লেখক-পরিচিতি
বাংলা সাহিত্য জগতে নিখিল সরকার ‘শ্রীপান্থ’ ছদ্মনামেই অধিক পরিচিত। তাঁর আরেকটি ছদ্মনাম ‘দৌবারিক’। জন্ম ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ১ মে, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর গ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশ)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক হওয়ার পর তরুণ বয়স থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন — প্রথমে ‘যুগান্তর’, পরে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য়।
আনন্দবাজারের সোমবারের বিখ্যাত ‘কলকাতার কড়চা’ বিভাগটি দীর্ঘকাল তাঁর সম্পাদনায় পরিচিতি পায়। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি কলকাতার সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাস নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘দেবদাসী’, ‘ঠগী’, ‘হারেম’, ‘আজব নগরী’, ‘শ্রীপান্থের কলকাতা’, ‘যখন ছাপাখানা এলো’, ‘মোহন্ত এলোকেশী সখাদ’, ‘কেয়াবাৎ মেয়ে’, ‘মেটিয়াবুরুজের নবাব’, ‘বটতলা’, ‘কলকাতা’ ইত্যাদি। বাংলা মুদ্রণের ইতিহাস-বিষয়ক ‘আ গ্রামার অব দি বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’-এর একটি সাম্প্রতিক সংস্করণের দীর্ঘ ভূমিকাও তিনি লিখেছেন।
‘পুস্তক পর্যালোচনা’ ও ‘কলকাতার কড়চা’ তাঁর কর্মজীবনের বিশেষ উল্লেখযোগ্য কীর্তি। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ আগস্ট তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
হারিয়ে যাওয়া কালি কলম প্রশ্ন উত্তর রচনার উৎস ও পটভূমি

‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধটি শ্রীপান্থের ‘কালি আছে কাগজ নেই, কলম আছে মন নেই’ রচনা থেকে সংকলিত। এই রচনাটি আসলে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধের অংশবিশেষ, যেখানে লেখক কলম ও কালির ঐতিহাসিক যাত্রাপথ অনুসরণ করেছেন — প্রাচীন মিশরের নল-খাগড়া থেকে শুরু করে রোমান স্টাইলাস, মধ্যযুগীয় পালকের কলম, দোয়াত-কালির সাবেকি যুগ, ফাউন্টেন পেনের আবির্ভাব পেরিয়ে আধুনিক ডিজিটাল যুগে কালি-কলমের ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত।
আধুনিক প্রযুক্তি ও কম্পিউটারের দাপটে লেখালেখির ধরন আমূল বদলে যাচ্ছে। হাতে কলম নিয়ে লেখার অভ্যাস, দোয়াতের কালিতে কলম চুবিয়ে লেখার সেই পুরনো দিনের রোমন্থন — এই আক্ষেপ ও স্মৃতিচারণই প্রবন্ধের মূল সুর। কলম শুধু একটি লেখার যন্ত্র নয়, একটি সভ্যতার ধারক — এই উপলব্ধিই রচনাকে ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিলে পরিণত করেছে।
পাঠ-সারসংক্ষেপ ও হারিয়ে যাওয়া কালি কলম প্রশ্ন উত্তর
প্রথম ভাগ: আধুনিক অফিসে কালি-কলমের অনুপস্থিতি
প্রবন্ধের শুরুতেই লেখক তাঁর লেখালেখির অফিসের ছবি দিয়েছেন। বাংলায় একটি কথা চালু ছিল — ‘কালি নেই, কলম নেই, বলে আমি মুনশি’। অর্থাৎ আসল সরঞ্জাম না থেকেও দক্ষ বলে দাবি করার রসিকতা। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেটাই সত্যি হয়ে উঠেছে। অফিসে সবাই লেখক, সকলে লেখালেখির কাজই করেন, কিন্তু কারও সঙ্গে কলম নেই।
সকলের টেবিলে রয়েছে কাচের স্ক্রিন বা পর্দা — কম্পিউটারের মনিটর, আর নীচে টাইপরাইটারের মতো একটি কিবোর্ড। লেখকরা মাঝে মাঝে লেখা থামিয়ে সেই পর্দার দিকে তাকান। এমন পরিবেশে কোনোদিন কলম না নিয়ে গেলে মহা বিপদ — গলা-শুকনো ভাঁতা-মুখ হয়ে বসে থাকতে হয়। কালগুণে আমরাও সেই ‘কালি নেই কলম নেই’-এর যুগে পৌঁছে গেছি।
দ্বিতীয় ভাগ: শৈশবের স্মৃতি — বাঁশের কলম ও ঘরে তৈরি কালি
লেখক গ্রামের ছেলে। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে তাঁর মায়ের প্রজন্মের মানুষেরা রোগা বাঁশের কচি কেটে কলম তৈরি করতেন। মুখ চিরে দেওয়া তখনও শিশুদের কাজ নয়, বড়োদের কাজ। তখন লেখার পাত বলতে কলাপাতা। কাগজের মতো সাইজ করে কেটে তাতে ‘হোম-টাক্স’ (হোমওয়ার্ক) করতেন।
ঘরে কালি তৈরির পদ্ধতি ছিল বেশ জটিল। প্রাচীনরা বলতেন — ‘তিল ত্রিফলা শিমুল ছালা/ছাগ দুধে করি মেলা/লৌহপাতে লোহায় ঘষি/ছিঁড়ে পত্র না ছাড়ে মসি।’ এই ছিল উত্তম কালি তৈরির পুরনো রেসিপি। লেখকদের সহজ পদ্ধতি ছিল বাড়ির রান্নার কাঠের উনুনের তলায় কাঁসার কড়াই রেখে তার তলায় কালো কালি জমানো।
সেই কালি লাউপাতা দিয়ে ঘষে একটা পাথরের বাটিতে রাখা জলে মিলিয়ে নেওয়া হত। উস্তাদরা আরও উন্নত কালি তৈরি করতেন — মাঝে মাঝে আতপ চাল ভেজে পুড়িয়ে তা বেটে মিশিয়ে দিতেন, শেষে একটি খুঁতির গোড়ার দিকটা পুড়িয়ে লাল টকটকে করে সেই জলে ছাঁকা দেওয়া হত। অল্প জল তাই অনেক সময় টগবগ করে ফুটত। তারপর নাকড়ায় ছেঁকে দোয়াতে ঢেলে কালি।
দোয়াত মানে মাটির দোয়াত। এই বাঁশের কলম, মাটির দোয়াত, ঘরে তৈরি কালি আর কলাপাতাই ছিল প্রথম লেখালেখির সরঞ্জাম।
তৃতীয় ভাগ: প্রাচীন লেখার যন্ত্র — নল-খাগড়া, স্টাইলাস ও পালকের কলম
লেখক কল্পনায় ভিন্ন যুগে গিয়ে লিখেছেন, যদি তাঁর জন্ম প্রাচীন মিশরে হত, তবে নীল নদের তীর থেকে নল-খাগড়া ভেঙে, সেটিকে ভোঁতা করে তুলি বানিয়ে লিখতেন। যদি ফিনিশীয় হতেন, বন-প্রান্তর থেকে কুড়িয়ে আনা একটা হাড় হত তাঁর কলম। আর যদি রোম সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হতেন — তাহলেও শ্রেষ্ঠ কারিগররা দিতেন একটা ব্রোঞ্জের শলাকা, যার পোশাকি নাম স্টাইলাস।
এই স্টাইলাস বা ব্রোঞ্জের ধারালো শলাকাই ছিল বিশ্বের জ্ঞান-ঋণ-শলাকা — বাঁশের হোক, নল-খাগড়ার হোক, পাখির পালকের হোক।
পালকের কলম নিয়েও বিস্তারিত বলেছেন লেখক। ইংরেজিতে তার নাম ‘কুইল’। লর্ড কার্জন বাঙালি সাংবাদিকদের গরম গরম ইংরেজি দেখে তাঁদের বলতেন — ‘বাবু কুইল ড্রাইভারস’। সাহেবরা পালকের কলম তৈরির জন্য একটা ছোট্ট যন্ত্রও বের করেছিলেন — পেনসিল সার্পনারের মতো ওই যন্ত্রে পালক ঢুকিয়ে চাপ দিলেই তৈরি হয়ে যেত ধারালো পালকের কলম।
উইলিয়াম জোন্স বা কেরি সাহেবের মুনশিদের ছবিতে দেখা যায় তাঁদের দোয়াতে গোঁজা পালকের কলম।এখন পালকের কলম দেখতে হলে যেতে হবে পুরনো দিনের তৈলচিত্র বা ফোটোগ্রাফে।
চতুর্থ ভাগ: দোয়াত ও তার ঐতিহ্য
লেখক জানাচ্ছেন দোয়াত কত রকমের হতে পারে। কাচের, কাট-গ্লাসের, পোর্সেলিনের, ক্ষেতপাথরের, জেড পাথরের, পিতলের, ব্রোঞ্জের, ভেড়ার শিংয়ের, এমনকি সোনারও। গ্রামে কেউ দু’একটা পাশ দিতে পারলে বুড়ো-বুড়িরা আশীর্বাদ করতেন — ‘বেঁচে থাকো বাছা, তোমার সোনার দোয়াত কলম হোক।’
সোনার দোয়াত যে সত্যিই হত, তা জেনেছিলেন সুভোঠাকুরের বিখ্যাত দোয়াত-সংগ্রহ দেখতে গিয়ে। সুভোঠাকুর হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেজদা হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র ক্ষেত্রনাথ ঠাকুরের পুত্র, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের ভাগিনেয়ের পুত্র। তাঁর কালির দোয়াতের একটা বিশাল সংগ্রহ ছিল। দোয়াতের কথায় সাহিত্য ও ইতিহাসের নানা চরিত্র ভিড় করে আসে — শেক্সপিয়ার, দান্তে, মিল্টন, কালিদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র — এঁদের অমর রচনার জন্ম হয়েছিল দোয়াতের কালিতে।
পঞ্চম ভাগ: ফাউন্টেন পেনের জন্ম ও প্রথম কেনার অভিজ্ঞতা
পালকের কলম ও দোয়াতের এই যুগ শেষ হয় ফাউন্টেন পেনের আগমনে। ফাউন্টেন পেনের আদি নাম ছিল ‘রিজার্ভার পেন’। এই পেনের বিপ্লব এনেছিলেন একজন মার্কিন বিমা-প্রতিনিধি, লুই অ্যাডসন ওয়াটারম্যান (Lewis Edson Waterman)। একবার তিনি একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তিপত্র সই করতে গিয়েছিলেন।
দলিলটিতে কিছুটা লেখা হয়েছে, এমন সময় দোয়াতটি হঠাৎ উপুড় হয়ে পড়ে। ওয়াটারম্যান ছুটলেন কালির সন্ধানে — ফিরে এসে শুনলেন, ইতিমধ্যে আরেকজন এসে সেই ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তিপত্র পাকা করে চলে গেছেন। বিমর্ষ ওয়াটারম্যান তখনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন — এর একটা বিহিত করতেই হবে।
তারপর অনেক ভাবনাচিন্তা করে তিনি তৈরি করলেন ফাউন্টেন পেন। ফাউন্টেন পেনে কালি সঞ্চিত থাকত বলে ফলত সবসময় দোয়াত নিয়ে ঘুরতে হত না। ফাউন্টেন পেন আবিষ্কারের পর সারা বিশ্বে এই পেনেরই প্রচলন শুরু হল।
লেখকের প্রথম ফাউন্টেন পেন কেনার অভিজ্ঞতাটি বেশ মজাদার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেশ কয়েকবছর পরের ঘটনা। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের একটি নামী দোকানে গেছেন ফাউন্টেন পেন কিনবেন বলে। দোকানি জিজ্ঞেস করলেন, কী কলম নিচ্ছেন — পার্কার? শেফার্ড? ওয়াটারম্যান? সোয়ান? পাইলট? দোকানি বুঝতে পারলেন লেখক একেবারেই অনভিজ্ঞ।
তখন দামি কলম না বুঝে অবশেষে তিনি একটি সস্তার জাপানি পাইলট কলম নেওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু দোকানি কলমটা ছুড়ে দিলেন টেবিলের পাশে দাঁড় করানো একটা কাঠের বোর্ডের উপর — ঠিক যেভাবে সার্কাসে কোনো লোককে দাঁড় করিয়ে ছুরি ছুড়ে খেলানো হয়। সার্কাসের খেলায় যেমন লোকটি শেষ পর্যন্ত অক্ষত থাকে, সেই কলমটিও তেমনই অক্ষত রইল।
নিব ঠিক আছে কিনা বোঝাতেই এই পরীক্ষা। সেই জাপানি পাইলটই ছিল লেখকের প্রথম ফাউন্টেন পেন।
ষষ্ঠ ভাগ: লিপিকুশলী ও ক্যালিগ্রাফিস্টের ঐতিহ্য
ছাপাখানা আবিষ্কারের আগে যাঁরা হাতে লিখে বই ও দলিলের প্রতিলিপি তৈরি করতেন, তাঁদের বলা হত লিপিকর বা লিপি-কুশলী (ক্যালিগ্রাফিস্ট)। এই লিপিকরেরাই পুথির প্রতিলিপি তৈরি করতেন, তাঁদের জন্যই কোনো লেখকের গ্রন্থ সহজলভ্য হয়ে উঠতে পারত। মুঘল দরবারে, বিভিন্ন রাজা-জমিদারদের সভায় তাঁদের উচ্চ সম্মান দেওয়া হত, ভরণপোষণের ব্যবস্থা থাকত।
এমনকি সাধারণ গৃহস্থও লিপিকরদের ডেকে পুথি নকল করাতেন। এই প্রবন্ধে লেখক আশ্চর্যের সঙ্গে জানাচ্ছেন — একজন দক্ষ লিপিকরের হস্তাক্ষর ছিল মুক্তোর মতো হস্তাক্ষর, প্রতিটি ছত্র সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন। কিন্তু রোজগার ছিল নিতান্তই সামান্য। অষ্টাদশ শতকে একজন লিপিকর চারখণ্ড রামায়ণ কপি করে পেতেন নগদ মাত্র সাত টাকা, কিছু কাপড় আর মিষ্টি।
সপ্তম ভাগ: কলমের শক্তি ও আধুনিক যুগে তার অবলুপ্তি
কলমকে বলা হয় তলোয়ারের চেয়েও শক্তিধর। ফাউন্টেন পেন হয়তো আভাসে ইঙ্গিতে তা বলতে চায়; কারণ, অনুষঙ্গ হিসাবে ‘ব্যারেল’, ‘কার্টিজ’ এই সব শব্দ শোনা যায়। ইতিহাসেও কিন্তু পালকের কলমধারীকে সত্যিই কখনো কখনো তলোয়ারের হাতে লড়াই করতে হয়েছে।
লেখক জানাচ্ছেন, বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন — ‘লাঠি তোমার দিন ফুরাইয়াছে।’ কলমের দিনও কি ফুরালো? হয়তো হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসে তার ঠাঁই কিন্তু পাকা। যাঁরা উস্তাদ কলমবাজ তাঁদের বলা হত ‘ক্যালিগ্রাফিস্ট’ বা ‘লিপি-কুশলী’।
তবু আজও আমাদের কালের অধিকাংশ লেখকই কলমে লেখেন। অন্নদাশঙ্কর রায় একমাত্র টাইপরাইটারে লিখে গেছেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও টাইপরাইটার ধরেছিলেন কিছুকাল। সত্যজিৎ রায় ছিলেন অসাধারণ লিপিশিল্পী — তাঁর হাতের লেখার কুশলতার সঙ্গে অন্যান্য শিল্পকর্মের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
কম্পিউটারের বহুল ব্যবহার কালি ও কলমের অস্তিত্বকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে। একসময় লিপিকরেরা কীরকম সম্মান পেতেন তা তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। কলম ও কালি না থাকলে হয়তো এখনকার মানুষেরা প্রাচীন সাহিত্যের রসাস্বাদন করতে পারত না। এইসব বলার ফাঁকে শ্রীপান্থ সুভোঠাকুরের ব্যক্তিগত কলম-সংগ্রহ এবং কলমের আঘাতে ত্রৈলোক্যনাথের মৃত্যুর প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন।
একদিন অফুরন্ত এই কালির ফোয়ারা যিনি খুলে দিয়েছিলেন, তাঁর নাম লুই অ্যাডসন ওয়াটারম্যান — এই কথাটিই লেখক বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। কলম সময়মতো তরবারির চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। প্রতিপক্ষের ঘায়েল করতে সে সক্ষম। কম্পিউটারে আঁকা ছবির চেয়ে কলমে কেটে রাখা ছবি অনেক বেশি দরদ পায়।
কলমের ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি রবীন্দ্রনাথ ও সত্যজিৎ রায়ের কথা বলেছেন। মানুষের হাত থেকে যদি কেড়ে নেওয়া হয় কলম, হাতের লেখা যদি মুছে যায় চিরকালের জন্য — তবে কী আর রইল? ভাবতে ভালো লাগে, আমাদের কালের অধিকাংশ লেখকই এখনও কলমে লেখেন।
বিশেষ শব্দার্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| মসি | কালি (সংস্কৃত শব্দ) |
| দোয়াত | কালির পাত্র বা কালিদানি |
| মুনশি | ফেরানি, লেখক বা কেরানি |
| ত্রিফলা | বহেড়া, হরীতকী ও আমলকী — এই তিনটি ফল একত্রে |
| কুইল | পাখির পালক থেকে বানানো কলম |
| স্টাইলাস | রোমান যুগে ব্যবহৃত ব্রোঞ্জের ধারালো লেখার শলাকা |
| হরফ | অক্ষর |
| লিপিকর / লিপি-কুশলী / ক্যালিগ্রাফিস্ট | পেশাদার লিপিকার, যিনি সুন্দর হস্তাক্ষরে পুথির প্রতিলিপি করতেন |
| টাইপরাইটার | এমন একটি যন্ত্র যার প্রতিটি নির্দিষ্ট বোতাম টিপলে নির্দিষ্ট অক্ষর বা সংখ্যা লেখা হয় |
| পেশোলিন | চিনামাটি (porcelain), এক ধরনের সাদা মসৃণ সিরামিক |
| জেড | অলংকারে ব্যবহৃত একপ্রকার সবুজ মূল্যবান পাথর |
| বারোমাস | বাহারোমাস, সারা বছর |
| ঝরনা কলম | ফাউন্টেন পেনের বাংলা নাম |
প্রশ্নোত্তর: হারিয়ে যাওয়া কালি কলম প্রশ্ন উত্তর

ক) অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান: ১)
১. ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধটি কোন রচনা থেকে সংকলিত?
উত্তর: প্রবন্ধটি শ্রীপান্থের ‘কালি আছে কাগজ নেই, কলম আছে মন নেই’ রচনা থেকে সংকলিত।
২. শ্রীপান্থের প্রকৃত নাম কী?
উত্তর: শ্রীপান্থের প্রকৃত নাম নিখিল সরকার।
৩. লেখক শৈশবে কীসে লিখতেন?
উত্তর: লেখক শৈশবে কলাপাতা কেটে কাগজের মতো সাইজ করে নিয়ে তাতে লিখতেন।
৪. ‘প্রাচীনরা বলতেন’ — প্রাচীনরা কী বলতেন?
উত্তর: প্রাচীনরা বলতেন — ‘তিল ত্রিফলা শিমুল ছালা/ছাগ দুধে করি মেলা/লৌহপাতে লোহায় ঘষি/ছিঁড়ে পত্র না ছাড়ে মসি।’ এটি ছিল উৎকৃষ্ট কালি তৈরির পদ্ধতির পুরনো ছড়া।
৫. লেখক যদি রোম সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হতেন, তাহলে কী দিয়ে লিখতেন?
উত্তর: লেখক যদি রোম সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হতেন, তাহলে ব্রোঞ্জের শলাকা — যার পোশাকি নাম স্টাইলাস — দিয়ে লিখতেন।
৬. ‘বাবু কুইল ড্রাইভারস’ — কাদের বলা হত?
উত্তর: লর্ড কার্জন বাঙালি সাংবাদিকদের গরম গরম ইংরেজি দেখে তাঁদের ‘বাবু কুইল ড্রাইভারস’ বলতেন। এখানে ‘কুইল’ বলতে পালকের কলমকে বোঝানো হয়েছে।
৭. এখন পালকের কলম কোথায় দেখতে পাওয়া যায়?
উত্তর: এখন পালকের কলম পুরনো দিনের তৈলচিত্র বা ফোটোগ্রাফে দেখতে পাওয়া যায়।
৮. এখন খাগের কলম কোথায় দেখা যায়?
উত্তর: এখন খাগের কলম দেখা যায় একমাত্র সরস্বতী পূজার সময়। কাচের দোয়াতে কালির বদলে দুধ এবং ফাউন্টেন পেন বা বলপেনের বদলে খাগের কলম রাখা হয়।
৯. আদিতে ফাউন্টেন পেনের নাম কী ছিল?
উত্তর: আদিতে ফাউন্টেন পেনের নাম ছিল ‘রিজার্ভার পেন’। ওয়াটারম্যান সেটিকে উন্নত করে ফাউন্টেন পেন তৈরি করেন।
১০. ফাউন্টেন পেনের উদ্ভাবক কে?
উত্তর: ফাউন্টেন পেনের উদ্ভাবক হলেন আমেরিকান উদ্ভাবক লুই অ্যাডসন ওয়াটারম্যান (Lewis Edson Waterman)।
১১. ‘কলম সেদিন খুনিও হতে পারে বইকী’ — কোন দিনের কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: যেদিন রোম সাম্রাজ্যের অধীশ্বর জুলিয়াস সিজার, কাসকাকে স্টাইলাস দিয়ে আঘাত করেছিলেন — সেই দিনের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ যে স্টাইলাস দিয়ে লেখা হত, তা-ই সেদিন খুনের অস্ত্র হয়ে উঠেছিল।
১২. সুভোঠাকুর কে ছিলেন?
উত্তর: সুভোঠাকুর হলেন রবীন্দ্রনাথের সেজদা হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র ক্ষেত্রনাথ ঠাকুরের পুত্র। তাঁর বিখ্যাত দোয়াত-সংগ্রহ ছিল।
১৩. বাংলায় ফাউন্টেন পেনকে কী বলা হত?
উত্তর: বাংলায় ফাউন্টেন পেনকে ‘ঝরনা কলম’ বা ‘বরনা কলম’ বলা হত।
১৪. কলমকে কীসের চেয়ে শক্তিশালী বলা হয়েছে? উত্তর: কলমকে তলোয়ারের চেয়ে শক্তিশালী বলা হয়েছে।
১৫. লেখক প্রথম ফাউন্টেন পেন কোথা থেকে কিনেছিলেন?
উত্তর: লেখক কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের একটি নামী দোকান থেকে প্রথম ফাউন্টেন পেন কিনেছিলেন।
১৬. ‘ত্রিফলা’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ‘ত্রিফলা’ বলতে বোঝায় বহেড়া, হরীতকী ও আমলকী — এই তিনটি ফল একত্রে।
১৭. উইলিয়াম কেরি কে ছিলেন? উত্তর: উইলিয়াম কেরি ছিলেন একজন খ্রিস্টান মিশনারি। তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন। তাঁর মুনশি ছিলেন রামরাম বসু।
১৮. শ্রীপান্থ কোন পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?
উত্তর: শ্রীপান্থ প্রথমে ‘যুগান্তর’ ও পরে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-র সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
খ) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান: ৩)
১. ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধ অনুসারে লেখক শৈশবে কীভাবে কালি তৈরি করতেন?
উত্তর: ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে শ্রীপান্থ তাঁর শৈশবে গ্রামে ঘরে তৈরি কালির পদ্ধতির কথা জানিয়েছেন।
লেখকদের ঘরে কালি তৈরির সহজ পদ্ধতি ছিল এই — বাড়ির রান্নার কাঠের উনুনের তলায় কাঁসার কড়াই উপুড় করে রেখে তার তলায় কালো কালি জমতে দেওয়া হত। তারপর সেই কালো কালি লাউপাতা দিয়ে ঘষে একটা পাথরের বাটিতে রাখা জলে মিলিয়ে নেওয়া হত। যারা ওস্তাদ, তারা এই কালো জলে হরতকি ঘষত। আবার কখনো কখনো মাকে দিয়ে আতপ চাল ভেজে পুড়িয়ে তা বেটে ভেতে মিশিয়ে দেওয়া হত।
সব মিশিয়ে মেশানোর পর একটি খুঁতির গোড়ার দিকটি পুড়িয়ে লাল টকটকে করে সেই জলে ছাঁকা দেওয়া হত। অল্প জল থাকলে অনেক সময় তা টগবগ করে ফুটত। তারপর নাকড়ায় ছেঁকে দোয়াতে ঢেলে কালি তৈরি হত — এটিই ছিল তাঁদের প্রাথমিক ঘরোয়া পদ্ধতি।
২. ‘একদিন অফুরন্ত এই কালির ফোয়ারা যিনি খুলে দিয়েছিলেন তাঁর নাম’ — তাঁর নাম কী? কোন ঘটনায় তিনি ফাউন্টেন পেন তৈরিতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং এর ফলে কী হয়েছিল?
উত্তর: শ্রীপান্থের ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে উল্লিখিত সেই মানুষটির নাম লুই অ্যাডসন ওয়াটারম্যান (Lewis Edson Waterman)।
একবার ওয়াটারম্যান একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিপত্র সই করতে গিয়েছিলেন। দলিলটিতে কিছুটা লেখা হয়েছে, এমন সময় দোয়াতটি হঠাৎ উপুড় হয়ে পড়ে। ওয়াটারম্যান কালির সন্ধানে ছুটলেন। ফিরে এসে শুনলেন, ইতিমধ্যে আরেকজন এসে সেই ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তিপত্র পাকা করে চলে গেছেন।
বিমর্ষ ওয়াটারম্যান তখনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন — এর একটা বিহিত করতেই হবে। তারপর অনেক ভাবনাচিন্তার পর তিনি তৈরি করলেন ফাউন্টেন পেন।
এর ফলে কলমের দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটে গেল। ফাউন্টেন পেনে কালি সঞ্চিত থাকত বলে সবসময় দোয়াত বহন করার ঝামেলা থেকে লেখকরা মুক্তি পেলেন। ফাউন্টেন পেন আবিষ্কারের পর সারা বিশ্বে এই পেনের প্রচলন শুরু হল এবং রাতারাতি প্রভূত জনপ্রিয়তাও অর্জন করল।
৩. ‘ক্যালিগ্রাফিস্ট’ বা ‘লিপি-কুশলী’ কাদের বলা হয়? তাদের সম্পর্কে প্রাবন্ধিক কী বলেছেন?
উত্তর: ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে শ্রীপান্থ কলম, কালি ও লিপিকরের ঐতিহ্যের কথা আলোচনা করতে গিয়ে ‘ক্যালিগ্রাফিস্ট’ বা ‘লিপি-কুশলী’-দের কথা উল্লেখ করেছেন।
ছাপাখানা আবিষ্কারের আগে যাঁরা হাতে লিখে পুথির প্রতিলিপি তৈরি করতেন, তাঁদেরই ‘লিপিকর’ বা ‘লিপি-কুশলী’ বলা হত। মধ্যযুগে এমন বৃত্তির মানুষরা হাতে লিখে মূলপুথি থেকে প্রতিলিপি তৈরি করতেন।
এই লিপি-কুশলীদের সম্পর্কে প্রাবন্ধিক জানিয়েছেন — মুঘল দরবারে ও বিভিন্ন রাজা-জমিদারদের সভায় তাঁদের উচ্চ সম্মান ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা থাকত। তাঁদের হস্তাক্ষর ছিল মুক্তোর মতো — প্রতিটি ছত্র সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন, যাকে বলা যায় মুক্তোর মতো হস্তাক্ষর। কিন্তু তাঁদের রোজগার ছিল নিতান্তই সামান্য — অষ্টাদশ শতকে একজন লিপিকর চারখণ্ড রামায়ণ কপি করে পেতেন নগদ মাত্র সাত টাকা, কিছু কাপড় আর মিষ্টি।
ছাপাখানার আবিষ্কারের পর এই পেশার মানুষদের প্রয়োজনীয়তা আর রইল না, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাঁরা অলঙ্কিত হয়ে থাকবেন।
৪. শ্রীপান্থের প্রথম ফাউন্টেন পেন কেনার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দাও। (৩)
উত্তর: ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে শ্রীপান্থ তাঁর প্রথম ফাউন্টেন পেন কেনার মজাদার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেশ কয়েক বছর পরের ঘটনা। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের একটি নামী দোকানে গেছেন ফাউন্টেন পেন কিনবেন বলে। দোকানি জিজ্ঞেস করলেন, কী কলম নেবেন — পার্কার? শেফার্ড? ওয়াটারম্যান? সোয়ান? পাইলট? এত কলমের নাম ও দাম শুনে লেখকের ঘাবড়ে যাওয়ার অবস্থা। দোকানি বুঝতে পারলেন, ইনি ফাউন্টেন পেন সম্পর্কে একেবারেই অনভিজ্ঞ। শেষমেশ তিনি সস্তার একটি জাপানি পাইলট কলম নেওয়ার পরামর্শ দিলেন।
কিন্তু সেই কলমের নিব ঠিক আছে কিনা বোঝাতে দোকানি কলমটাকে সার্কাসের ছুরি ছোড়ার মতো করে টেবিলের পাশে দাঁড় করানো কাঠের বোর্ডে ছুড়ে দিলেন। ঠিক যেভাবে সার্কাসে লোকটি অক্ষত থাকে, সেই কলমটিও অক্ষত রইল — নিব ভাঙল না। সেই জাপানি পাইলটই ছিল লেখকের প্রথম ফাউন্টেন পেন, যা নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন।
৫. আধুনিক প্রযুক্তির যুগে কালি-কলমের অবস্থা সম্পর্কে প্রাবন্ধিক কী মত ব্যক্ত করেছেন?
উত্তর: ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে শ্রীপান্থ আধুনিক যুগে কালি-কলমের ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে গভীর আক্ষেপ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
লেখক দেখছেন, তাঁর লেখালেখির অফিসে এখন আর কারও সঙ্গে কলম নেই। সকলের টেবিলে কম্পিউটার, সবাই কিবোর্ডে টাইপ করেন। কম্পিউটারের বহুল ব্যবহার কালি ও কলমের অস্তিত্বকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলার প্রাচীন প্রবাদ ‘কালি নেই, কলম নেই, বলে আমি মুনশি’ আজ আক্ষরিক সত্য হয়ে উঠেছে।
তবে প্রাবন্ধিক একেবারে হতাশ নন। তাঁর বিশ্বাস — কলমের দিন শেষ হলেও ইতিহাসে তার ঠাঁই পাকা। যাঁরা উস্তাদ কলমবাজ, তাঁরা ‘ক্যালিগ্রাফিস্ট’ হিসেবে ইতিহাসে অমর। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘লাঠি তোমার দিন ফুরাইয়াছে’-র মতো কলমের দিনও হয়তো ফুরাবে, কিন্তু কলমের মাধ্যমে সৃষ্ট সাহিত্য ও সংস্কৃতি চিরকাল মানবসভ্যতার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকবে।
গ) ব্যাখ্যাধর্মী / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান: ৫)

১. ‘আমার মনে পড়ে প্রথম ফাউন্টেন কেনার কথা’ — লেখক কোথায় ফাউন্টেন পেন কিনতে গিয়েছিলেন? তাঁর ফাউন্টেন পেন কেনার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দাও। (১+৪)
উত্তর: শ্রীপান্থের ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে তাঁর প্রথম ফাউন্টেন পেন কেনার স্মৃতি এক সজীব ও প্রাণবন্ত আখ্যানের রূপ পেয়েছে।
ফাউন্টেন পেন কেনার স্থান: লেখক কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের একটি নামী দোকানে ফাউন্টেন পেন কিনতে গিয়েছিলেন।
অভিজ্ঞতার বিবরণ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেশ কয়েকবছর পরের ঘটনা। দোকানে ঢুকতেই দোকানি জিজ্ঞেস করলেন — কী কলম নেবেন? পার্কার? শেফার্ড? ওয়াটারম্যান? সোয়ান? পাইলট? এই একগুচ্ছ বিদেশি কলমের নাম ও তার সঙ্গে সঙ্গে দামের তালিকা শুনে লেখক রীতিমতো হতভম্ব। একটি বিদেশি কাগজে ফাউন্টেনের বিজ্ঞাপনে দেখেছিলেন সাতশো রকম নিব।
যাঁরা গান করেন তাঁদের জন্য আলাদা, স্টেনোগ্রাফার বা লিপিলেখকদের জন্য আলাদা, যাঁরা বাঁ হাতে লেখেন তাঁদের জন্য আলাদা — এমনকি কুমিরদের খুশি করারও ব্যবস্থা ছিল তাঁদের হাতে।
দোকানি বুঝতে পারলেন, এ ভদ্রলোক ফাউন্টেন পেন বিষয়ে একেবারেই অনভিজ্ঞ। শেষমেশ সস্তার একটি জাপানি পাইলট কলম নেওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু কলমটির নিব ঠিক আছে কিনা দেখাতে দোকানি হঠাৎ সেটাকে ছুড়ে দিলেন টেবিলের পাশে দাঁড় করানো কাঠের বোর্ডের গায়ে — হুবহু সার্কাসে কোনো লোককে বোর্ডের গায়ে দাঁড় করিয়ে ছুরি ছুড়ে খেলানোর মতো।
সার্কাসে যেমন লোকটি শেষ পর্যন্ত অক্ষত থাকে, কলমের নিবটিও তেমনই অক্ষত রইল। লেখক অবাক হয়ে তিনটি কলম দেখলেন, নিব ঠিক আছে দেখা হল। সেই জাদু-পাইলটকে নিয়েই ঘরে ফিরলেন লেখক — সেটিই তাঁর প্রথম ফাউন্টেন পেন।
পরে নানা জাতের দামি ফাউন্টেন পেন হাতে এসেছে। কিন্তু সেই জাপানি পাইলটকে অনেকদিন যত্ন করে রেখেছিলেন। ফাউন্টেন পেনের এক বিপদ — তা লেখককে নেশাগ্রস্ত করে। শেলজানন্দ একবার লেখককে দেখিয়েছিলেন তাঁর ফাউন্টেন পেনের সংগ্রহ — ডজন-দুয়েক হবেই।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়েরও ছিল ফাউন্টেন পেনের নেশা। এই নেশার উৎস শরৎচন্দ্রের কাছ থেকে এসেছিল বলে জানিয়েছিলেন শেলজানন্দ নিজেই।
২. ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধ অনুসারে কলম ও কালির ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস নিজের ভাষায় লেখো। (৫)
উত্তর: শ্রীপান্থের ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে লেখক লেখার যন্ত্র হিসেবে কলমের আদি থেকে আধুনিক কালের এক অসাধারণ বিবর্তনের ছবি তুলে ধরেছেন।
আদিম যুগ থেকে শুরু: কলমের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। মিশরে নীল নদের তীরের নল-খাগড়া ভেঙে, তা ভোঁতা করে তুলি বানিয়ে লেখার চল ছিল। ফিনিশীয়রা লিখতেন হাড় দিয়ে। চিনারা চিরকাল লিখে আসছেন তুলিতে। রোমান যুগে ব্যবহৃত হত ব্রোঞ্জের ধারালো শলাকা — স্টাইলাস।
এটি দিয়ে কেবল লেখাই হত না, প্রয়োজনে তা অস্ত্রও হয়ে উঠতে পারত। জুলিয়াস সিজার স্টাইলাস দিয়ে কাসকাকে আঘাত করেছিলেন বলে ইতিহাস জানায়।
পালকের কলমের যুগ: এরপর এল পালকের কলম বা কুইল। এটি পাখির পালক থেকে তৈরি হত এবং দোয়াতের কালিতে চুবিয়ে লেখা হত। ইউরোপীয় ও সাহেবরা ব্যাপকভাবে এই কলম ব্যবহার করতেন। সাহেবরা পালকের কলম তৈরির জন্য একটি ছোট যন্ত্রও তৈরি করেছিলেন — পেনসিল শার্পনারের মতো।
ফাউন্টেন পেনের আবির্ভাব: পালকের কলম ও দোয়াতের এই যুগ শেষ হয় ফাউন্টেন পেনের আবিষ্কারে। মার্কিন বিমা-প্রতিনিধি লুই অ্যাডসন ওয়াটারম্যান একটি বিড়ম্বনামূলক ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করলেন এমন একটি কলম যার মধ্যেই কালি সংরক্ষিত থাকে — দোয়াত বহনের ঝামেলা নেই। ফাউন্টেন পেন আবিষ্কারের পর পৃথিবীজুড়ে এর ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়।
টাইপরাইটার ও ডিজিটাল যুগ: বিংশ শতকের মাঝভাগ থেকে টাইপরাইটার লেখকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। অন্নদাশঙ্কর রায় বা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো লেখকরা টাইপরাইটারে লিখেছেন। এরপর কম্পিউটার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির আগমনে কালি-কলমের অস্তিত্ব ক্রমশ বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
এই দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়েও প্রাবন্ধিক বিশ্বাস করেন — কলমের ইতিহাসে তার ঠাঁই চিরকালীন। মানবসভ্যতার যা কিছু শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, তার সবই জন্ম নিয়েছে কলম ও কালির সাহায্যে।
৩. ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে লেখক যে আক্ষেপ ও স্মৃতিচারণ করেছেন তার পরিচয় দাও। (৫)
উত্তর: শ্রীপান্থের ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধটি মূলত একটি আন্তরিক আক্ষেপ ও স্মৃতিচারণের রচনা, যেখানে কালি-কলমের ঐতিহ্যময় অতীত এবং আধুনিক যুগে তার অবলুপ্তির বেদনা একসঙ্গে ধরা পড়েছে।
আক্ষেপ: প্রবন্ধের সূচনাতেই লেখক দেখছেন, তাঁর লেখার অফিসে কারও হাতে কলম নেই। সবাই কম্পিউটারের কিবোর্ডে লেখেন, কারও সঙ্গে কলম থাকে না। বাংলার পুরনো প্রবাদ ‘কালি নেই, কলম নেই, বলে আমি মুনশি’ আজ আক্ষরিক সত্য হয়ে উঠেছে — এই উপলব্ধিই তাঁর আক্ষেপের মূলে।
খাগের কলম এখন কেবল সরস্বতী পূজায় দেখা যায়, পালকের কলম পুরনো তৈলচিত্রে। ফাউন্টেন পেনও আজ দুর্লভ। কম্পিউটারের বহুল ব্যবহার কালি-কলমের অস্তিত্বকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে।
স্মৃতিচারণ: স্মৃতির আলোয় লেখক ফিরে গেছেন তাঁর শৈশবে — গ্রামে কলাপাতায় লেখা, বাড়িতে ঘরোয়া উপায়ে কালি তৈরি করা, সেই কালো জলে বাঁশের কলম চুবিয়ে লেখার দিনগুলির কথা। এরপর কল্পনায় পৌঁছে গেছেন প্রাচীন মিশর ও রোমের লেখার সরঞ্জামে। লর্ড কার্জনের ‘বাবু কুইল ড্রাইভারস’ মন্তব্যে পালকের কলমের যুগ জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
আর প্রথম ফাউন্টেন পেন কেনার মজাদার অভিজ্ঞতা তো এক সজীব রম্য আখ্যান।
শেষপর্যন্ত লেখক উপলব্ধি করেছেন — কলমের দিন ফুরালেও কলমের মাধ্যমে সৃষ্ট মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ রচনাগুলি চিরকাল বেঁচে থাকবে। শেক্সপিয়ার থেকে রবীন্দ্রনাথ — সকলের অমর সৃষ্টির জন্ম হয়েছে কালি আর কলমের সাহায্যেই। এই চেতনাই আক্ষেপের মধ্যেও প্রবন্ধটিকে এক গভীর আশার আলোয় উজ্জ্বল করে তুলেছে।
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি প্রশ্ন উত্তর
আফ্রিকা কবিতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
অসুখী একজন প্রশ্ন উত্তর — পাবলো নেরুদা (অনুবাদ: নবারুণ ভট্টাচার্য)
জ্ঞানচক্ষু প্রশ্ন উত্তর — আশাপূর্ণা দেবী
- বহুরূপী
লেখক-পরিচিতি বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান নাম সুবোধ ঘোষের জন্ম ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বর, বিহারের হাজারিবাগে। আদি নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুর মহকুমার বহর গ্রামে। হাজারিবাগের সেন্ট কলম্বাস কলেজে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর কর্মজীবন ছিল অসাধারণ বর্ণময়। বাসের কন্ডাক্টর, টিউটর, ট্রাক ড্রাইভার, এমনকি সার্কাস পার্টিতে ক্লাউনের ভূমিকা পর্যন্ত — বহু পেশায় তাঁকে যেতে হয়েছে। এই … - হারিয়ে যাওয়া কালি কলম প্রশ্ন উত্তর | শ্রীপান্থ | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
লেখক-পরিচিতি বাংলা সাহিত্য জগতে নিখিল সরকার ‘শ্রীপান্থ’ ছদ্মনামেই অধিক পরিচিত। তাঁর আরেকটি ছদ্মনাম ‘দৌবারিক’। জন্ম ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ১ মে, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর গ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশ)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক হওয়ার পর তরুণ বয়স থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন — প্রথমে ‘যুগান্তর’, পরে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য়। আনন্দবাজারের সোমবারের বিখ্যাত ‘কলকাতার কড়চা’ বিভাগটি দীর্ঘকাল … - আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি প্রশ্ন উত্তর
কবি-পরিচিতি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের জন্ম ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের চাঁদপুরে (বর্তমানে বাংলাদেশ)। তাঁর আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ; পৈতৃক ভিটে ছিল বরিশাল জেলার বানারিপাড়া গ্রামে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেন। … - আফ্রিকা কবিতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
কবি-পরিচিতি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে, কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে। শৈশব থেকেই সাহিত্যের আবহে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি খুব অল্প বয়স থেকেই ‘ভারতী’ ও ‘বালক’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘হিন্দুমেলার উপহার’, আর প্রথম সার্থক ছোটোগল্প হিসেবে সাহিত্য-সমালোচকেরা ‘দেনাপাওনা’-কে চিহ্নিত করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অজস্র কবিতা, গান, ছোটোগল্প, … - অসুখী একজন প্রশ্ন উত্তর — পাবলো নেরুদা (অনুবাদ: নবারুণ ভট্টাচার্য)
কবি পরিচিতি পাবলো নেরুদা ছিলেন চিলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, প্রাবন্ধিক এবং একইসঙ্গে দক্ষ কূটনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদ। ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই তাঁর জন্ম। রাজনৈতিক জীবনে তিনি চিলির বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মানবতা, প্রেম, রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও যুদ্ধবিরোধী চেতনা তাঁর কবিতার মূল সুর। ১৯৫০ সালে আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার এবং ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার … - জ্ঞানচক্ষু প্রশ্ন উত্তর — আশাপূর্ণা দেবী
(দশম শ্রেণি, বাংলা — সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর) লেখক পরিচিতি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবীর জন্ম ১৯০৯ সালের ৮ জানুয়ারি, উত্তর কলকাতায়। সেকালের সামাজিক রীতি অনুযায়ী তাঁর প্রথাগত বিদ্যালয়-শিক্ষা লাভের সুযোগ ঘটেনি, বাড়িতেই তাঁর শিক্ষার সূচনা। অথচ এই সীমাবদ্ধতা তাঁকে দমিয়ে রাখেনি— নিজের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, জীবনবোধ আর মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে …