’-এর তৃতীয় খণ্ড থেকে সংগৃহীত।

২. সুবোধ ঘোষের প্রথম গল্পের নাম কী?

উত্তর: সুবোধ ঘোষের প্রথম গল্পের নাম ‘অযান্ত্রিক’।

৩. হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেকসময় কী হয়?

উত্তর: হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেকসময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না।

৪. হরিদা কোথায় বাস করেন?

উত্তর: হরিদা শহরের সবচেয়ে সরু গলির ভেতরে একটি ছোট্ট ঘরে বাস করেন।

৫. পাগল সেজে হরিদাকে কে ধমক দিয়েছিল?

উত্তর: বাসের ড্রাইভার কাশীনাথ পাগল সেজে বাসের দিকে ছুটে যাওয়া হরিদাকে ধমক দিয়েছিল।

৬. বাইজির ছদ্মবেশে হরিদার মোট রোজগার কত হয়েছিল?

উত্তর: বাইজির ছদ্মবেশে হরিদার মোট রোজগার হয়েছিল আট টাকা দশ আনা।

৭. জগদীশবাবুকে দেখতে কেমন ছিল?

উত্তর: জগদীশবাবুর ছিল সাদা চুল ও সাদা দাড়ি। তিনি ছিলেন সৌম্য, শান্ত ও জ্ঞানী মানুষ।

৮. সন্ন্যাসী জগদীশবাবুর বাড়িতে কতদিন ছিলেন?

উত্তর: সন্ন্যাসী জগদীশবাবুর বাড়িতে সাতদিন ছিলেন।

৯. সন্ন্যাসী সারাবছরে কী খেতেন?

উত্তর: সন্ন্যাসী সারাবছরে মাত্র একটি হরীতকী খেতেন, এ ছাড়া আর কিছু খেতেন না।

১০. ‘সে ভয়ানক দুর্লভ জিনিস’ — ‘দুর্লভ’ জিনিসটি কী?

উত্তর: ‘দুর্লভ’ জিনিসটি হল হিমালয় থেকে আসা সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো।

১১. জগদীশবাবু কীভাবে সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো সংগ্রহ করেছিলেন?

উত্তর: জগদীশবাবু একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরলেন। সন্ন্যাসী নতুন খড়ম পরলে সেই ফাঁকে জগদীশবাবু তাঁর পায়ের ধুলো নিলেন।

১২. বিদায় নেওয়ার সময় জগদীশবাবু সন্ন্যাসীকে কত টাকা দিয়েছিলেন?

উত্তর: বিদায় নেওয়ার সময় জগদীশবাবু সন্ন্যাসীর ঝোলার ভেতরে একশো টাকার একটি নোট জোর করে ফেলে দিয়েছিলেন।

১৩. যেদিন হরিদা বিরাগী সেজে গিয়েছিলেন সেদিনের সন্ধ্যাটা কেমন ছিল? উত্তর: সেদিনের সন্ধ্যাটা ছিল অসাধারণ — চাঁদের মিষ্ণ ও শান্ত উজ্জ্বলতা, ফুরফুরে বাতাস বইছিল; জগদীশবাবুর বাড়ির বাগানের গাছের পাতাগুলো ঝিরিঝিরি শব্দ করে কিছু যেন বলতে চাইছিল।

১৪. হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশবাবুকে কী প্রশ্ন করেছিলেন? উত্তর: হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশবাবুকে প্রশ্ন করেছিলেন — ‘আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়ো?’

১৫. জগদীশবাবু বিরাগীকে প্রণামী হিসেবে কত টাকা দিতে চেয়েছিলেন?

উত্তর: জগদীশবাবু বিরাগীকে প্রণামী হিসেবে একশো এক টাকা দিতে চেয়েছিলেন।

১৬. ‘পরম সুখ কাকে বলে জানেন?’ — বিরাগী পরম সুখের কী সংজ্ঞা দিয়েছিলেন?

উত্তর: বিরাগী পরম সুখের সংজ্ঞা দিয়েছিলেন — ‘সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া।’

১৭. হরিদা অর্থ নেননি কেন?

উত্তর: হরিদা বলেছেন — বিরাগী সন্ন্যাসীর ভূমিকায় টাকা স্পর্শ করলে তাঁর চরিত্রের ঢং নষ্ট হয়ে যেত, তাই তিনি অর্থ নেননি।

১৮. বিরাগী চলে যাওয়ার পর টাকার থলিটা কোথায় পড়ে রইল?

উত্তর: বিরাগী চলে যাওয়ার পর একশো এক টাকার থলিটা সিঁড়ির উপরেই পড়ে রইল; তিনি সেদিকে ফিরেও তাকালেন না।


খ · সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান: ৩)

চরিত্রের মর্যাদা
চরিত্রের মর্যাদা

১. ‘জগদীশবাবু ছাড়া আর কাউকে তিনি পায়ের ধুলো নিতে দেননি।’ — জগদীশবাবু কীভাবে সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন? এই ঘটনাকে হরিদা ‘বেশ মজার ব্যাপার’ বলেছেন কেন?

উত্তর: সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা সন্ন্যাসী তাঁর পায়ের ধুলো কাউকে নিতে দিতেন না। কিন্তু জগদীশবাবু এক বুদ্ধিমান কৌশলে সে ধুলো সংগ্রহ করেছিলেন।

সন্ন্যাসী বিদায় নিতে যাওয়ার সময় জগদীশবাবু একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরলেন। সন্ন্যাসী বাধ্য হয়ে পা এগিয়ে দিলেন, নতুন খড়ম পরলেন। আর সেই ফাঁকেই জগদীশবাবু সন্ন্যাসীর পুরনো পায়ের ধুলো নিলেন।

এই ঘটনাকে হরিদা ‘মজার ব্যাপার’ বলেছেন কারণ পুরো ঘটনাটাই একটা চতুর কৌশলের ফল। জগদীশবাবু একজন কৃপণ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও পায়ের ধুলো পাওয়ার লোভে সোনার বোল লাগানো খড়ম উপহার দিলেন এবং সন্ন্যাসীকে না জানিয়েই কৌশলে ধুলো নিলেন — এই পুরো ব্যাপারটা বহুরূপী হরিদার চোখে মজাদার লেগেছে।


২. ‘এক সন্ন্যাসী এসে জগদীশবাবুর বাড়িতে ছিলেন’ — সন্ন্যাসীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

উত্তর: সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা সন্ন্যাসী ছিলেন অত্যন্ত উঁচু দরের মানুষ। তিনি হিমালয়ের গুহায় বাস করতেন এবং সারা বছরে মাত্র একটি হরীতকী খেতেন; এছাড়া আর কোনো আহার গ্রহণ করতেন না। সন্ন্যাসীর বয়স নাকি হাজার বছরেরও বেশি বলে অনেকে মনে করতেন।

এই অসাধারণ সন্ন্যাসী সাতদিন জগদীশবাবুর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কাউকে তাঁর পায়ের ধুলো নিতে দিতেন না। বিদায়ের সময় জগদীশবাবুর এক বিশেষ কৌশলে বাধ্য হয়ে পা এগিয়ে দিলে ওই একটি সুযোগেই জগদীশবাবু তাঁর পায়ের ধুলো সংগ্রহ করেছিলেন। সেই দুর্লভ পায়ের ধুলোর কথা কথক ও তাঁর বন্ধুরা হরিদাকে জানালে হরিদা গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন।


৩. ‘গল্প শুনে খুব গভীর হয়ে গেলেন হরিদা।’ — গল্পটি কী ছিল? হরিদার গভীর হয়ে যাওয়ার কারণ কী?

উত্তর: সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে কথক ও তাঁর বন্ধুরা হরিদাকে জগদীশবাবুর বাড়িতে হিমালয় থেকে আসা এক সন্ন্যাসীর কথা জানান। সেই সন্ন্যাসী সারাবছর একটি মাত্র হরীতকী খেয়ে হিমালয়ের গুহায় থাকতেন, তাঁর বয়স হাজার বছরেরও বেশি। জগদীশবাবু অনেক কষ্টে তাঁর পায়ের ধুলো পেয়েছিলেন এবং বিদায়ের সময় তাঁর ঝোলায় একশো টাকা ভরে দিয়েছিলেন।

এই গল্প শুনে হরিদা গভীর হয়ে গেলেন কারণ তাঁর মাথায় তখনই একটি নতুন পরিকল্পনা আসে। তিনি ভেবে ফেলেন, জগদীশবাবু ধনভক্তির সুযোগে একজন ধর্মভীরু মানুষকে সহজেই ঠকাতে পারেন — যদি তিনি বিরাগী সন্ন্যাসীর বেশে সেখানে যান, তাহলে মোটা টাকা পেতে পারেন। একজন দরিদ্র বহুরূপীর এই পরিকল্পনাটাই তাঁকে গভীর করে দিয়েছিল। যদিও শেষপর্যন্ত হরিদার শিল্পীসত্তা ও চরিত্রনিষ্ঠা সেই লোভকে জয় করে।


৪. বিরাগী রূপে হরিদার বেশ-বর্ণনা দাও।

উত্তর: সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদা যখন বিরাগীর বেশে জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হন, তাঁর বর্ণনা অসাধারণ।

আদড় গা — তার উপর একটি ধবধবে সাদা উত্তরীয়। পরনে ছোটো বহরের একটি সাদা থান। মাথায় কুরকুর করে উড়ছে শুকনো সাদা চুল। পায়ে ধুলো মাখা — কোনো খড়ম বা জুতো নেই। হাতে একটি ঝোলা, সেই ঝোলার ভেতরে একটিমাত্র বই — গীতা।

কোনো জটাজূটধারী সন্ন্যাস নয়, হাতে কমণ্ডলু বা চিমটে নেই, মৃগচর্মের আসনও সঙ্গে নেই, গৈরিক সাজও নেই। তবু এই আগন্তুক মানুষটিকে দেখে মনে হয় যেন তিনি এই জগতের সীমার ওপার থেকে হেঁটে হেঁটে চলে এসেছেন। শীর্ণ শরীরটাকে প্রায় অশরীরী মনে হয়। চোখে এক অদ্ভুত উদাত্ত, শান্ত ও উজ্জ্বল দৃষ্টি।


৫. ‘তাতে যে আমার চরিত্রের ঢং নষ্ট হয়ে যায়’ — উক্তিটির মাধ্যমে হরিদা কোন সত্যের ইঙ্গিত করেছেন?

উত্তর: সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে বিরাগী বেশে হরিদা জগদীশবাবুর কাছ থেকে একশো এক টাকা প্রত্যাখ্যান করেন। বন্ধুরা অবাক হলে হরিদা বলেন — বিরাগী সন্ন্যাসী হয়ে টাকা স্পর্শ করলে তাঁর চরিত্রের ঢং নষ্ট হয়ে যেত।

এই উক্তির মধ্যে একজন প্রকৃত শিল্পীর গভীর সততা লুকিয়ে আছে। হরিদা বিরাগীর ভূমিকা নিয়েছিলেন ভালোবেসে, শিল্পীর দায়িত্ববোধ থেকে। বিরাগী সন্ন্যাসী সবকিছু ত্যাগ করেছেন — তাঁর চরিত্রের মূল কথাই হল অনাসক্তি ও বৈরাগ্য। টাকা নিলে সেই চরিত্রের সততা নষ্ট হত — এটি হরিদা মেনে নিতে পারেননি।

অর্থাৎ, হরিদা ইঙ্গিত করেছেন যে একজন শিল্পী তাঁর শিল্পের সঙ্গে কখনো আপস করেন না। দারিদ্র্য সত্ত্বেও তিনি অর্থের জন্য তাঁর চরিত্রের মর্যাদা বিকিয়ে দেননি। এখানেই হরিদা সত্যিকারের বহুরূপী — শুধু বাইরের রূপ বদলান না, ভেতর থেকেও সেই চরিত্রকে অনুভব করেন। এটিই একজন প্রকৃত শিল্পীর লক্ষণ।


গ · বহুরূপী প্রশ্ন উত্তর: ব্যাখ্যাধর্মী / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান: ৫)

১. হরিদার চরিত্রটি আলোচনা করো। (৫)

উত্তর: সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা — একজন দরিদ্র শহুরে বহুরূপী, যাঁর জীবন ও ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত বহুস্তরীয়।

দারিদ্র্য ও স্বাধীনচেতা মনোভাব: হরিদা শহরের সবচেয়ে সরু গলিতে ছোট্ট ঘরে একা থাকেন। উনানের হাঁড়িতে অনেকসময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না — এটাই তাঁর জীবনের বাস্তব ছবি। তবু তিনি ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা চাকরি বা দোকানের কাজ করতে রাজি নন। বন্ধন-মুক্ত জীবন তাঁর পছন্দ।

শিল্পীসত্তা ও অভিনয়প্রতিভা: হরিদার বহুরূপী হওয়ার প্রতিভা অসাধারণ। পাগল, বাউল, কাপালিক, কাবুলিওয়ালা, ফিরিঙ্গি সাহেব, বাইজি — যে কোনো সাজেই তিনি মানুষকে বিস্মিত করে দেন। এমনকি পুলিশ সেজে স্কুলের ছেলেদের ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন।

চরিত্রনিষ্ঠা ও শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা: হরিদার সবচেয়ে উজ্জ্বল গুণ হল শিল্পের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা। বিরাগী বেশে জগদীশবাবুর কাছ থেকে একশো এক টাকা পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই অর্থ প্রত্যাখ্যান করেন — কারণ বিরাগীর ভূমিকায় টাকা নেওয়া তাঁর চরিত্রের ঢং নষ্ট করত। এটি এক বিরল শিল্পীসুলভ সততা।

বিনোদনাত্মক আলোকপাত: হরিদার জীবনে হাস্যরস আছে। বাইজির বেশে রোজগার, পুলিশ সেজে ছেলেদের কাঁদানো, বিরাগী সেজে ধনীকে পরাস্ত করা — এসব ঘটনায় হরিদার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্য স্পষ্ট। কিন্তু সবার শেষে বকশিশের জন্য আবার যাওয়ার কথা বলা — এখানেই তাঁর দারিদ্র্যের বাস্তব ও করুণ সত্যটা ফুটে ওঠে।

সামগ্রিকভাবে হরিদা শুধু অসাধারণ বহুরূপীই নন, তিনি একজন সৎ ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ — যিনি দারিদ্র্যের মাঝেও শিল্পের কাছে সত্য থেকেছেন।


২. ‘গল্প শুনে খুব গভীর হয়ে গেলেন হরিদা।’ — গল্পটি কী ছিল? হরিদার গভীর হয়ে যাওয়ার কারণ কী? সেদিন জগদীশবাবুর বাড়িতে হরিদার বিরাগী-বেশের কী ফলাফল হয়েছিল? (২+৩)

উত্তর: গল্পটির বিষয়: কথক ও বন্ধুরা হরিদাকে জানিয়েছিল যে জগদীশবাবুর বাড়িতে হিমালয়ের গুহা থেকে এক বিরল সন্ন্যাসী এসেছিলেন — সারাবছর মাত্র একটি হরীতকী খান, বয়স হাজার বছরের বেশি। জগদীশবাবু কৌশলে সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন এবং বিদায়ের সময় ঝোলায় একশো টাকা ভরে দিয়েছিলেন।

গভীর হওয়ার কারণ: এই গল্প শুনে হরিদার মাথায় পরিকল্পনা আসে — ধর্মভীরু জগদীশবাবুকে বিরাগীর বেশে ঠকিয়ে মোটা টাকা পাওয়া সম্ভব। দরিদ্র হরিদার পক্ষে এটি একটি বড়ো সুযোগ। তাই তিনি গভীর হয়ে গিয়েছিলেন।

ফলাফল: সেদিনের সুন্দর সন্ধ্যায় হরিদা অসাধারণ বিরাগীর বেশে জগদীশবাবুর বাড়িতে হাজির হন। তাঁর চেহারা ও কথা জগদীশবাবুকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত ও অভিভূত করে ফেলে। জগদীশবাবু একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চাইলে হরিদা তা প্রত্যাখ্যান করে চলে যান। টাকার থলি সিঁড়িতে পড়েই রইল।

বন্ধুরা পরে জিজ্ঞেস করলে হরিদা বলেন — বিরাগী হয়ে টাকা নিলে চরিত্রের ঢং নষ্ট হত। এই প্রত্যাখ্যানের মধ্যেই হরিদার শিল্পীসত্তার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে।


৩. বহুরূপী গল্পটি একজন প্রকৃত শিল্পীর শিল্পনিষ্ঠার গল্প — আলোচনা করো। (৫)

উত্তর: সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ একটি বিশিষ্ট ছোটোগল্প, যার মূলে রয়েছে একজন প্রকৃত শিল্পীর শিল্পনিষ্ঠা ও আত্মমর্যাদার বিষয়।

হরিদা পেশায় একজন বহুরূপী। চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও তিনি ঘড়িবাঁধা চাকরি করতে রাজি নন — শিল্পের স্বাধীনতায় তাঁর বিশ্বাস। তিনি বিভিন্ন চরিত্রে এত নিখুঁতভাবে সেজে বের হন যে চেনা মানুষও তাঁকে চিনতে পারে না।

গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হল বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর কাছ থেকে একশো এক টাকা প্রত্যাখ্যান। দরিদ্র হরিদার কাছে এই টাকা অনেক বড়ো — তবু তিনি নেননি, কারণ বিরাগী সন্ন্যাসী কখনো টাকা স্পর্শ করেন না। টাকা নিলে তাঁর চরিত্রের সাথে প্রতারণা হত।

এখানেই হরিদা একজন প্রকৃত শিল্পীর মতো আচরণ করেছেন। একজন শিল্পী যে চরিত্র রচনা করেন, সে চরিত্রের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা সর্বোচ্চ — সেখানে ব্যক্তিগত লোভ বা সুবিধার জায়গা নেই। হরিদা বলেছেন ‘তাতে যে আমার চরিত্রের ঢং নষ্ট হয়ে যায়’ — এই উক্তিতেই প্রকৃত শিল্পীর সারাৎসার ধরা আছে।

গল্পের শেষে হরিদার আক্ষেপ ‘খাঁটি মানুষ তো নয়, এই বহুরূপীর জীবন এর বেশি কী আশা করতে পারে?’ — এতে একজন শিল্পীর দারিদ্র্য ও সমাজ-অবহেলার বেদনা ফুটে ওঠে। কিন্তু এই বেদনার মধ্যেও তিনি তাঁর শিল্পসত্তার সঙ্গে আপস করেননি। এইভাবেই ‘বহুরূপী’ একজন প্রকৃত শিল্পীর নিষ্ঠা ও মর্যাদার চিরন্তন আখ্যান হয়ে উঠেছে।

হারিয়ে যাওয়া কালি কলম প্রশ্ন উত্তর | শ্রীপান্থ | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর

আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি প্রশ্ন উত্তর

আফ্রিকা কবিতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর

অসুখী একজন প্রশ্ন উত্তর — পাবলো নেরুদা (অনুবাদ: নবারুণ ভট্টাচার্য)

জ্ঞানচক্ষু প্রশ্ন উত্তর — আশাপূর্ণা দেবী

  • বহুরূপী
    লেখক-পরিচিতি বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান নাম সুবোধ ঘোষের জন্ম ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বর, বিহারের হাজারিবাগে। আদি নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুর মহকুমার বহর গ্রামে। হাজারিবাগের সেন্ট কলম্বাস কলেজে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর কর্মজীবন ছিল অসাধারণ বর্ণময়। বাসের কন্ডাক্টর, টিউটর, ট্রাক ড্রাইভার, এমনকি সার্কাস পার্টিতে ক্লাউনের ভূমিকা পর্যন্ত — বহু পেশায় তাঁকে যেতে হয়েছে। এই …

    Read more

  • হারিয়ে যাওয়া কালি কলম প্রশ্ন উত্তর | শ্রীপান্থ | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
    লেখক-পরিচিতি বাংলা সাহিত্য জগতে নিখিল সরকার ‘শ্রীপান্থ’ ছদ্মনামেই অধিক পরিচিত। তাঁর আরেকটি ছদ্মনাম ‘দৌবারিক’। জন্ম ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ১ মে, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর গ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশ)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক হওয়ার পর তরুণ বয়স থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন — প্রথমে ‘যুগান্তর’, পরে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য়। আনন্দবাজারের সোমবারের বিখ্যাত ‘কলকাতার কড়চা’ বিভাগটি দীর্ঘকাল …

    Read more

  • আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি প্রশ্ন উত্তর
    কবি-পরিচিতি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের জন্ম ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের চাঁদপুরে (বর্তমানে বাংলাদেশ)। তাঁর আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ; পৈতৃক ভিটে ছিল বরিশাল জেলার বানারিপাড়া গ্রামে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেন। …

    Read more

  • আফ্রিকা কবিতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
    কবি-পরিচিতি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে, কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে। শৈশব থেকেই সাহিত্যের আবহে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি খুব অল্প বয়স থেকেই ‘ভারতী’ ও ‘বালক’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘হিন্দুমেলার উপহার’, আর প্রথম সার্থক ছোটোগল্প হিসেবে সাহিত্য-সমালোচকেরা ‘দেনাপাওনা’-কে চিহ্নিত করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অজস্র কবিতা, গান, ছোটোগল্প, …

    Read more

  • অসুখী একজন প্রশ্ন উত্তর — পাবলো নেরুদা (অনুবাদ: নবারুণ ভট্টাচার্য)
    কবি পরিচিতি পাবলো নেরুদা ছিলেন চিলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, প্রাবন্ধিক এবং একইসঙ্গে দক্ষ কূটনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদ। ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই তাঁর জন্ম। রাজনৈতিক জীবনে তিনি চিলির বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মানবতা, প্রেম, রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও যুদ্ধবিরোধী চেতনা তাঁর কবিতার মূল সুর। ১৯৫০ সালে আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার এবং ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার …

    Read more

  • জ্ঞানচক্ষু প্রশ্ন উত্তর — আশাপূর্ণা দেবী
    (দশম শ্রেণি, বাংলা — সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর) লেখক পরিচিতি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবীর জন্ম ১৯০৯ সালের ৮ জানুয়ারি, উত্তর কলকাতায়। সেকালের সামাজিক রীতি অনুযায়ী তাঁর প্রথাগত বিদ্যালয়-শিক্ষা লাভের সুযোগ ঘটেনি, বাড়িতেই তাঁর শিক্ষার সূচনা। অথচ এই সীমাবদ্ধতা তাঁকে দমিয়ে রাখেনি— নিজের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, জীবনবোধ আর মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে …

    Read more

  • টাইকো ব্রাহে: যে জ্যোতির্বিদ নাক হারিয়েও আকাশ দেখা থামাননি
    একটু ভাবুন। ১৫৬০ সাল। ডেনমার্কের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে চৌদ্দ বছর বয়সের একটা ছেলে আইন পড়তে বসে আছে। হঠাৎ বাইরে লোকজনের ভিড়। সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে। সূর্যগ্রহণ হচ্ছে। কিন্তু অবাক করা বিষয়টা সূর্যগ্রহণ নয়। অবাক করা বিষয়টা হলো — জ্যোতির্বিদরা আগে থেকেই বলে দিতে পেরেছিলেন ঠিক কখন এই গ্রহণ হবে। নিখুঁতভাবে। এই ছেলেটার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরতে …

    Read more

  • রজার বেকন: মধ্যযুগের অন্ধকারে যে সন্ন্যাসী জ্বালিয়েছিলেন বিজ্ঞানের আলো
    একটু ভাবুন। ত্রয়োদশ শতাব্দী। ইউরোপজুড়ে চার্চের অন্ধকার শাসন। বিজ্ঞানচর্চা মানেই ধর্মের বিরোধিতা। কেউ যদি বলে — “প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করব না” — তাকে পাগল বলা হবে, বিধর্মী বলা হবে। সেই যুগে একজন মানুষ সন্ন্যাসীর পোশাক পরে, হাতে কাচের লেন্স আর বই নিয়ে বললেন — “অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো কিছুই সঠিকভাবে জানা সম্ভব নয়।” এই একটা কথার …

    Read more

  • হ্যানিম্যান: যে ডাক্তার রোগীর যন্ত্রণা দেখে নিজেই ডাক্তারি ছেড়ে দিয়েছিলেন — তারপর বদলে দিয়েছিলেন পুরো চিকিৎসার ধারণাটাই
    একটু ভাবুন। আপনি একজন ডাক্তার। সারাদিন রোগী দেখছেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অস্বস্তি জমছে — কারণ আপনি নিজেই জানেন, আপনি যে চিকিৎসা দিচ্ছেন সেটা রোগীকে সারাচ্ছে না, বরং তাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। রক্তমোক্ষণ, পারদ, জোঁকের ব্যবহার — এই সব “চিকিৎসা” দেখে আপনার বুক ভারী হয়ে আসছে। কী করবেন আপনি? বেশিরভাগ মানুষ হয়তো মুখ বুজে …

    Read more

  • ডিমোক্রিটাস: যে মানুষটা হাসতে হাসতে মহাবিশ্বের রহস্য সমাধান করেছিলেন
    একটা মানুষ, যিনি প্রতিদিন রাস্তায় হাঁটতেন আর মানুষের বোকামি দেখে হাসতেন। প্রতিবেশীরা ভাবত লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই “পাগল” মানুষটাই আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে এমন একটা তত্ত্ব দিয়ে গেছেন, যা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একদম ভিত্তিপ্রস্তর। তাঁর নাম ডিমোক্রিটাস। আবডেরার সেই হাসিখুশি দার্শনিক, যাঁকে ইতিহাস স্মরণ করে “দ্য লাফিং ফিলোসফার” নামে। আজ একটু …

    Read more

  • পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬-২৭: শিক্ষা আর চাকরির ক্ষেত্রে কী কী বদল আসছে, এক নজরে দেখে নিন
    ২২শে জুন, ২০২৬-এ বিধানসভায় পেশ হলো রাজ্যের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট। এবারের ভাবনার কেন্দ্রে আছে “পঞ্চশক্তি” — পাঁচটা স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা। তার মধ্যে দুটো স্তম্ভ সরাসরি ছুঁয়ে যাচ্ছে রাজ্যের ছাত্রছাত্রী আর চাকরিপ্রার্থীদের জীবন — একটা হলো জ্ঞান-শক্তি, অর্থাৎ শিক্ষা ও মানব-মূলধন, আর অন্যটা সেবা-শক্তি, যার অধীনে এসেছে বড় নিয়োগের ঘোষণা। আপনি …

    Read more

  • অ্যারিস্টটল: যে বিজ্ঞানী ২,০০০ বছর ধরে পৃথিবীর চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন
    চীন গ্রিসের এক অসাধারণ বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের জীবন, কাজ এবং অবিনশ্বর উত্তরাধিকারের গল্প কল্পনা করুন — খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর এথেন্স শহর। রাস্তাঘাটে দার্শনিকদের তর্ক, বাজারে বণিকদের কোলাহল, আর সমুদ্রের ধারে জেলেদের নৌকা। সেই পরিবেশে একজন মানুষ প্রতিদিন সকালে লাইসিয়াম নামের বাগানটিতে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর ছাত্রদের পড়াতেন। হাঁটতে হাঁটতে পড়ানোর এই অভ্যাসের জন্যই তাঁর অনুগামীরা পরিচিতি …

    Read more

Leave a Comment