থেলস: গ্রিক দর্শনের জনক ও বিজ্ঞানের আদি পথিকৃৎ

প্রাচীন গ্রিসকে বলা হয় মানব সভ্যতার আঁতুড়ঘর, যেখানে জ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের অবিস্মরণীয় বিকাশ ঘটেছিল। এই রত্নপ্রসূত ভূমিতেই থেলস, সক্রেটিস, পিথাগোরাস, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের মতো কিংবদন্তী মনীষীদের জন্ম হয়েছিল। এঁরা কেবল দার্শনিক বা বিজ্ঞানী ছিলেন না, ছিলেন মানুষের শুভ যাত্রাপথকে আলোকিত করার জন্য পৃথিবীতে আবির্ভূত এক আলোকবর্তিকা। আধুনিক বিজ্ঞানের এত অগ্রগতির যুগেও থেলস, পিথাগোরাস, অ্যারিস্টটল প্রমুখ মহাবিজ্ঞানী, দার্শনিকদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের ঋণ মানবজাতি কখনো ভুলতে পারবে না।

গ্রিক দর্শনের সূচনালগ্ন: থেলসের অবদান

Thales
Thales

থেলস (Thales of Miletus) ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর শেষ ভাগে (আনুমানিক ৬২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) তাঁর জন্ম হয় বলে মনে করা হয়। তিনি বিজ্ঞান ও দর্শন উভয়ক্ষেত্রেই তাঁর গভীর দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁকে প্রায়শই “প্রথম দার্শনিক” এবং “বিজ্ঞানের জনক” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তাঁর প্রবর্তিত বিজ্ঞান ও দর্শনকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছিল।

বলা হয়, থেলস ছিলেন স্রষ্টা, আর ইউক্লিডঅ্যারিস্টটল ছিলেন সেই সৃষ্টিকে রূপদানকারী। থেলস ছিলেন একজন সুপ্রসিদ্ধ দার্শনিক। তাঁর চিন্তাধারার মধ্যে বিজ্ঞানচর্চার সুস্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন যে, পার্থিব প্রতিটি বস্তু কতকগুলি মূল পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত। অর্থাৎ, আমাদের চারপাশে যে সকল বস্তু ছড়ানো আছে, তার উপাদান মাত্র কয়েকটি মৌলিক পদার্থ।

এই ধারণা ছিল তাঁর সময়ের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, কারণ এর আগে মানুষ মনে করত যে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি কেবল দেবতাদের ইচ্ছার ফল। থেলস দেবতাদের প্রভাবকে অস্বীকার না করেও, প্রাকৃতিক নিয়মের অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন। তিনি জল, বায়ু, মাটি এবং অগ্নি —এই চারটি উপাদানকে মূল পদার্থ হিসাবে নির্দেশ করেছিলেন।

যদিও বর্তমান যুগে এগুলো মৌলিক পদার্থরূপে স্বীকৃত নয় এবং তাঁর ধারণা পুরোপুরি অভ্রান্ত ছিল না, তবুও হাজার হাজার বছর ধরে এই তথ্যই সকলে মেনে এসেছিল। তাঁর এই চিন্তাই পরবর্তীতে প্রাচীন গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞানকে প্রভাবিত করেছিল, বিশেষত এম্পিডোক্লেসের (Empedocles) মতো দার্শনিকদের, যারা এই চারটি উপাদানকে আরও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেন।

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও আবহবিদ্যায় থেলসের দক্ষতা

থেলস জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়েও গভীর চর্চা করেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বগুলির মধ্যে একটি হলো সূর্যগ্রহণের দিন-ক্ষণ পূর্বাহ্নে বলে দিতে পারা। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৫ অব্দের ২৮শে মে তারিখে সংঘটিত একটি সূর্যগ্রহণের ভবিষ্যদ্বাণী তিনি করেছিলেন বলে হেরোডোটাস তাঁর ‘ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এটি ছিল তাঁর সময়ের জন্য এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক সাফল্য এবং মনে করা হয়, তাঁর সময়কাল থেকেই গ্রহণ গণনার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূচনা হয়।

এছাড়াও, তিনি আবহবিদ্যাও জানতেন। অ্যারিস্টটল তাঁর সম্পর্কে একটি গল্প বলেছেন: একবার থেলসের দারিদ্র্য নিয়ে উপহাস করা হলে, তিনি তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং আবহবিদ্যার জ্ঞান ব্যবহার করে অলিভ (জলপাই) ফসলের বাম্পার ফলন হবে বলে অনুমান করেন।

এরপর তিনি মিলেটাসচিয়াসের সব অলিভ তেল নিষ্কাশন যন্ত্রগুলো (olive presses) ভাড়া করে নেন। যখন ফলন সত্যিই ভালো হলো, তখন চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তিনি উচ্চমূল্যে সেগুলো পুনরায় ভাড়া দিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে, দার্শনিকরা চাইলে ধনী হতে পারেন, কিন্তু তাদের আগ্রহ অর্থ নয়, জ্ঞান।

জ্যামিতি ও স্থির তড়িৎ-এ থেলসের অবদান

থেলসের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল তাঁর জ্যামিতির উপাদান, যা বর্তমান যুগেও বিদ্যালয়গুলিতে পাঠ্যসূচীর অন্তর্গত করা হয়েছে। তাঁকে জ্যামিতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনিই প্রথম উপপাদ্য (theorem) প্রমাণ করার ধারণা দেন। তাঁর নামে বেশ কিছু উপপাদ্য পরিচিত, যার মধ্যে অন্যতম হলো:

  • একটি বৃত্তের ব্যাস বৃত্তকে সমান দুই ভাগে বিভক্ত করে।
  •   একটি সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের ভূমি সংলগ্ন কোণগুলো সমান।
  •  দুটি সরলরেখা ছেদ করলে উৎপন্ন বিপরীত কোণগুলো সমান হয়।
  •  একটি অর্ধবৃত্তস্থ কোণ সমকোণ হয়।
  •   ত্রিভুজের শীর্ষকোণ এবং ব্যাসের দ্বারা বৃত্তকে দ্বিখণ্ডিত করা যায় কীভাবে, সে সম্পর্কেও তিনি আলোচনা করেছেন।

অনেকে মনে করেন, জ্যামিতিতে আনুপাতিক নিয়মের (proportionality) ব্যবহারও থেলসেরই আবিষ্কার। মিশর ভ্রমণের সময় তিনি পিরামিডের উচ্চতা নির্ণয়ের জন্য পিরামিডের ছায়া এবং লাঠির ছায়ার অনুপাত ব্যবহার করেছিলেন বলে প্রচলিত আছে, যা তাঁর জ্যামিতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়।

স্থির তড়িৎ (Static Electricity) সম্বন্ধে তাঁর গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘর্ষণের দ্বারা বিদ্যুতের সৃষ্টি হয় – এই তথ্য প্রথম থেলস আবিষ্কার করেন। তিনি পাইন গাছের শক্ত আঠা, যাকে অ্যাম্বার (Amber) বলা হয়, তা ব্যবহার করে গবেষণা করেন। তিনি রেশমী কাপড় দিয়ে অ্যাম্বার ঘষে প্রমাণ করেন যে, এটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হালকা বস্তুকে আকর্ষণ করতে পারে।

থেলসের এই আবিষ্কারের পর বহু গ্রিক পণ্ডিত এই বিষয়ে গবেষণা করেছিলেন। তবে, থেলসের মৃত্যুর প্রায় দুই হাজার বছর পর ইউরোপের রেনেসাঁস যুগের সময় যখন গ্রিক পণ্ডিতদের রচিত পুস্তকগুলি অন্বেষণ করা হয়, তখন ঘর্ষণের ফলে তড়িৎ উৎপন্ন হওয়ার এই তথ্য পুনরায় আবিষ্কৃত হয় এবং বিজ্ঞানী উইলিয়াম গিলবার্ট (William Gilbert) বিজ্ঞান মহলে এই সংবাদ জানান।

মহাবিশ্ব ও থেলসের জীবনকাহিনী

ব্রহ্মাণ্ড সম্বন্ধে থেলস বলেছেন, পৃথিবী ও ব্রহ্মাণ্ড উভয়ই প্রাকৃতিক নিয়মে তৈরি হয়েছে, যা তিনি ঈশ্বরের অবদান বলে মনে করতেন। এই প্রাকৃতিক নিয়মের উপর তাঁর বিশ্বাসই তাঁকে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে উৎসাহিত করেছিল।

থেলসের জীবন কাহিনী সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য খুব কমই পাওয়া যায়, কারণ তাঁর কোনো লেখা সরাসরি আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। তাঁর সম্পর্কে যা কিছু জানা যায়, তা মূলত পরবর্তী দার্শনিক ও ঐতিহাসিকদের রচনা থেকে, যেমন অ্যারিস্টটল এবং হেরোডোটাস। হেরোডোটাসের মতে, থেলসের মা ছিলেন গ্রিক এবং বাবা ছিলেন ফিনিশীয়।

তিনি ব্যবিলনীয় ও মিশরীয় বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন এবং সম্ভবত কোনো ব্যবিলনীয় ধর্মযাজকের কাছে বিজ্ঞানচর্চা করেছিলেন। এরপর তিনি মিশরে এসে মিশরীয় বিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন। পণ্ডিতরা মনে করেন, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৬ অব্দে তাঁর জীবনাবসান হয়।

থেলস তাঁর দর্শন ও বিজ্ঞানের চিন্তাধারার মাধ্যমে জগৎবাসীর হৃদয়ে অমর হয়ে চিরদিন থাকবেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রাকৃতিক ঘটনাকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা আধুনিক বিজ্ঞানের এক শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন।

READ MORE: আমাদের পরিবেশ |পঞ্চম শ্রেণী দ্বিতীয় অধ্যায়: ভৌত পরিবেশ (মাটি,জল,জীববৈচিত্র) প্রশ্ন ও উত্তর | West Bengal Class 5 Science

READ MORE: আমাদের পরিবেশ |পঞ্চম শ্রেণী তৃতীয় অধ্যায়: পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ পরিচিতি প্রশ্ন ও উত্তর | West Bengal Class 5 Science

READ MORE:আমাদের পরিবেশ |পঞ্চম শ্রেণী চতুর্থ অধ্যায়:পরিবেশ ও সম্পদ প্রশ্ন ও উত্তর | West Bengal Class 5 Science

READ MORE: চল তড়িৎ – প্রশ্ন উত্তর | WBBSE Class 10th Physical Science Suggestion ভৌত বিজ্ঞান দশম শ্রেণী

FAQ

Q.1: থেলস কে ছিলেন?

Ans: থেলস ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তানায়ক, যাঁকে “প্রথম দার্শনিক” এবং “বিজ্ঞানের জনক” বলা হয়।

Q.2: থেলস কবে জন্মগ্রহণ করেন?

Ans: আনুমানিক ৬২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।

Q.3: থেলস কী বিশ্বাস করতেন মহাবিশ্ব সম্পর্কে?

Ans: তিনি মনে করতেন, পার্থিব প্রতিটি বস্তু কয়েকটি মূল পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত, এবং মহাবিশ্ব প্রাকৃতিক নিয়মে তৈরি হয়েছে।

Q.4: থেলসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক কৃতিত্ব কী ছিল?

Ans: তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৫ সালের ২৮শে মে তারিখে একটি সূর্যগ্রহণের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।

Q.5: থেলস জ্যামিতিতে কী অবদান রেখেছিলেন?

Ans: তাঁকে জ্যামিতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তিনিই প্রথম উপপাদ্য প্রমাণ করার ধারণা দেন।

Q.6: স্থির তড়িৎ সম্পর্কে থেলসের আবিষ্কার কী ছিল?

Ans: তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন যে ঘর্ষণের দ্বারা বিদ্যুতের সৃষ্টি হয়, যা তিনি অ্যাম্বার ঘষে প্রমাণ করেছিলেন

Q.7: থেলসের জীবন সম্পর্কে তথ্য কোথা থেকে পাওয়া যায়?

Ans: তাঁর সম্পর্কে যা কিছু জানা যায়, তা মূলত অ্যারিস্টটল এবং হেরোডোটাসের মতো পরবর্তী দার্শনিক ও ঐতিহাসিকদের রচনা থেকে।

Leave a Comment