লেখক-পরিচিতি
রবীন্দ্র সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর, হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে। দারিদ্র্যের মধ্যে বড়ো হওয়া শরৎচন্দ্র ভবঘুরে জীবন কাটিয়েছেন অনেক বছর এবং দীর্ঘকাল বর্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) ছিলেন। সেই বর্মণীয় জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।
‘কুন্তলীন’ গল্প প্রতিযোগিতায় ‘মন্দির’ নামে গল্প পাঠিয়ে পুরস্কার পেয়েছিলেন — এটাই তাঁর প্রথম মুদ্রিত গল্প। বাংলার গ্রাম-জীবন এবং মধ্যবিত্ত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-সম্ভাবনা তাঁর গল্প-উপন্যাসে আশ্চর্য মুনিয়ানায় ভাষারূপ পেয়েছে।
উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘বড়দিদি’, ‘পল্লীসমাজ’, ‘দেবদাস’, ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘চরিত্রহীন’, ‘গৃহদাহ’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘শেষ প্রশ্ন’, ‘পথের দাবী’। বিখ্যাত ছোটোগল্পগুলির মধ্যে ‘মহেশ’, ‘অভাগীর স্বর্গ’, ‘একাদশী বৈরাগী’ পাঠকমহলে আজও সমাদৃত। তিনি ‘অনিলা দেবী’ ও ‘নিরুপমা দেবী’ ছদ্মনামেও লেখালেখি করতেন। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
শরৎচন্দ্রের পথের দাবী | মাধ্যমিক বাংলা সম্পূর্ণ আলোচনা
রচনার উৎস ও পটভূমি

‘পথের দাবী’ পাঠ্যাংশটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের ষষ্ঠ ও সপ্তম পরিচ্ছেদের অংশবিশেষ থেকে সংগৃহীত। উপন্যাসটি ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এটি শরৎচন্দ্রের শেষ পর্যায়ের রাজনৈতিক উপন্যাস — শৈলীর দিক থেকে সেরা না হলেও রাজনৈতিক প্রেরণা ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে এটি বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার এই উপন্যাসের বিক্রি বন্ধ করে দেয়।
উপন্যাসের পটভূমি ব্রিটিশ-শাসিত ভারত এবং রেঙ্গুন (বর্তমান ইয়াঙ্গন, মিয়ানমার)। এই সময়কাল ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল যুগ — একদিকে ব্রিটিশ সরকারের কঠোর দমন-নীতি, অন্যদিকে বিপ্লবীদের গোপন কর্মকাণ্ড। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সব্যসাচী মল্লিক — একজন বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামী, যাকে পুলিশ ধরতে মরিয়া।
পাঠ-সারসংক্ষেপ: পথের দাবী প্রশ্ন উত্তর
প্রথম ভাগ: অপূর্বের পরিচয় ও প্ল্যাটফর্মের অপমান
পাঠ্যাংশের শুরুতে আমরা পাই অপূর্বকে — একজন শিক্ষিত বাঙালি যুবক, রেঙ্গুনে বর্মা-অয়েল-কোম্পানিতে কাজ করেন। তিনি ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান এবং দেশের মানুষের জন্য গভীর মমতা অনুভব করেন।
একদিন কিছু ফিরিঙ্গি ছেলে কোনো দোষ না থাকা সত্ত্বেও অপূর্বকে লাথি মেরে প্ল্যাটফর্ম থেকে বার করে দেয়। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সাহেব স্টেশনমাস্টার তাঁকে ‘দেশি লোক’ বলে কুকুরের মতো দূরে তাড়িয়ে দেন। এই ঘটনায় অপূর্বের মনে গভীর ক্ষত তৈরি হয়। সেই লাঞ্ছনার কথা মনে করে তিনি বলেন — মনে হলো দুঃখে, লজ্জায়, ঘৃণায় নিজেই যেন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে যাই।
এই ঘটনার বর্ণনা শুনে তাঁর বন্ধু রামদাস তলওয়ারকর বলেন — “বাবুজি, এ-সব কথা বলার দুঃখ আছে।” রামদাস মারাঠি, কিন্তু ভারতবর্ষের মানুষদের ওপর এই অত্যাচার তারও প্রাণে বাজে। এর প্রেক্ষিতে অপূর্ব দৃপ্তকণ্ঠে বলেন — “তাদের আপনার বলে ডাকবার যে দুঃখই থাক, আমি আজ থেকে মাথায় তুলে নিলাম।”
দ্বিতীয় ভাগ: চুরির ঘটনা ও তেওয়ারির কর্মকুশলতা
অপূর্বের বাসায় একবার চুরি হয়। তেওয়ারি (অপূর্বের বাড়ির এক ক্রিস্টান মেয়ে) বর্মা নাচ দেখতে যাওয়ার সুযোগে চুরি হয়েছিল। চোর তাড়িয়ে দরজায় নিজের তালা বন্ধ করে, বাসায় পৌঁছে চাবি খুলে অপরিচিত ঘরে ঢুকে ছড়ানো জিনিসপত্র গুছিয়ে দেয় এবং সমস্ত ফর্দ করে কী আছে আর কী গেছে তার নিখুঁত হিসাব তৈরি করে রাখে। অপূর্ব এই মেয়েকে নিয়ে বলেন — “এমন তৎপর, এত বড়ো কার্যকুশলা মেয়ে আর যে কেহ আছে মনে হয় না, হে তলওয়ারকর!”
পুলিশে খবর দিতে গিয়ে অপূর্ব দেখেন পুলিশের বিড়ম্বনামূলক আচরণ। গিরিশ মহাপাত্রকে দেখে বোঝা যায় সে কিছুতেই সব্যসাচী মল্লিক হতে পারেন না — এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে অপূর্ব তাঁর বিষয়ে পুলিশকে কিছু জানান না।
তৃতীয় ভাগ: গিরিশ মহাপাত্রের জিজ্ঞাসাবাদ — সব্যসাচীর ছদ্মবেশ
বর্মা-অয়েল-কোম্পানির উত্তর বর্মার তেলের খনির কারখানায় কাজের জন্য আসা শ্রমিকদের মধ্যে পুলিশ পলিটিক্যাল সাসপেক্ট (রাজনৈতিক সন্দেহভাজন) সব্যসাচী মল্লিককে ধরার জন্য সবাইকে আটক করে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে সন্দেহজনক একজনকে আলাদা ঘরে আটকে নিমাইবাবুর সামনে হাজির করা হয়।
এই ব্যক্তির বয়স ত্রিশ-বত্রিশের বেশি নয়, কিন্তু ভারী রোগা মুখ। তার বেশভূষা অত্যন্ত বিচিত্র ও আকর্ষণীয়: মাথায় সামনের দিকে বড়ো বড়ো চুল, ঘাড়ে ও কানের কাছে ছোটো করে ছাঁটা; মাথায় লেবুর উগ্র গন্ধময় তেল দিয়ে পরিপাটিভাবে করা সিঁথি; গায়ে জাপানি সিল্কের রামধনু রঙের চুড়িদার পাজামা; পরনে বিলাতি মিলের কালো মখমল পাড়ের সূক্ষ্ম শাড়ি; হাঁটুর উপরে লাল ফিতে দিয়ে বাঁধা সবুজ রঙের ফুল মোজা; পায়ে লোহার নালা বাঁধানো বার্নিশ-করা পাম্পশু; বুকপকেটে বাঘ-আঁকা রুমাল; হাতে হরিণের শিং থেকে হাতল দেওয়া বেতের ছড়ি।
এই সাজসজ্জা দেখে অপূর্ব মনে মনে হাসি সামলান। নিমাইবাবু তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে জানা যায় — আজে, গিরিশ মহাপাত্র।
টাক থেকে বের করা হয় — একটি টাকা, গণ্ডা-কয়েক পয়সা, একটি লোহার কম্পাস, একটি ফুটরুল, কয়েকটি বিড়ি, একটি দেশলাই এবং একটি গাঁজার কলকা।
নিমাইবাবু গাঁজার কলকা দেখে জিজ্ঞেস করেন — গাঁজা খাও?
মহাপাত্র অসংকোচে জবাব দেয় — আজ্ঞে, না।
তবে এ বস্তু পকেটে কেন?
আজ্ঞে, পথে কুড়িয়ে পেলাম, যদি কারো কাজে লাগে তাই তুলে রেখেছি।
এই কথায় জগদীশবাবু চিৎকার করে ওঠেন — “দয়ার সাগর! পরকে সেজে দি, নিজে খাইনে। মিথ্যেবাদী কোথাকার!”
তবু অপূর্ব নিমাইবাবুকে পরামর্শ দেন — “যাঁকে খুঁজছেন তাঁর কালচারের কথাটা একবার ভেবে দেখুন।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে অপূর্ব বোঝান যে গিরিশ মহাপাত্রের মতো সংস্কৃতিহীন, ছন্নছাড়া মানুষ সব্যসাচী মল্লিকের মতো উচ্চসংস্কৃতিসম্পন্ন বিপ্লবী হতেই পারেন না।
গাঁজা খাওয়ার ধমক দিয়ে মহাপাত্রকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু এই গিরিশ মহাপাত্রই ছিলেন আসল সব্যসাচী মল্লিক! পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে তিনি পার পেয়ে যান।
চতুর্থ ভাগ: ভামো যাওয়ার পথে পুনর্মিলন
অপূর্ব ভামো যাওয়ার পথে ট্রেনে চড়েন। গাড়ি ছাড়তে কয়েক মিনিট বাকি, হঠাৎ তিনি গিরিশ মহাপাত্রকে সেই একই পোশাকে দেখতে পান। অপূর্ব তাকে চিনতে পারলেও পুলিশকে জানান না। তাদের মধ্যে কথোপকথন হয়।
মহাপাত্র বলে সে দুজন বন্ধু নোক আসার কথা ছিল, কিন্তু তারা হয়রান করেছে। সে ধর্মভীরু মানুষ — লাল্লাটের লেখা খণ্ডাবে না।
অপূর্ব হাসিয়া বলেন — “আমার ওপর মিথ্যে সন্দেহ রাখবেন না বাবুমশায়, আপনাদের নজর পড়লে চাকরিও একটু জুটবে না। বামুনের ছেলে, বাংলা লেখাপড়া, শাস্ত্র-তন্ত্র সবই কিছু কিছু শিখেছিলাম, কিন্তু এমন অদেষ্ট যে—বাবুমশায় আপনারা—”
অপূর্ব বলেন — “আমি ব্রাহ্মণ।”
পঞ্চম ভাগ: রাতে পুলিশের হয়রানি — “তুমি তো ইউরোপিয়ান নও”
রাতে ট্রেনে প্রথম শ্রেণিতে শুয়ে অপূর্ব ভেবেছিলেন ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে না। কিন্তু সেই রাতেই বার-তিনেক বর্মা সাব-ইন্সপেক্টর তাঁকে ঘুম থেকে তুলে নাম, ধাম, ঠিকানা লিখে নিয়েছে। একবার বিরক্ত হয়ে প্রতিবাদ করায় সে কটকটে জবাব দেয় — “তুমি তো ইউরোপিয়ান নও।”
অপূর্ব বলেন — “না। কিন্তু আমি তো ফার্স্ট ক্লাস প্যাসেঞ্জার।”
সে হাসিয়া বলে — “ও নিয়ম রেলওয়ে কর্মচারীদের জন্য — আমি পুলিশ; ইচ্ছা করলে আমি তোমাকে টানিয়া নীচে নামাইতে পারি।”
এই ঘটনা আবারও অপূর্বের মনে ঔপনিবেশিক শাসনের বৈষম্যমূলক চরিত্রকে স্পষ্ট করে দেয়।
পথের দাবী | শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
বিশেষ শব্দার্থ: পথের দাবী প্রশ্ন উত্তর

| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| তোরঙ্গ | টিনের বাক্স |
| ধাম | বাসস্থান |
| পোলিটিক্যাল সাসপেক্ট | রাজনৈতিক সন্দেহভাজন ব্যক্তি |
| মেয়াদ | ধার্য সময় |
| দুরারোগ্য | যা থেকে আরোগ্য লাভ করা সম্ভব নয় |
| তৈলনিষিক্ত | তেল লাগানো |
| মখমল | নরম, মসৃণ ও মোটা কাপড় বিশেষ |
| বিদ্যমান | উপস্থিত |
| জামিন | আদালতকে মুচলেকা দিয়ে আটক ব্যক্তিকে স্বল্পমেয়াদের জন্য খালাস করানো |
| খানাতলাশি | অপরাধের কারণে নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান |
| টাক | কোমরের কাপড় |
| মন্থর | ধীর |
| অপরিজ্ঞাত | ভালোভাবে না জানা |
| টেলিগ্রাফ | তারের সাহায্যে প্রেরিত বার্তা |
| আরদালি | বেয়ারা |
| কালচার | সংস্কৃতি |
| অনাহুত | যাকে ডাকা হয়নি |
| পিরান | টিলা জামাবিশেষ |
প্রশ্নোত্তর: পথের দাবী প্রশ্ন উত্তর

ক · অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান: ১)
১. ‘পথের দাবী’ পাঠ্যাংশটি মূল উপন্যাসের কোন পরিচ্ছেদ থেকে নেওয়া?
উত্তর: পাঠ্যাংশটি ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের ষষ্ঠ ও সপ্তম পরিচ্ছেদের অংশবিশেষ থেকে সংগৃহীত।
২. ‘পথের দাবী’ উপন্যাসটি কত খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় এবং কখন ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে?
উত্তর: ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় এবং ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার এটি বাজেয়াপ্ত করে।
৩. তেলের খনির কারখানার মিস্ত্রিরা কেন রেঙ্গুনে এসেছিল?
উত্তর: বর্মা-অয়েল-কোম্পানিতে, তেলের খনির কারখানায় মিস্ত্রিরা কাজ করত। সেখানকার জল-হাওয়া তাদের সহ্য হচ্ছিল না বলে চাকরির উদ্দেশ্যে তারা রেঙ্গুনে এসেছিল।
৪. সব্যসাচীর চোখের দৃষ্টি দেখে কী মনে হয়েছিল?
উত্তর: সব্যসাচীর চোখের দৃষ্টি দেখে মনে হয়েছিল সেই চোখে কোনো খেলা বা চালাকি চলবে না। অত্যন্ত গভীর জলাশয়ের মতো সেই চোখে লুকানো ছিল ক্ষীণ প্রাণশক্তি; মৃত্যুও সেখানে প্রবেশ করতে সাহস করে না।
৫. পলিটিক্যাল সাসপেক্ট ব্যক্তিটির নাম জিজ্ঞাসা করায় সে কী বলেছিল?
উত্তর: নিমাইবাবু নাম জিজ্ঞাসা করায় পলিটিক্যাল সাসপেক্ট বলেছিল — “আজ্ঞে, গিরিশ মহাপাত্র।”
৬. গিরিশ মহাপাত্রের টাক থেকে কী কী বের করা হয়েছিল?
উত্তর: গিরিশ মহাপাত্রের টাক থেকে বের করা হয়েছিল একটি টাকা, গণ্ডা-কয়েক পয়সা, একটি লোহার কম্পাস, একটি ফুটরুল, কয়েকটি বিড়ি, একটি দেশলাই এবং একটি গাঁজার কলকা।
৭. নিমাইবাবু গাঁজার কলকা দেখে কী জিজ্ঞেস করেছিলেন? উত্তর: নিমাইবাবু গাঁজার কলকা দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন — “তুমি গাঁজা খাও?”
৮. গাঁজার কলকা পকেটে থাকার কারণ হিসেবে গিরিশ মহাপাত্র কী বলেছিল?
উত্তর: গিরিশ মহাপাত্র বলেছিল — আজ্ঞে, পথে কুড়িয়ে পেয়েছিল, যদি কারো কাজে লাগে তাই তুলে রেখেছিল।
৯. “দয়ার সাগর! পরকে সেজে দি, নিজে খাইনে। মিথ্যেবাদী কোথাকার!” — কে বলেছেন?
উত্তর: জগদীশবাবু চিৎকার করে এই কথা বলেছিলেন।
১০. “যাঁকে খুঁজছেন তাঁর কালচারের কথাটা একবার ভেবে দেখুন।” — এই কথা কে, কাকে বলেছেন?
উত্তর: অপূর্ব নিমাইবাবুকে এই কথা বলেছেন।
১১. ‘কালচার’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: ‘কালচার’ একটি ইংরেজি শব্দ। বাংলায় তার প্রতিশব্দ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে ‘কৃষ্টি’ বা ‘সংস্কৃতি’।
১২. গিরিশ মহাপাত্রকে কীসের জন্য ধমক দেওয়া হয়েছিল?
উত্তর: গিরিশ মহাপাত্রকে গাঁজা খাওয়ার সংশয়ে ধমক দেওয়া হয়েছিল।
১৩. “বাবুজি, এ-সব কথা বলার দুঃখ আছে।” — বাবুজি কে?
উত্তর: রামদাস তলওয়ারকর অপূর্বকে ‘বাবুজি’ বলে সম্বোধন করেছেন।
১৪. ‘তুমি তো ইউরোপিয়ান নও’ — এই কথা কোন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে?
উত্তর: ভামো যাওয়ার পথে ট্রেনে প্রথম শ্রেণিতে বার-তিনেক ঘুম থেকে তুলে পরিচয় নেওয়ার বিরুদ্ধে অপূর্ব প্রতিবাদ করলে বর্মা সাব-ইন্সপেক্টর কটকটে জবাবে এ কথা বলে।
১৫. রামদাস তলওয়ারকর কে?
উত্তর: রামদাস তলওয়ারকর অপূর্বের মারাঠি বন্ধু।
১৬. তেওয়ারি কোথায় গিয়েছিল এবং সেই সুযোগে কী হয়েছিল?
উত্তর: তেওয়ারি বর্মা নাচ দেখতে গিয়েছিল এবং সেই সুযোগে অপূর্বের বাড়িতে চুরি হয়েছিল।
১৭. “এমন তৎপর, এত বড়ো কার্যকুশলা মেয়ে আর যে কেহ আছে মনে হয় না।” — কার সম্পর্কে বলা হয়েছে?
উত্তর: অপূর্বের বাড়ির ক্রিস্টান মেয়ে তেওয়ারির সম্পর্কে এই কথা বলা হয়েছে।
১৮. অপূর্ব কেন পুলিশকে গিরিশ মহাপাত্রের বিষয়ে জানাননি?
উত্তর: গিরিশ মহাপাত্রের বিচিত্র পোশাক, আচরণ ও কথাবার্তা দেখে অপূর্ব নিশ্চিত ছিলেন যে এই ব্যক্তি কোনোভাবেই সব্যসাচী মল্লিক হতে পারেন না। তাই তিনি পুলিশকে কিছু জানাননি।
খ · পথের দাবী প্রশ্ন উত্তর: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান: ৩)

১. “কেবল আশ্চর্য সেই রোগা মুখের অদ্ভুত দুটি চোখের দৃষ্টি।” — কার চোখ? সেই চোখের বর্ণনা দাও।
উত্তর: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ পাঠ্যাংশে উদ্ধৃত এই পঙ্ক্তিতে গিরিশ মহাপাত্রের ছদ্মবেশধারী সব্যসাচী মল্লিকের চোখের কথা বলা হয়েছে।
সব্যসাচীর বয়স ত্রিশ-বত্রিশের বেশি নয়, কিন্তু মুখ ভারী রোগা — দুরারোগ্য রোগে যেন সমস্ত দেহটা ক্ষয়ের দিকে ছুটে চলেছে। এইটুকু কাশির পরিশ্রমেও সে হাঁপাতে লাগল।
কিন্তু তার চোখদুটো ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। বড়ো, টানা, গোল কিংবা অথবা ভাষাহীন — কোনো বিশেষণেই তার চোখের বর্ণনা যায় না। অত্যন্ত গভীর জলাশয়ের মতো সেই চোখে লুকানো ছিল ক্ষীণ প্রাণশক্তি। মৃত্যুও সেখানে প্রবেশ করতে সাহস করে না। অপূর্বের বিশ্লেষণে — এই ধরনের চোখের সামনে কোনো খেলা বা চালাকি চলবে না।
২. “বাবুটির স্বাস্থ্য গেছে, কিন্তু শখ যে ঘোলাআনাই বজায় আছে তা স্বীকার করতে হবে।” — বাবুটি কে? তার শখ যে বজায় আছে তা কীভাবে বোঝা গেল?
উত্তর: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী‘ পাঠ্যাংশে উদ্ধৃত এই কথাটির ‘বাবু’ হলেন গিরিশ মহাপাত্র।
পুলিশ স্টেশনে গিরিশ মহাপাত্রকে নিয়ে আসার পর নিমাইবাবু তার বেশভূষার পরিপাট্য দেখে বলেছিলেন যে বাবুটির স্বাস্থ্য গেলেও শখ বজায় আছে। তার শখ বজায় আছে বোঝা গিয়েছিল তার পোশাক ও সাজসজ্জা দেখে।
মাথায় তেলনিষিক্ত চুলে পরিপাটি সিঁথি, গায়ে জাপানি সিল্কের রামধনু রঙের চুড়িদার পাজামা, পরনে কালো মখমল পাড়ের সূক্ষ্ম শাড়ি, হাঁটুর উপরে লাল ফিতে দিয়ে বাঁধা সবুজ মোজা, পায়ে বার্নিশ করা পাম্পশু, বুকপকেটে বাঘ-আঁকা রুমাল, হাতে হরিণের শিং থেকে হাতল দেওয়া বেতের ছড়ি — এইসব দেখেই বোঝা গিয়েছিল শরীর যত ক্ষীণই হোক, সাজসজ্জার শখ পুরোপুরি বজায় আছে।
৩. “যাঁকে খুঁজছেন তাঁর কালচারের কথাটা একবার ভেবে দেখুন।” — ‘কালচার’ কথার অর্থ কী? উক্তির তাৎপর্য লেখো।
উত্তর: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী‘ উপন্যাস থেকে গৃহীত এই পাঠ্যাংশে অপূর্ব নিমাইবাবুর কাছে এই মন্তব্যটি করেছেন।
‘কালচার’ হল একটি ইংরেজি শব্দ। এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে ‘কৃষ্টি’ বা ‘সংস্কৃতি’। একজন মানুষের কথাবার্তা, চলাচলন, বেশভূষা, ভাবনাচিন্তা বা বলা ভালো সার্বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে সেই ব্যক্তির সংস্কৃতি বা কালচারের পরিচয় গড়ে ওঠে, যা নিয়ন্ত্রিত হয় তার রুচি, মূল্যবোধ ও শিক্ষার দ্বারা।
গিরিশ মহাপাত্রকে পলিটিক্যাল সাসপেক্ট বিপ্লবী সব্যসাচী মল্লিক সন্দেহে আটক করা হয়। কিন্তু গাঁজার নেশাসক্ত গিরিশ মহাপাত্রের নিম্নরুচির বিচিত্র সাজসজ্জা, অসংলগ্ন কথাবার্তা-চালচলনে কোথাও বৈদ্যতা বা রুচির সামান্যতম প্রকাশও নেই। অথচ সব্যসাচী মল্লিকের একটি কালচার রয়েছে।
আর কালচার বা সংস্কৃতি মানুষ ছদ্মবেশ নিলেও নিজস্বতাকে বর্জন করতে পারে না; বাহ্যিক পোশাক পরিবর্তন করলেও তা প্রকাশ হয়ে বাধ্য। এজন্যই অপূর্ব নিমাইবাবুকে কালচারের কথাটা ভেবে দেখতে বলেছেন।
৪. “তাদের আপনার বলে ডাকবার যে দুঃখই থাক, আমি আজ থেকে মাথায় তুলে নিলাম।” — বক্তা কে? ‘তাদের’ বলতে কাদের কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ উপন্যাস থেকে গৃহীত এই পাঠ্যাংশে উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা অপূর্ব।
‘তাদের’ বলতে এখানে সব্যসাচী মল্লিকের মতো বিপ্লবীদের কথা বলা হয়েছে। যারা দেশের জন্য তাদের সমস্ত কিছু উৎসর্গ করেছেন এবং দেশকে স্বাধীন করার জন্য প্রাণপাত করে চলেছেন।
অপূর্ব মনে করেন দেশমাতৃকার মুক্তিযজ্ঞে আত্মসমর্পণ করা এই বিপ্লবীরাই পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষদের সবচেয়ে বেশি আপন। পুলিশকর্মী নিমাইবাবু ‘কাকা’ সম্বোধন করলেও অপূর্ব তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। বরং বিপ্লবী সব্যসাচী তার শ্রদ্ধার পাত্র। তাই ভয়কে তুচ্ছ করে নিভীক অপূর্ব বলেন — ‘তাদের’ আপনার বলে ডাকার দুঃখ যাই হোক, আজ থেকে সেই দুঃখটাকেই মাথায় তুলে নিলাম।
৫. “বাবুজি, এ-সব কথা বলার দুঃখ আছে।” — বাবুজি কে? কোন প্রসঙ্গে এই কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ পাঠ্যাংশে রামদাস তলওয়ারকর অপূর্বকে ‘বাবুজি’ সম্বোধনে এই কথা বলেছেন।
অপূর্ব রেঙ্গুনে এসে পুলিশকর্তার আত্মীয় নিমাইবাবুর কাজের সমালোচনা করে সব্যসাচীর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তারপর রামদাসের কাছে তিনি বিস্তারিত বলছিলেন কীভাবে ফিরিঙ্গি ছেলেরা তাকে বিনা দোষে লাথি মেরে প্ল্যাটফর্ম থেকে বের করে দিয়েছিল এবং সাহেব স্টেশনমাস্টার কীভাবে ‘দেশি লোক’ বলে তাকে কুকুরের মতো দূর করে দিয়েছিলেন।
পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সরকারের বিরোধিতা করা ছিল দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই এই কথা প্রকাশ পেলে অপূর্ব রাজরোষের মুখে পড়তে পারেন — এই ভেবে রামদাস এ কথা বলেছিলেন।
গ · পথের দাবী প্রশ্ন উত্তর: ব্যাখ্যাধর্মী / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান: ৫)
১. চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সূত্রে গিরিশ মহাপাত্র চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো। (৫)
উত্তর: কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী‘ উপন্যাস থেকে গৃহীত পাঠ্যাংশটির শুরুতে আমরা পরিচিত হই গিরিশ মহাপাত্র চরিত্রের সঙ্গে। পাঠ্যাংশে তার প্রকৃত পরিচয় উদ্ঘাটিত না হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি মূল উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিপ্লবী সব্যসাচী মল্লিক — তবে আমরা পাঠ্যাংশটিতে গিরিশ মহাপাত্র চরিত্রটির বৈশিষ্ট্যগুলো দেখে নেওয়ার চেষ্টা করব।
অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা: পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য সব্যসাচী মল্লিককে পোশাক, চালচলন, কথা বলার ভঙ্গি এবং সামগ্রিক ব্যক্তিত্বে এমন একটি চরিত্র নির্মাণ করতে হয়েছে যা সংগঠিত বিপ্লবী চরিত্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুলিশ যাঁকে খুঁজছে তিনি শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান, আদর্শনিষ্ঠ মানুষ — আর গিরিশ মহাপাত্র সেখানে উপস্থিত হন গাঁজাখোর, রুচিহীন, বিচিত্র সাজের এক ব্যক্তিত্বহীন মানুষ হিসেবে।
তার চুলে লেবুর তেল, গায়ে জাপানি সিল্কের চুড়িদার পাজামা, কালো মখমল পাড়ের শাড়ি, হাঁটুর উপরে বাঁধা সবুজ মোজা, বার্নিশ পাম্পশু, বাঘ-আঁকা রুমাল, হরিণের শিং-এর বেতের ছড়ি — এই বিচিত্র সাজসজ্জার সমাহারে সে কাউকে ভাবতেই দিতে পারেনি যে এই মানুষ কোনোভাবেই সব্যসাচী হতে পারেন। এটি তার অসাধারণ অভিনয় প্রতিভা।
অদ্ভুত চোখের দৃষ্টি: সমস্ত অপ্রতুল বেশভূষার আড়ালেও একটি জিনিস লুকানো যায়নি — তার চোখের দৃষ্টি। সেই রোগা মুখে অদ্ভুত দুটি চোখ — গভীর জলাশয়ের মতো। অপূর্বের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতায় এই চোখে কোনো খেলা বা চালাকি চলবে না। তিনি বুঝতে পারেন এই চোখে রয়েছে অদম্য প্রাণশক্তির আভাস। এই চোখই সব্যসাচীর প্রকৃত সত্তার সাক্ষ্য দেয়।
বুদ্ধিমত্তা ও উপস্থিত বুদ্ধি: গাঁজার কলকা পকেটে পাওয়ার পরও সে অসংকোচে বলে — পথে কুড়িয়ে পেয়েছি, কারো কাজে লাগবে ভেবে তুলে রেখেছি। এই মুহূর্তের উপস্থিত বুদ্ধি ও আত্মবিশ্বাস তার তীক্ষ্ণ মানসিকতার প্রমাণ।
ব্যক্তিত্বের বিরোধাভাস: অপূর্বের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে গিরিশ মহাপাত্র আসলে কে হতে পারেন। কিন্তু বাইরের বেশভূষা ও আচরণে এমন কোনো চিহ্ন নেই যা দিয়ে পুলিশ তাকে শনাক্ত করতে পারে। এই বিরোধাভাস বা প্রতিলোম চরিত্র নির্মাণই গিরিশ মহাপাত্রকে — তথা সব্যসাচী মল্লিককে — এই পাঠ্যাংশের সবচেয়ে রহস্যময় ও মনোগ্রাহী চরিত্রে পরিণত করেছে।
২. ‘পথের দাবী’ রচনাংশটি অবলম্বনে অপূর্ব চরিত্রটি আলোচনা করো। (৫)
উত্তর: পরাধীন ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে বাংলার বাইরে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের একটি বিশেষ ধারাকে নিয়ে লেখা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ উপন্যাস থেকে গৃহীত ‘পথের দাবী’ শীর্ষক পাঠ্যাংশটিতে বেশ কয়েকটি চরিত্র উঠে এলেও এই রচনাংশে অপূর্ব চরিত্রটি বিশেষভাবে উপন্যাসের মূল সুরটিকে আভাসিত করেছে।
ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাব: পরাধীন ভারতবর্ষে যে ব্রিটিশ শাসক শ্রেণি প্রতিনিয়ত শাসিতদের লাঞ্ছিত, অপমানিত করছে, তার সঙ্গে তিন বার মুখোমুখি হয়েছেন অপূর্ব। ভামো যাওয়ার পথে পুলিশের অন্যায় আচরণ অপূর্বের আত্মসম্মানে আঘাত দেয়। তাই ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে এই শিক্ষিত, ভদ্র ব্রাহ্মণ-সন্তানের মনে জমে ওঠে ক্ষোভ। দেশের মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল অপূর্বের স্বদেশপ্রীতির পরিচয় পাই তলওয়ারকরের সঙ্গে তার কথোপকথনে।
দেখা যায় — যেভাবে পুলিশ কর্মচারী নিমাইবাবুকে ‘কাকা’ সম্বোধন করলেও অপূর্ব তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন, বরং বিপ্লবী সব্যসাচীর প্রতি তার ভিতরে গোপনে গড়ে উঠেছে গভীর শ্রদ্ধা। ভয়কে তুচ্ছ করে নিভীক অপূর্ব বলেন — “আমার মা, আমার ভাই-বোনকে যারা এই-সব সহস্র কোটি অত্যাচার থেকে উদ্ধার করতে চায় তাদের আপনার বলে ডাকবার যে দুঃখই থাক, আমি আজ থেকে মাথায় তুলে নিলাম।”
উৎকৃষ্ট পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা: গিরিশ মহাপাত্রকে সে সব্যসাচী বলে চিনতে পারে না ঠিকই, তবে তার চোখে অদম্য প্রাণশক্তির আভাস পায় সে। তলওয়ারকরের সঙ্গে তার সম্পর্ক, থানায় পুলিশের বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ, জগদীশবাবুকে গাঁজার ঘটনায় ধমক দেওয়া থেকে বোঝা যায় সে একজন সূক্ষ্মদর্শী মানুষ।
নৈতিক দৃঢ়তা: পুলিশকর্তার সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও তার আত্মসম্মান খর্ব হলে অপূর্ব প্রতিবাদ করেন। তিনি জানেন রাজদ্রোহ করার শাস্তি কী, তবুও তিনি বিপ্লবীদের পক্ষ নেন — এই নৈতিক দৃঢ়তাই তার চরিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক।
সব মিলিয়ে অপূর্ব হলেন একজন স্বদেশপ্রেমী, সহমর্মী, নৈতিকভাবে দৃঢ়, পর্যবেক্ষণশীল এবং ইংরেজ শাসনের প্রতি বিতৃষ্ণ একজন মানুষ — যিনি নিজে সরাসরি বিপ্লবী না হলেও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি তার একনিষ্ঠ সহানুভূতি ও শ্রদ্ধায় উপন্যাসের মূল বার্তাকেই বহন করেছেন।
৩. “তাদের আপনার বলে ডাকবার যে দুঃখই থাক, আমি আজ থেকে মাথায় তুলে নিলাম।” — বক্তার মানসিক দ্বন্দ্ব ও দেশপ্রেমের পরিচয় দাও। (৫)
উত্তর: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের এই বিখ্যাত উক্তিটি অপূর্বের। এটি কেবল একটি আবেগের উচ্চারণ নয় — এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি শিক্ষিত, চাকুরিরত মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবকের গভীর মানসিক দ্বন্দ্ব এবং শেষপর্যন্ত সেই দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে উঠে আসা দেশপ্রেমের উচ্চারণ।
মানসিক দ্বন্দ্ব: অপূর্ব একজন চাকুরিরত মধ্যবিত্ত মানুষ। পুলিশকর্তার আত্মীয়, সরকারি চাকরিতে আবদ্ধ। তার ওপর নির্ভরশীল তার পরিবার। এই অবস্থায় বিপ্লবীদের প্রকাশ্যে সমর্থন করা মানে সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যাওয়া — যার পরিণাম চাকরি হারানো, এমনকি কারাবাস পর্যন্ত হতে পারে। তাই ‘দুঃখই থাক’ কথাটায় এই দ্বন্দ্বটা স্পষ্ট — অপূর্ব জানেন এই পথে দুঃখ আছে, বিপদ আছে।
অপরদিকে ফিরিঙ্গি ছেলের লাথি, সাহেব স্টেশনমাস্টারের অপমান, রাতে পুলিশের বারবার ঘুম ভাঙানো — এই সব তাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় যে ব্রিটিশ শাসনে একজন ভারতীয়ের মর্যাদা কতটা তুচ্ছ। দুঃখে, লজ্জায়, ঘৃণায় নিজেকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। এই যন্ত্রণাটাই তার দেশপ্রেমকে জাগিয়ে তোলে।
দেশপ্রেমের পরিচয়: এই দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করে অপূর্ব যখন বলেন — “আমার মা, আমার ভাই-বোনকে যারা এই-সব সহস্র কোটি অত্যাচার থেকে উদ্ধার করতে চায় তাদের আপনার বলে ডাকবার যে দুঃখই থাক, আমি আজ থেকে মাথায় তুলে নিলাম” — তখন তার দেশপ্রেম তার ব্যক্তিগত সুরক্ষার চেয়ে বড়ো হয়ে ওঠে। ‘মাথায় তুলে নেওয়া’ কথাটায় একটা সক্রিয় সংকল্পের দৃঢ়তা আছে — তিনি কেবল সমবেদনা দেখাচ্ছেন না, একটি ঘোষণা করছেন।
এই ঘোষণায় অপূর্ব হয়তো সশস্ত্র বিপ্লবী নন, কিন্তু তাঁর মানসিক অবস্থান সুস্পষ্ট — স্বাধীনতা সংগ্রামীরাই তাঁর ‘আপন’। এটাই পথের দাবী উপন্যাসের মূল বার্তা — ভারতের স্বাধীনতার পথে সমগ্র ভারতবাসীর আত্মিক অঙ্গীকার।
প্রলয়োল্লাস প্রশ্ন উত্তর | কাজী নজরুল ইসলাম | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
সিরাজদৌলা প্রশ্ন উত্তর নাটক | শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
অভিষেক — মাইকেল মধুসূদন দত্ত | Class 10 বাংলা মেঘনাদবধ কাব্য আলোচনা
বহুরূপী
হারিয়ে যাওয়া কালি কলম প্রশ্ন উত্তর | শ্রীপান্থ | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি প্রশ্ন উত্তর
- পথের দাবী প্রশ্ন উত্তর — শরৎচন্দ্র | Class 10 বাংলা সারাংশ ও প্রশ্নোত্তর
লেখক-পরিচিতি রবীন্দ্র সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর, হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে। দারিদ্র্যের মধ্যে বড়ো হওয়া শরৎচন্দ্র ভবঘুরে জীবন কাটিয়েছেন অনেক বছর এবং দীর্ঘকাল বর্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) ছিলেন। সেই বর্মণীয় জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। ‘কুন্তলীন’ গল্প প্রতিযোগিতায় ‘মন্দির’ নামে গল্প পাঠিয়ে পুরস্কার পেয়েছিলেন — এটাই … - প্রলয়োল্লাস প্রশ্ন উত্তর | কাজী নজরুল ইসলাম | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
কবি-পরিচিতি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, সঙ্গীতজ্ঞ ও বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে, পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে। দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি লেটো দলে গান লিখে ও গেয়ে সাহিত্যজীবনের সূচনা করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। সেনাজীবনের অভিজ্ঞতা ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ তাঁর লেখালেখিকে … - সিরাজদৌলা প্রশ্ন উত্তর নাটক | শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
নাটকারের পরিচিতি বাংলা নাটসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ও শক্তিশালী নাটকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের জন্ম ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে, তৎকালীন বাংলার খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশ)। ছাত্রাবস্থাতেই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। শিক্ষক সখারাম গণেশ দেউস্করের কাছে সাংবাদিকতার পাঠ নেন এবং ‘হিতবাদী’ পত্রিকার সখারামের সহযোগী হন। পরে ‘বেকালী’, ‘বিজলী’, ‘আত্মশক্তি’ প্রভৃতি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। সহ-সম্পাদক হিসেবে ‘দৈনিক কৃষক’ … - অভিষেক — মাইকেল মধুসূদন দত্ত | Class 10 বাংলা মেঘনাদবধ কাব্য আলোচনা
কবি-পরিচিতি উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি, তৎকালীন যশোহর জেলার (বর্তমানে বাংলাদেশ) সাগরদাঁড়ি গ্রামে। বাল্যকালেই কলকাতায় এসে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক প্রমুখ। গ্রিক, ল্যাটিন, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষায় তিনি গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। প্রথম … - বহুরূপী
লেখক-পরিচিতি বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান নাম সুবোধ ঘোষের জন্ম ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বর, বিহারের হাজারিবাগে। আদি নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুর মহকুমার বহর গ্রামে। হাজারিবাগের সেন্ট কলম্বাস কলেজে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর কর্মজীবন ছিল অসাধারণ বর্ণময়। বাসের কন্ডাক্টর, টিউটর, ট্রাক ড্রাইভার, এমনকি সার্কাস পার্টিতে ক্লাউনের ভূমিকা পর্যন্ত — বহু পেশায় তাঁকে যেতে হয়েছে। এই … - হারিয়ে যাওয়া কালি কলম প্রশ্ন উত্তর | শ্রীপান্থ | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
লেখক-পরিচিতি বাংলা সাহিত্য জগতে নিখিল সরকার ‘শ্রীপান্থ’ ছদ্মনামেই অধিক পরিচিত। তাঁর আরেকটি ছদ্মনাম ‘দৌবারিক’। জন্ম ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ১ মে, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর গ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশ)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক হওয়ার পর তরুণ বয়স থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন — প্রথমে ‘যুগান্তর’, পরে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য়। আনন্দবাজারের সোমবারের বিখ্যাত ‘কলকাতার কড়চা’ বিভাগটি দীর্ঘকাল … - আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি প্রশ্ন উত্তর
কবি-পরিচিতি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের জন্ম ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের চাঁদপুরে (বর্তমানে বাংলাদেশ)। তাঁর আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ; পৈতৃক ভিটে ছিল বরিশাল জেলার বানারিপাড়া গ্রামে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেন। … - আফ্রিকা কবিতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
কবি-পরিচিতি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে, কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে। শৈশব থেকেই সাহিত্যের আবহে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি খুব অল্প বয়স থেকেই ‘ভারতী’ ও ‘বালক’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘হিন্দুমেলার উপহার’, আর প্রথম সার্থক ছোটোগল্প হিসেবে সাহিত্য-সমালোচকেরা ‘দেনাপাওনা’-কে চিহ্নিত করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অজস্র কবিতা, গান, ছোটোগল্প, … - অসুখী একজন প্রশ্ন উত্তর — পাবলো নেরুদা (অনুবাদ: নবারুণ ভট্টাচার্য)
কবি পরিচিতি পাবলো নেরুদা ছিলেন চিলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, প্রাবন্ধিক এবং একইসঙ্গে দক্ষ কূটনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদ। ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই তাঁর জন্ম। রাজনৈতিক জীবনে তিনি চিলির বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মানবতা, প্রেম, রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও যুদ্ধবিরোধী চেতনা তাঁর কবিতার মূল সুর। ১৯৫০ সালে আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার এবং ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার …