হ্যানিম্যান: যে ডাক্তার রোগীর যন্ত্রণা দেখে নিজেই ডাক্তারি ছেড়ে দিয়েছিলেন — তারপর বদলে দিয়েছিলেন পুরো চিকিৎসার ধারণাটাই

একটু ভাবুন। আপনি একজন ডাক্তার। সারাদিন রোগী দেখছেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অস্বস্তি জমছে — কারণ আপনি নিজেই জানেন, আপনি যে চিকিৎসা দিচ্ছেন সেটা রোগীকে সারাচ্ছে না, বরং তাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। রক্তমোক্ষণ, পারদ, জোঁকের ব্যবহার — এই সব “চিকিৎসা” দেখে আপনার বুক ভারী হয়ে আসছে। কী করবেন আপনি?

বেশিরভাগ মানুষ হয়তো মুখ বুজে থাকত। চাকরি থাকত, সংসার চলত। কিন্তু সামুয়েল হ্যানিম্যান পারেননি। তিনি একদিন সত্যিই সব ছেড়ে দিলেন। ডাক্তারি অনুশীলন বন্ধ করে দিলেন। পরিবার চালাতে শুরু করলেন বই অনুবাদ করে। আর সেই নিভৃত কাজের ফাঁকেই একদিন হাতে এল এমন একটা ধারণা, যা পরবর্তী দুশো বছরে কোটি কোটি মানুষের চিকিৎসার পথ বদলে দেবে। এই মানুষটার গল্পটা জানা দরকার।


Table of Contents

যে শহরে জন্ম, সে শহর ছিল মাটির বাসনের জন্য বিখ্যাত

জার্মানির স্যাক্সনি প্রদেশের মেসেন শহর। বিশ্বজুড়ে এই শহরের খ্যাতি তার পোরসেলিন বা চীনামাটির বাসনের জন্য। আর এই শহরেই ১৭৫৫ সালের ১০ই এপ্রিল জন্ম নিলেন ক্রিশ্চিয়ান ফ্রিডরিখ সামুয়েল হ্যানিম্যান।

বাবা ক্রিশ্চিয়ান গটফ্রিড হ্যানিম্যান ছিলেন সেই পোরসেলিন কারখানারই একজন নকশাকার এবং চিত্রশিল্পী। চার সন্তানের মধ্যে সামুয়েলের মেধা যে আলাদা, সেটা বাবা খুব ছোটবেলা থেকেই বুঝেছিলেন। নিজেই ছেলেকে পড়াশোনার ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন।

কিন্তু সংসারে টানাটানি ছিল। কারখানায় সমস্যা হলেই পরিবারে চাপ পড়ত। একবার তো বাবা ছেলের পড়াশোনা বন্ধ করে তাকে একটা মুদি দোকানে শিক্ষানবিস হিসেবে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু সামুয়েল সেখানে থাকতে পারলেন না। জ্ঞানের টান এত তীব্র ছিল যে তিনি দোকান ছেড়ে বাড়ি ফিরে এলেন।

তারপর শিক্ষকদের সাহায্যে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আবার স্কুলে ফিরলেন। প্রিন্সেস স্কুলে তিনি এতটাই মেধাবী ছিলেন যে অধ্যক্ষ ম্যাজিস্টার মুলার তাঁকে দিয়েই ছোট ছাত্রদের গ্রিক ভাষা শেখাতেন। ভাবুন একবার — ছাত্র নিজে ক্লাস নিচ্ছেন!

স্কুল শেষ করার সময় বিদায়ী প্রবন্ধের বিষয় তিনি নিজে বেছে নিয়েছিলেন — “মানব হস্তের বিস্ময়কর গঠন”। এই বিষয় বেছে নেওয়াটাই বলে দেয়, কত ছোট বয়স থেকে মানবদেহ নিয়ে তাঁর কৌতূহল ছিল।


মাত্র ২০ থ্যালার নিয়ে শহর ছাড়লেন

১৭৭৫ সালে মাত্র ২০ থ্যালার — অর্থাৎ অত্যন্ত সামান্য অর্থ — আর বাবার একটাই উপদেশ বুকে নিয়ে হ্যানিম্যান বেরিয়ে পড়লেন। বাবা বলেছিলেন, সৎ থেকো, কপটতা থেকে দূরে থেকো। এই কথাটা সারাজীবন মনে রেখেছিলেন তিনি।

লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে। কিন্তু লাইপজিগে ক্লিনিক্যাল সুবিধা ছিল না — বইয়ের পড়া আর বাস্তবের অভিজ্ঞতা একসাথে পাওয়ার উপায় ছিল না সেখানে। তখন তিনি ভিয়েনায় চলে গেলেন, ব্রাদার্স অব মার্সি হাসপাতালে ডক্টর জোসেফ ফন কোয়ারিনের অধীনে সরাসরি রোগী দেখা শিখতে।

নিজের খরচ চালাতেন কীভাবে? ধনী ছাত্রদের জার্মান আর ফরাসি ভাষা শিখিয়ে। বিভিন্ন প্রকাশকের কাছে অনুবাদের কাজ করে। ভাষার প্রতি তাঁর দখল ছিল অসাধারণ — গ্রিক, ল্যাটিন, ইংরেজি, ইতালিয়ান, আরবি, স্প্যানিশ — একে একে এই ভাষাগুলোয় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন তিনি।

ডক্টর কোয়ারিনের সুপারিশে তরুণ হ্যানিম্যান পেলেন এক অসাধারণ সুযোগ। ট্রান্সিলভেনিয়ার গভর্নর ব্যারন ফন ব্রুকেনথাল তাঁকে পারিবারিক চিকিৎসক হিসেবে এবং বিশাল ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ও প্রাচীন মুদ্রা সংগ্রহের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিলেন হারমানস্টাটে। এই সুযোগটা হ্যানিম্যানের জীবনে একটা বড় মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল — কারণ সেই গ্রন্থাগারে ছিল প্রাচীন অসংখ্য চিকিৎসাগ্রন্থ, যেগুলো পড়ে তাঁর জ্ঞানের ভিত আরও গভীর হয়।

অবশেষে ১৭৭৯ সালে এরলাঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমডি ডিগ্রি পেলেন। তাঁর গবেষণাপত্র ছিল লাতিন ভাষায় — আক্ষেপজনিত রোগের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে।


ডাক্তার হলেন, কিন্তু মন মানল না

ডক্টরেট শেষ করে চিকিৎসা শুরু করলেন। কিন্তু যত দিন যেতে লাগল, তত মনে একটা অস্বস্তি জমতে লাগল।

সেই যুগের চিকিৎসা ছিল রীতিমতো ভয়ঙ্কর। রোগী এলে প্রথম কাজ রক্ত বের করা — শিরা কেটে বা জোঁক লাগিয়ে। পারদ দেওয়া হত এত বেশি মাত্রায় যে রোগী বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হত। এই চিকিৎসায় সুস্থ হওয়ার চেয়ে মরার আশঙ্কাই বেশি থাকত।

হ্যানিম্যান একজন সংবেদনশীল মানুষ ছিলেন। তিনি দেখলেন, এই পদ্ধতিগুলো রোগীকে সারাচ্ছে না, বরং তার জীবনীশক্তি কেড়ে নিচ্ছে। এটা দেখতে দেখতে তাঁর মনে একটা নৈতিক প্রশ্ন জেগে উঠল — এটা কি আসলে চিকিৎসা, নাকি নিষ্ঠুরতা?

১৭৮২ সালে ডেসাউতে ফার্মেসিতে রসায়নের কাজ করার সময় পরিচয় হল হেনরিয়েট লিওপোল্ডিন কুচলারের সাথে। সেই বছরই বিয়ে হল। সংসার শুরু হল। কিন্তু মনের সংশয় বাড়তেই থাকল।

এই সংশয় এতটাই গভীর হয়ে উঠল যে ১৭৮৪ সালের দিকে তিনি একটা অসাধারণ সিদ্ধান্ত নিলেন — সক্রিয় চিকিৎসা অনুশীলন বন্ধ করে দেবেন। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক গ্রন্থের অনুবাদক হয়ে গেলেন। এই বছরগুলোতে তিনি পনেরোটিরও বেশি ইংরেজি আর ছয়টি ফরাসি বৈজ্ঞানিক বই অনুবাদ করেছিলেন।

অনেকে এটাকে পরাজয় বলতে পারেন। কিন্তু আসলে এটাই ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি।


সিঙ্কোনার রস আর একটা বিপ্লবের সূচনা

সামুয়েল হ্যানিম্যান জীবনী
সামুয়েল হ্যানিম্যান জীবনী

১৭৯০ সাল। হ্যানিম্যান তখন স্কটিশ চিকিৎসক উইলিয়াম কালেনের বই A Treatise on the Materia Medica জার্মান ভাষায় অনুবাদ করছেন।

কালেন লিখেছিলেন — পেরুভিয়ান বাকল বা সিঙ্কোনা (যা থেকে পরে কুইনাইন তৈরি হয়) তার তীব্র তিক্ত স্বাদের কারণে পাকস্থলীতে বিশেষ ক্রিয়া করে এবং ম্যালেরিয়া সারিয়ে তোলে।

হ্যানিম্যান থমকে গেলেন। মাথায় একটা প্রশ্ন এল — প্রকৃতিতে আরও অনেক তিতো জিনিস আছে, সেগুলো কি ম্যালেরিয়া সারায়? সারায় না। তাহলে শুধু তিতো স্বাদের কারণে সিঙ্কোনা ম্যালেরিয়া সারাবে — এই যুক্তি ঠিক নয়।

কিন্তু সিঙ্কোনা সত্যিই ম্যালেরিয়া সারায়। তাহলে কারণটা কী?

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি নিজেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন — নিজের উপর। সুস্থ শরীরে প্রতিদিন দুবার করে সিঙ্কোনার নির্যাস খাওয়া শুরু করলেন। ফলাফল দেখে তিনি চমকে গেলেন।

সুস্থ থাকা সত্ত্বেও কয়েকদিনের মধ্যে তাঁর শরীরে ম্যালেরিয়ার মতো সব লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করল — কাঁপুনি, জ্বর, অস্থিসন্ধির ব্যথা। আর ওষুধ বন্ধ করতেই এই লক্ষণগুলো মিলিয়ে গেল।

মাথার ভেতরে একটা ধারণা দানা বাঁধল। যে ওষুধ সুস্থ মানুষের শরীরে একটা রোগের লক্ষণ তৈরি করে, সেই একই ওষুধ অতি সূক্ষ্ম মাত্রায় সেই রোগের রোগীকে সারিয়ে তুলতে পারে। কারণ শরীরের নিজস্ব আরোগ্য-শক্তি তখন উদ্দীপিত হয়ে ওঠে।

এটাই হয়ে উঠল হোমিওপ্যাথির প্রথম সূত্র — “Similia Similibus Curentur” — সদৃশ সদৃশকে আরোগ্য করে। এই পরীক্ষাটা ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম পরিকল্পিত ফার্মাকোলজিক্যাল পরীক্ষা, যেখানে সুস্থ মানুষের শরীরে ওষুধের প্রভাব পদ্ধতিগতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

পরবর্তী ছয় বছর হ্যানিম্যান এই ধারণাকে আরও পরিণত করলেন। নিজে এবং পরিবারের সদস্যদের উপরও পরীক্ষা চালালেন। গবেষণার জন্য অসুস্থ হয়ে পড়লেও থামলেন না।

অবশেষে ১৭৯৬ সালে বিখ্যাত পত্রিকা Hufeland’s Journal-এ প্রকাশিত হল তাঁর যুগান্তকারী প্রবন্ধ। শিরোনাম ছিল — “An Essay on a New Principle for Ascertaining the Curative Powers of Drugs.” এই বছরটাকেই ধরা হয় হোমিওপ্যাথির জন্মবর্ষ।


আঘাতের পর আঘাত, তবু থামলেন না

সামুয়েল হ্যানিম্যান — জীবনের কালপঞ্জি
সামুয়েল হ্যানিম্যান — জীবনের কালপঞ্জি

যুগান্তকারী ধারণা আসলে কখনও সহজে স্বাগত পায় না। হ্যানিম্যানের ক্ষেত্রেও তা-ই হলো। প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর চিকিৎসা মহলে ঝড় উঠল। তাঁকে “হাতুড়ে ডাক্তার” বলা হল। সমালোচনার ঝড় উঠল। কিন্তু হ্যানিম্যান কারো কথায় কান দিলেন না।

তিনি নিজেকে ডুবিয়ে রাখলেন গবেষণায়। ভোরবেলা থেকে শেষরাত পর্যন্ত কাজ। মাঝখানে সামান্য বিরতি, সামান্য খাবার। এই নিরলস সাধনার ফলে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বেরিয়ে এল।

১৮০৫ সালে প্রকাশিত হল ২৭টি ওষুধের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ নিয়ে তাঁর গ্রন্থ Fragmenta de Viribus — যা ছিল প্রথম হোমিওপ্যাথিক মেটেরিয়া মেডিকার ভ্রূণ।

১৮১০ সালে এল তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা — Organon of Medicine। হোমিওপ্যাথির বাইবেল বলা হয় এই বইটাকে। এতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার নীতি ও বিধান বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। তাঁর জীবদ্দশায় এই বইয়ের পাঁচটি সংস্করণ বের হয়েছিল — প্রতিটি সংস্করণে তিনি চিকিৎসাকে আরও পরিশীলিত করে তুলেছিলেন।

১৮১১ সালে তিনি লাইপজিগে ফিরে এলেন শিক্ষকতা করতে। লাতিন ভাষায় গবেষণাপত্র উপস্থাপন করলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেওয়ার অনুমতি পেলেন।

শিক্ষার্থীরা তাঁর বক্তৃতা শুনতে উৎসাহী ছিল। কিন্তু অনেক পুরনো ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী ছাত্র মেনে নিতে পারেনি নতুন চিন্তাভাবনা। তাও যারা মেনে নিয়েছিল, তারাই পরে হয়ে উঠল হোমিওপ্যাথির পরবর্তী প্রজন্মের ধারক ও বাহক।


নেপোলিয়নের সেনা, টাইফাস, আর এক অলৌকিক সাফল্য

হোমিওপ্যাথির তিনটি মূলনীতি
হোমিওপ্যাথির তিনটি মূলনীতি

ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যেখানে একটা মানুষের কাজ পরীক্ষিত হয় বাস্তবের কঠোর আগুনে।

যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী যখন ফ্রান্স থেকে ফিরে আসছিল, তখন বহু সৈনিক ভয়াবহ টাইফাস জ্বরে আক্রান্ত হল। হ্যানিম্যান তখন এই টাইফাস-আক্রান্ত বহু সৈনিককে তাঁর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুললেন। এরপর তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ল অনেক দূর পর্যন্ত।

এমনকি অস্ট্রিয়ার যুবরাজ শোয়ার্জেনবার্গ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে অ্যালোপ্যাথিতে সাড়া না পেয়ে হ্যানিম্যানের শরণ নিলেন। হ্যানিম্যানের চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগলেন যুবরাজ। কিন্তু চিকিৎসক নিষেধ করা সত্ত্বেও যুবরাজ মদ্যপান ছাড়লেন না। ফলে হ্যানিম্যান চিকিৎসা বন্ধ করে দিলেন। কয়েক সপ্তাহ পরে যুবরাজ হৃদরোগে মারা গেলেন।

অস্ট্রিয়ানরা এই মৃত্যুর দায় চাপাল হ্যানিম্যানের উপর। অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকরা একজোট হয়ে বিরোধিতা করল। জার্মান সরকার তাঁর ওষুধ প্রস্তুত ও বিতরণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল।

১৮২০ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি তাঁকে আদালতে হাজির করা হল। সমস্ত ওষুধ তৈরি ও বিতরণ বন্ধ করার নির্দেশ এল।

এত কিছুর পরেও হ্যানিম্যান ভেঙে পড়লেন না। বিরুদ্ধ চিকিৎসকদের প্রতি তাঁর কোনো বিদ্বেষ ছিল না, কোনো অভিযোগও ছিল না। এটাই ছিল তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় মহত্ত্বের জায়গা।

এই চরম কষ্টের দিনে পাশে এসে দাঁড়ালেন কোঠেন শহরের ডিউক ফার্দিনান্দ। তিনি হ্যানিম্যানকে সেখানে বাস করার এবং চিকিৎসা করার অনুমতি দিলেন।


কোঠেনে নতুন আবিষ্কার — দীর্ঘস্থায়ী রোগের রহস্য

হোমিওপ্যাথির ধর্মগ্রন্থ
হোমিওপ্যাথির ধর্মগ্রন্থ

কোঠেনে এসে হ্যানিম্যান তীব্র বা একিউট রোগের চিকিৎসা প্রায় বন্ধ করে দিলেন। মনোযোগ দিলেন দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক রোগীদের দিকে। বছরের পর বছর ধরে তিনি দেখছিলেন — কিছু রোগ আছে যেগুলো কিছুতেই সারতে চায় না। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় অনেক সময় সাময়িক উপশম হলেও রোগ পুরোপুরি যায় না।

এই সমস্যা নিয়ে তিনি আরও গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলেন। ১৮২৭ সালে তাঁর দুই প্রবীণ শিষ্যকে ডেকে জানালেন তাঁর নতুন ধারণার কথা।

১৮২৮ সালে প্রকাশিত হল তাঁর আরেকটি কালজয়ী গ্রন্থ — The Chronic Diseases। এতে তিনি বললেন, দীর্ঘস্থায়ী রোগের পেছনে আছে তিনটি মূল কারণ — সোরা (চর্মরোগজনিত সংক্রমণের গভীর প্রভাব), সিফিলিস, এবং সাইকোসিস। আর এই রোগগুলোর চিকিৎসায় তিনি নতুন ১৫টি ওষুধের বিস্তারিত বিবরণ দিলেন।

এই বইটা প্রকাশিত হলে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক মহলে আবার বিতর্ক তৈরি হল। কেউ মানলেন, কেউ মানলেন না। এই মত দ্বিধায় আজও হোমিওপ্যাথিক জগতে দুটো ধারা চলছে।


৮০ বছর বয়সে নতুন বিবাহ, আর প্যারিসে নতুন জীবন

প্রথম স্ত্রী জোহানার মৃত্যুর পর হ্যানিম্যান একা হয়ে গেলেন। কিন্তু ৮০ বছর বয়সেও তাঁর জীবনে এল এক নতুন মোড়।

প্যারিস থেকে একজন ফরাসি চিত্রশিল্পী এবং বিদুষী নারী এলেন তাঁর কাছে চিকিৎসার জন্য। মেলানি ডি’হারভিল, বয়স মাত্র ৩৫। চিকিৎসা নিতে নিতে হ্যানিম্যানের চিন্তার গভীরতায় মুগ্ধ হলেন তিনি।

১৮৩৫ সালের ৫ই জানুয়ারি বিয়ে হলো। বয়সের ব্যবধান ৪৫ বছর। কিন্তু এই বিবাহ ছিল হোমিওপ্যাথির ইতিহাসে একটা বড় ঘটনা — কারণ মেলানির উৎসাহেই হ্যানিম্যান প্যারিসে চলে গেলেন।

প্যারিসে হ্যানিম্যানের খ্যাতি আকাশছোঁয়া হয়ে উঠল। উচ্চশ্রেণির মানুষ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ — সবাই এলেন তাঁর কাছে। তিনি শেষ দিন পর্যন্ত চিকিৎসা করে গেছেন।

১৮৪৩ সালের ২ জুলাই, ৮৮ বছর বয়সে প্যারিসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন হোমিওপ্যাথির এই মহান স্রষ্টা।


ভারতে হোমিওপ্যাথির গল্প — রাজার রোগ থেকে সাধারণ মানুষের ওষুধ

ভারতে হোমিওপ্যাথির ঐতিহাসিক যাত্রা
ভারতে হোমিওপ্যাথির ঐতিহাসিক যাত্রা

ভারতবর্ষে হোমিওপ্যাথির প্রবেশ হয়েছিল এক রোমাঞ্চকর পথে। ১৮১০ সালে কলকাতায় একজন অজ্ঞাতনামা জার্মান ভূতাত্ত্বিক প্রথম এই ওষুধ নিয়ে এসেছিলেন, খনি শ্রমিকদের মধ্যে বিনামূল্যে দিয়েছিলেন। প্রায় একই সময়ে ভবানীপুরে এক মিশনারি ডাক্তারও চিকিৎসা দিতে শুরু করেন।

কিন্তু আসল মোড় ঘুরল ১৮৩৯ সালে। ডক্টর জন মার্টিন হোনিগবার্গার, যিনি ১৮৩৫ সালে প্যারিসে স্বয়ং হ্যানিম্যানের কাছে হোমিওপ্যাথি শিখেছিলেন, তিনি পাঞ্জাবে এসে মহারাজা রঞ্জিত সিংহের কণ্ঠনালীর পক্ষাঘাত সারিয়ে তুললেন।

মহারাজা কোনো ইউরোপীয় ওষুধ নিতে রাজি ছিলেন না। হোনিগবার্গার তাঁর চোখের সামনেই মাত্র এক ফোঁটা ডালকামারা ৩এক্স চিনির ডেলায় মিশিয়ে দিলেন। ফলাফল দেখে মহারাজা অবাক। তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন। এরপর মহারাজার প্রিয় ঘোড়ার পায়ের ক্ষত সারিয়ে হোনিগবার্গার হয়ে উঠলেন রাজসভার প্রধান রাজবৈদ্য।

তারপর এল বাবু রাজেন্দ্র লাল দত্তের পালা। কলকাতার এই বিদ্যানুরাগী মানুষটি নিজের দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে হোমিওপ্যাথিতে সুস্থ হওয়ার পর এই চিকিৎসার অনুরাগী হয়ে পড়লেন। ১৮৬১ সালে ম্যালেরিয়া মহামারীর সময় নিজে থেকে চিকিৎসা শুরু করলেন।

তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল ১৮৬৩ সালে। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বহুদিনের মাইগ্রেন তিনি সারিয়ে তুললেন। শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেবের পায়ের গ্যাংগ্রিন ঠিক করলেন। এরপর থেকে কলকাতার শিক্ষিত সমাজে হোমিওপ্যাথির প্রতি আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে গেল।

কিন্তু রাজেন্দ্র লালের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল অন্য কিছু। তিনি একজন নামকরা অ্যালোপ্যাথ চিকিৎসককে হোমিওপ্যাথিতে আনলেন।

ডক্টর মহেন্দ্রলাল সরকার — কলকাতার বিখ্যাত অ্যালোপ্যাথ ডাক্তার। প্রথমে ছিলেন হোমিওপ্যাথির তীব্র বিরোধী। রাজেন্দ্র লালের অনুরোধে তিনি উইলিয়াম মরগানের একটা বই পড়লেন, তারপর নিজে পর্যবেক্ষণ করলেন। যা দেখলেন তাতে মত পাল্টে গেল সম্পূর্ণ।

১৮৬৭ সালে বেঙ্গল ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সভায় তিনি প্রকাশ্যে হোমিওপ্যাথির শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করলেন। এর ফলে তৎকালীন অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক সমাজ তাঁকে সামাজিকভাবে বর্জন করল। আর্থিক ক্ষতি হল। কিন্তু তিনি দমলেন না।

১৮৬৮ সালে প্রকাশ করলেন এশিয়ার প্রথম হোমিওপ্যাথিক জার্নাল — The Calcutta Journal of Medicine

মজার বিষয় হল, এই ডক্টর মহেন্দ্রলাল সরকারই পরে Indian Association for the Cultivation of Science বা IACS প্রতিষ্ঠা করেছিলেন — যেখানে পরে স্যার সি.ভি. রামন তাঁর বিখ্যাত রামন এফেক্ট আবিষ্কার করেন।

১৮৮১ সালে ডক্টর প্রতাপ চন্দ্র মজুমদার ও রাজেন্দ্র লাল দত্তের যৌথ প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হল ভারতের প্রথম হোমিওপ্যাথিক কলেজ — ক্যালকাটা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ।


দক্ষিণ ভারতে হোমিওপ্যাথি — বটের তলে শুরু হয়েছিল যে চিকিৎসা

দক্ষিণ ভারতে হোমিওপ্যাথির ছড়িয়ে পড়ার পেছনে একটা চমৎকার গল্প আছে।

১৮৮০ সালে ম্যাঙ্গালোরে এলেন ফাদার অগাস্টাস মুলার। তিনি ছিলেন হ্যানিম্যানের গৃহশিক্ষক অগাস্টিন মুলারের নাতি। সেন্ট অ্যালয়সিয়াস কলেজের ক্যাম্পাসে একটা বটগাছের তলে বসে দরিদ্র মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা শুরু করলেন।

এই বটতলার চিকিৎসা ধীরে ধীরে বড় হল। ১৮৮৩ সালে হল কুষ্ঠ হাসপাতাল। ১৯০২ সালে ভয়ঙ্কর প্লেগ মহামারীর সময় মাত্র চার সপ্তাহে তৈরি করলেন অস্থায়ী চিকিৎসালয়।

কেরালায় হোমিওপ্যাথির জনপ্রিয়তা এতটাই বাড়ল যে ১৯২৮ সালে ট্রাভাঙ্কোরের মহারাজা রাষ্ট্রীয়ভাবে হোমিওপ্যাথিকে স্বীকৃতি দিলেন। ১৯৭৫ সালে কালিকটে এশিয়ার প্রথম সরকারি হোমিওপ্যাথিক ডিগ্রি কলেজ চালু হল।

ভারতে হোমিওপ্যাথির প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের গল্পটা একটু একটু করে সরকারি স্তরে পৌঁছাল। ১৯৭৩ সালে ভারত সরকার কেন্দ্রীয় হোমিওপ্যাথি কাউন্সিল অ্যাক্ট পাস করল। ১৯৯৫ সালে আলাদা বিভাগ তৈরি হল। ২০১৪ সালে তৈরি হল স্বাধীন আয়ুষ মন্ত্রক। ২০২০ সালে পুরনো কাউন্সিল বিলুপ্ত করে এল নতুন জাতীয় হোমিওপ্যাথি কমিশন।


বিজ্ঞান কী বলছে? — একটা সৎ আলোচনা

হোমিওপ্যাথি_ বিজ্ঞান কী বলছে
হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞান কী বলছে

হোমিওপ্যাথি নিয়ে লেখা সম্পূর্ণ হবে না যদি বৈজ্ঞানিক বিতর্কের কথা না বলি।

মূলধারার বিজ্ঞানীরা হোমিওপ্যাথিকে প্রায়ই প্লাসিবো থেরাপি বলেন। কারণটা রসায়নের একটা সহজ হিসেব থেকে আসে। যদি কোনো ওষুধকে ধারাবাহিকভাবে লঘু করতে করতে ১২সি বা তার বেশি শক্তিতে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে সেই দ্রবণে মূল উপাদানের একটা অণুও আর থাকার কথা নয় রসায়নের সূত্র মেনে।

তাহলে কাজ করে কেন?

এখানেই বিতর্ক। কোচরান রিভিউ-সহ অনেক মেটা-অ্যানালিসিস বলছে, হোমিওপ্যাথির প্রভাব প্লাসিবোর বাইরে আলাদা জৈবিক প্রভাব দেখাতে পারেনি। ৩০৮টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্যে ৪১ শতাংশ ইতিবাচক, ৩ শতাংশ নেতিবাচক, আর বাকি ৫৬ শতাংশের ফলাফল অনির্ণীত।

তবে এখানে একটা নতুন গবেষণার কথাও বলা দরকার। আধুনিক ন্যানো-প্রযুক্তির গবেষকরা দেখছেন যে হোমিওপ্যাথিক প্রক্রিয়ায় তীব্র ঝাঁকুনির ফলে ওষুধের কণাগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র ন্যানো-পার্টিকেল হয়ে কলয়েডাল অবস্থায় রূপ নিতে পারে। এই ন্যানো-পার্টিকেল কোষের সংকেত আদান-প্রদানে প্রভাব ফেলতে পারে কিনা — এই নিয়ে গবেষণা চলছে।


ব্যানার্জি প্রোটোকল — ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন আলো?

কলকাতার ডা. প্রশান্ত ব্যানার্জি এবং তাঁর পুত্র ডা. প্রতীপ ব্যানার্জি হোমিওপ্যাথির একটা ভিন্নধর্মী অধ্যায় লিখেছেন — যা বিশ্বজুড়ে পরিচিত ব্যানার্জি প্রোটোকল নামে।

প্রচলিত হোমিওপ্যাথিতে প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা ওষুধ নির্বাচন করা হয় ব্যক্তিভেদে। ব্যানার্জি প্রোটোকলে আধুনিক রোগ নির্ণয়ের সাথে মিলিয়ে নির্দিষ্ট রোগের জন্য নির্দিষ্ট ওষুধের সংমিশ্রণ ব্যবহার করা হয়।

১৯৯৯ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট কলকাতার ব্যানার্জি ক্লিনিকের ১০ জন ক্যান্সার রোগীর কেস স্টাডি পর্যালোচনা করে আরও গভীর গবেষণার সুপারিশ করে।

বিখ্যাত এমডি অ্যান্ডারসন ক্যান্সার সেন্টারের গবেষকদের সাথে যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, রূটা গ্র্যাভিওলেন্স নামের ওষুধ মস্তিষ্কের ক্যান্সার কোষে নির্বাচনীভাবে কোষ-মৃত্যু ঘটাতে পারে, সুস্থ কোষের ক্ষতি না করে। এই গবেষণাটা এখনও বিতর্কিত, কিন্তু বৈজ্ঞানিক মহলে আলোচনার সূচনা করেছে।


শেষ কথা

চীনামাটির কারখানার একজন শ্রমিকের ছেলে থেকে প্যারিসের বিখ্যাত চিকিৎসক — হ্যানিম্যানের জীবন ছিল এক অদ্ভুত যাত্রা। দারিদ্র্য, বিরোধিতা, নির্বাসন — সব কিছু পার করেও তিনি যা বিশ্বাস করতেন তা থেকে সরে আসেননি।

হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞানসম্মত কিনা — এই বিতর্ক চলছে এবং চলবে। কিন্তু একটা কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন চিকিৎসা মানেই ছিল নিষ্ঠুরতা, তখন হ্যানিম্যান রোগীর কষ্ট কমানোর কথা ভেবেছিলেন, “প্রাইমাম নন নোসেরে” — অর্থাৎ প্রথমত কোনো ক্ষতি করো না — এই নীতিতে বিশ্বাস রেখেছিলেন।

সেটুকু তাঁর স্থায়ী অবদান। আর বাকিটা নিয়ে বিজ্ঞান তার কাজ করতে থাকুক।

আরো পড়ুন: থেলস: গ্রিক দর্শনের জনক ও বিজ্ঞানের আদি পথিকৃৎ

আরো পড়ুন: অ্যারিস্টটল: যে বিজ্ঞানী ২,০০০ বছর ধরে পৃথিবীর চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন

Leave a Comment