একটা মানুষ, যিনি প্রতিদিন রাস্তায় হাঁটতেন আর মানুষের বোকামি দেখে হাসতেন। প্রতিবেশীরা ভাবত লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই “পাগল” মানুষটাই আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে এমন একটা তত্ত্ব দিয়ে গেছেন, যা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একদম ভিত্তিপ্রস্তর। তাঁর নাম ডিমোক্রিটাস। আবডেরার সেই হাসিখুশি দার্শনিক, যাঁকে ইতিহাস স্মরণ করে “দ্য লাফিং ফিলোসফার” নামে।
আজ একটু গভীরে গিয়ে দেখা যাক, এই মানুষটা আসলে কী ভেবেছিলেন, কেন ভেবেছিলেন, আর কীভাবে তাঁর চিন্তা আজও আমাদের চারপাশের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন আর এমনকি দর্শনের মধ্যে বেঁচে আছে।
জন্ম, ভ্রমণ আর এক অস্থির জ্ঞানপিপাসু মন

খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০ অব্দে থ্রেস অঞ্চলের সমৃদ্ধ শহর আবডেরায় ডিমোক্রিটাসের জন্ম। বাবা ছিলেন বিত্তবান, প্রভাবশালী মানুষ। কিন্তু সেই বিত্তটাকে ডিমোক্রিটাস ভোগের জন্য খরচ করেননি — পিতার মৃত্যুর পর সম্পত্তির ভাগ পেয়ে তিনি সোজা বের হয়ে পড়েছিলেন পৃথিবী দেখতে।
ভাবুন তো, আজকের যুগে প্লেন, ইন্টারনেট, গুগল ম্যাপ সব আছে, তাও আমরা এক জায়গায় বসে থাকি। আর সেই প্রাচীন যুগে এই মানুষটা পাঁচ বছর কাটিয়ে দিয়েছিলেন মিশরে, পুরোহিতদের কাছে জ্যামিতি শিখতে। তারপর পারস্যে গিয়ে ক্যালডীয় জ্যোতিষীদের কাছ থেকে শিখেছেন ধর্মতত্ত্ব আর আকাশ দেখার বিদ্যা। কিছু বর্ণনায় এমনও আছে যে তিনি লোহিত সাগর পার করে ব্যাবিলন, ইথিওপিয়া, এমনকি ভারতবর্ষেও গিয়েছিলেন — যদিও এই শেষ দাবিটা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে এখনও মতবিরোধ আছে।
নিজেই বলেছিলেন, তাঁর সময়ের আর কোনো মানুষ তাঁর মতো এত পথ পাড়ি দেয়নি, এত রকম জলবায়ু আর সংস্কৃতি দেখেনি। এটা অহংকার নয়, এটা একজন প্রকৃত জ্ঞানপিপাসুর সততার স্বীকারোক্তি।
দেশে ফিরে এসে তিনি হয়ে ওঠেন এক সম্মানিত, কিন্তু একইসাথে রহস্যময় চরিত্র। মানুষ দেখত, তিনি প্রায়ই একা একা হাসছেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতেন — মহাবিশ্বের অসীমতার সামনে মানুষের ভয়, কুসংস্কার, লোভ — এসব এত ক্ষুদ্র যে হাসি না পেলে আর কী করার থাকে!
তাঁর মৃত্যুর গল্পটাও কম চমকপ্রদ নয়। শোনা যায়, যখন তিনি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে, তখন তাঁর বোন একটা ধর্মীয় উৎসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন — দাদা মারা গেলে উৎসবের পবিত্রতা নষ্ট হবে। ডিমোক্রিটাস তখন নাকের কাছে গরম রুটির গন্ধ রেখে নিজের মৃত্যুকে তিনদিন পিছিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে বোন নির্বিঘ্নে উৎসব শেষ করতে পারেন। উৎসব শেষ হলে তিনি শান্তিতে চলে যান। বয়স তখন কারো মতে ৯০, কারো মতে ১০৯।
যে সংকট থেকে জন্ম নিল পরমাণুর ধারণা
এখন প্রশ্ন হলো — ডিমোক্রিটাস আকাশ থেকে পড়ে পরমাণুর কথা বলেননি। তাঁর আগে গ্রিক দর্শনে একটা বড় মাথাব্যথা চলছিল।
পারমেনাইডিস নামের এক দার্শনিক যুক্তি দিয়েছিলেন — কোনো বস্তু যদি বদলায়, তাহলে তাকে এমন কিছুতে বদলাতে হবে যা আগে ছিল না। মানে শূন্য থেকে কিছু তৈরি হওয়া। আর শূন্য থেকে কিছু তৈরি হওয়া অসম্ভব। তাই তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল ভয়ংকর রকম চমকপ্রদ — মহাবিশ্বে আসলে কোনো পরিবর্তনই হয় না, যা দেখি সব চোখের ভুল।
এই যুক্তির ফাঁদ থেকে বাঁচতে এম্পেডোক্লেস একটা পথ দেখান। তিনি বলেন, চার রকম মৌলিক উপাদান আছে — আগুন, জল, মাটি, বাতাস — আর প্রেম ও ঘৃণা নামের দুটো শক্তি এদের জোড়া লাগায় বা আলাদা করে। সমস্যা হলো, এই তত্ত্বে শূন্যস্থানের কোনো জায়গা ছিল না — সবকিছু নিরেট, ঠাসাঠাসি।
এখানেই ডিমোক্রিটাস আর তাঁর শিক্ষক লিউসিপ্পাস একটা অসাধারণ চাল চাললেন। তাঁরা বললেন — শূন্যস্থানও বাস্তব। “নেই” বলেও একটা অস্তিত্ব আছে। যেহেতু আমরা প্রতিদিন গতি দেখি, আর গতি ঘটতে হলে কিছু চলাফেরার জায়গা লাগে, তাই শূন্যস্থান মানতেই হবে। আর সেই অসীম শূন্যস্থানে অসংখ্য ক্ষুদ্র, অবিভাজ্য কণা — যাদের নাম দিলেন “অ্যাটোমোস”, মানে যাকে আর কাটা যায় না — তারাই নিজেদের নতুন বিন্যাসে যুক্ত-বিচ্ছিন্ন হয়ে পরিবর্তন তৈরি করে।
তিনটে চিন্তাধারার এই তফাতটা একটু খোলাসা করে বলা যাক। পারমেনাইডিসের জগতে সবকিছু এক, স্থির, অবিভাজ্য — গতি বলে কিছু নেই, শূন্যস্থানের অস্তিত্বই নেই। এম্পেডোক্লেসের জগতে চার উপাদান আর দুটো শক্তি দিয়েই সব ব্যাখ্যা, কিন্তু শূন্যস্থানের প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আর ডিমোক্রিটাসের জগতে — অসংখ্য পরমাণু, অসীম শূন্যস্থান, আর পরমাণুর নতুন বিন্যাসই পরিবর্তনের আসল কারণ। তিনটে আলাদা উত্তর, একই প্রশ্নের — আর তিনটের মধ্যে ডিমোক্রিটাসের উত্তরটাই সবচেয়ে বেশি টিকে থেকেছে।
আকৃতিই বলে দেয় বস্তুর চরিত্র
ডিমোক্রিটাসের পরমাণু তত্ত্বে একটা অদ্ভুত সুন্দর ব্যাপার আছে। তিনি ভাবতেন, পরমাণুর নিজস্ব রং বা স্বাদ বলে কিছু নেই — শুধু আকৃতির ভিন্নতা। আর সেই আকৃতিই নির্ধারণ করে দেয় বস্তুটা কেমন হবে।
লোহার পরমাণুর গায়ে আছে হুক বা কাঁটার মতো খাঁজ — মনে করুন আজকের ভেলক্রোর মতো — যার কারণে তারা একে অপরের সঙ্গে শক্তভাবে আটকে থাকে আর লোহা হয়ে যায় কঠিন। জলের পরমাণু একদম মসৃণ, গোলাকার, তাই একে অপরের ওপর দিয়ে অনায়াসে গড়িয়ে যায় — তাই জল তরল। আর আগুন আর আত্মার পরমাণু সবচেয়ে সূক্ষ্ম, গোলাকার আর সবচেয়ে দ্রুতগামী।
এই চিন্তাটা শুনতে সহজ লাগলেও আসলে অসাধারণ। কোনো অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়াই, কেবল যুক্তি দিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন কেন একটা পদার্থ কঠিন আর আরেকটা তরল। আজকের রসায়নবিদ্যার অণু-পরমাণুর বিন্যাস তত্ত্বের সাথে এর একটা অদ্ভুত সাদৃশ্য আছে।
আর সবচেয়ে বিপ্লবী যে কথাটা তিনি বলেছিলেন, তা হলো — মহাবিশ্ব চলে যান্ত্রিক নিয়মে, কোনো দেবতা বা উদ্দেশ্য এর পেছনে নেই। অসীম শূন্যস্থানে অগণিত পরমাণু এলোমেলো ঘুরে বেড়ায়, একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, আর সেই সংঘর্ষ থেকেই জন্ম নেয় সব বস্তু। দেবতাদের ইচ্ছার বদলে এই যান্ত্রিক কার্যকারণ সূত্র মানাটা তখনকার গ্রিক সমাজে রীতিমতো ধাক্কা দেওয়ার মতো ব্যাপার ছিল।
দুই রকমের জ্ঞান — একটা প্রতারক, একটা সত্য

এখানে ডিমোক্রিটাসের চিন্তা আরেক ধাপ গভীরে যায়। যদি মহাবিশ্বে শুধু পরমাণু আর শূন্যস্থান থাকে, তাহলে রং, স্বাদ, গন্ধ — এসব কোথা থেকে আসে?
তিনি একটা চমৎকার বিভাজন টানলেন। বস্তুর আকার, আকৃতি, ওজন, গতি — এসব সত্যিকারের, বাস্তব, পরমাণুর নিজস্ব গুণ। কিন্তু রং বা স্বাদের কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই — এগুলো তৈরি হয় যখন বস্তুর পরমাণু আমাদের ইন্দ্রিয়ের পরমাণুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। তাঁর নিজের ভাষায়, প্রথাগতভাবে মিষ্টি মিষ্টি, তিক্ত তিক্ত — কিন্তু বাস্তবে আছে শুধু পরমাণু আর শূন্যস্থান।
এই ব্যাখ্যাটাকে তিনি আরও এগিয়ে নিয়ে গেলেন একটা তত্ত্বের মাধ্যমে — “আইডোলা” বা প্রতিচ্ছবি। প্রতিটা বস্তু থেকে নাকি পরমাণুর পাতলা একটা আস্তরণ প্রতিনিয়ত নির্গত হয়, যা বাতাসের মধ্য দিয়ে ভেসে গিয়ে আমাদের চোখে প্রবেশ করে। আমাদের শরীরের ভেতরের পরমাণু আর বাইরে থেকে আসা এই আইডোলার সংঘর্ষেই আমরা দেখি, স্পর্শ অনুভব করি।
এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি মানুষের জ্ঞানকে দুটো ভাগে ভাগ করলেন। একটা হলো ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান — দেখা, শোনা, স্বাদ নেওয়া, স্পর্শ করা, গন্ধ পাওয়া — এসবের মাধ্যমে যা পাই। এই জ্ঞানকে তিনি বলতেন “অবৈধ” বা অসম্পূর্ণ জ্ঞান, কারণ এটা আমাদের বস্তুর গৌণ গুণাবলী দেখায় মাত্র — আসল রূপ নয়, বরং একটা বিভ্রম। আর আরেকটা হলো যুক্তি আর বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাওয়া জ্ঞান — এটাকে তিনি বলতেন “বৈধ” বা প্রকৃত জ্ঞান। এই জ্ঞানই নির্ভরযোগ্য, কারণ যখন ইন্দ্রিয় ব্যর্থ হয়, তখন প্রজ্ঞাই আমাদের নিয়ে যায় পরমাণু আর শূন্যস্থানের মতো চূড়ান্ত সত্যের কাছে।
কিন্তু এখানে একটা মজার সমস্যা আছে, যা ডিমোক্রিটাস নিজেও স্বীকার করেছিলেন। মন যদি ইন্দ্রিয়কে অবিশ্বাস করে, তাহলে মন আসলে তথ্য পায় কোথা থেকে? ইন্দ্রিয় থেকেই তো! তিনি এক কাল্পনিক সংলাপে দেখিয়েছিলেন, ইন্দ্রিয়রা মনকে বলছে — তুমি আমাদের বাতিল করছ, কিন্তু তোমার সব যুক্তির উৎস তো আমরাই। এই দ্বন্দ্বটা আজও দর্শন আর স্নায়ুবিজ্ঞানের আলোচনায় ঘুরেফিরে আসে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে যা দেখেছিলেন তিনি

ডিমোক্রিটাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হয়তো তাঁর মহাকাশ-চিন্তা।
আকাশে রাতের বেলা যে আলোর স্রোত দেখা যায় — আমরা যাকে ছায়াপথ বলি — অ্যারিস্টটল এটাকে ভেবেছিলেন বায়ুমণ্ডলীয় কোনো জ্বলন্ত ঘটনা। কিন্তু ডিমোক্রিটাস, কোনো টেলিস্কোপ ছাড়াই, শুধু যুক্তি দিয়ে দাবি করেছিলেন — এটা আসলে অগণিত দূরবর্তী নক্ষত্রের ঘন সমাবেশ, যাদের আলো এতটাই কাছাকাছি যে আলাদা করে চেনা যায় না। প্রায় দুই হাজার বছর পরে গ্যালিলিও যখন টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ দেখলেন, ডিমোক্রিটাসের এই দাবিই প্রমাণিত হলো।
আরও অদ্ভুত তাঁর “বহু বিশ্বের” ধারণা। অসীম শূন্যস্থানে যখন অসংখ্য পরমাণু ঘুরে বেড়ায়, তখন তারা মাঝে মাঝে একটা ঘূর্ণনের সৃষ্টি করে — সেই ঘূর্ণনে ভারী পরমাণু কেন্দ্রে জমা হয়, হালকা পরমাণু বাইরে ছিটকে যায়, আর তাতে জন্ম নেয় একটা নতুন বিশ্ব। যেহেতু শূন্যস্থান অসীম আর পরমাণুর কোনো অভাব নেই, তাই কেবল আমাদের এই একটা পৃথিবী থাকার কোনো কারণ নেই — মহাকাশে আছে অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন জগৎ, কোথাও সূর্য নেই, কোথাও একাধিক চাঁদ, কোথাও জীবন আছে, কোথাও নেই। আজকের “মাল্টিভার্স” তত্ত্বের সঙ্গে এর মিল অবাক করার মতো।
তবে মজার বিষয় হলো, এত দূরদর্শী চিন্তা করেও পৃথিবীর আকার নিয়ে তিনি ছিলেন বেশ সাবেকি। পিথাগোরিয়ানরা গাণিতিক যুক্তিতে পৃথিবীকে গোলাকার বলতেন, কিন্তু ডিমোক্রিটাস মনে করতেন পৃথিবী একটা চ্যাপ্টা ডিস্ক, মাঝখানটা একটু অবতল। কারণ তিনি গাণিতিক অনুমানের চেয়ে চোখে দেখা প্রমাণে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন।
গণিতে এক নিঃশব্দ বিপ্লব

ডিমোক্রিটাসকে আমরা দার্শনিক বলেই বেশি চিনি, কিন্তু গণিতে তাঁর অবদান প্রায় বিস্মৃত। আর্কিমিডিসের এক হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থ, যা ১৯০৬ সালে আবিষ্কৃত হয়, সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে — শঙ্কুর আয়তন সমান উচ্চতা ও ভূমির চোঙের আয়তনের ঠিক এক-তৃতীয়াংশ, আর পিরামিডের আয়তন প্রিজমের এক-তৃতীয়াংশ — এই দুটো সত্য প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন ডিমোক্রিটাসই। ইউডক্সাস পরে এর কঠোর প্রমাণ দিয়েছিলেন, কিন্তু আবিষ্কারের কৃতিত্ব ডিমোক্রিটাসের।
তিনি একটা প্যারাডক্সও রেখে গেছেন, যা শুনলে মাথা ঘুরে যায়। যদি একটা শঙ্কুকে তার ভূমির সমান্তরালে কাটা হয়, তাহলে কাটা অংশগুলোর পৃষ্ঠতল কি সমান হবে নাকি অসমান? অসমান হলে শঙ্কুর গা সিঁড়ির মতো খাঁজকাটা হয়ে যাবে, যা মসৃণ শঙ্কুর ধারণার বিরোধী। আর সমান হলে শঙ্কুটা তো আর শঙ্কু থাকবে না, চোঙ হয়ে যাবে। এই চিন্তাটাই আসলে অসীম সংখ্যক পাতলা চাকতির সমষ্টি দিয়ে একটা ঠোস বস্তুকে কল্পনা করার প্রথম প্রচেষ্টা — যা পরে আর্কিমিডিস কাজে লাগান, আর যাকে আমরা আজ ক্যালকুলাসের আদিরূপ বলতে পারি।
জীবনের উৎপত্তি আর মানুষের আদি ইতিহাস
প্রাচীন গ্রিকদের অনেকেই বিশ্বাস করতেন, কাদা বা পচা মাংস থেকে আপনাআপনি প্রাণের জন্ম হয় — এই তত্ত্বকে বলা হয় স্বতঃস্ফূর্ত প্রজনন। ডিমোক্রিটাসও এতে বিশ্বাসী ছিলেন, তবে তাঁর ব্যাখ্যাটা ছিল আরও যান্ত্রিক। পৃথিবী যখন আদিম, কাদাময়, উষ্ণ ছিল, তখন বিশেষ সূক্ষ্ম পরমাণুর সঙ্গে আর্দ্রতার মিশ্রণে বুদবুদের মতো আবরণ তৈরি হয়, আর সেখান থেকেই উদ্ভিদ আর প্রাণীর জন্ম। এম্পেডোক্লেসের চেয়ে এই ব্যাখ্যা অনেক বেশি সুসংগত আর কম এলোমেলো।
হাজার বছর ধরে এই তত্ত্ব বিজ্ঞানীরা মেনে নিয়েছিলেন, যতদিন না সপ্তদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সেস্কো রেডি আর উনিশ শতকে লুই পাস্তুর পরীক্ষা করে দেখান এটা সত্য নয়। তাও, প্রাণের উৎপত্তিকে দেবতাদের হাত থেকে ছাড়িয়ে যান্ত্রিক ব্যাখ্যার আওতায় আনার চেষ্টাটাই ছিল বৈজ্ঞানিক চিন্তার একটা বড় পদক্ষেপ।
মানুষের আদি ইতিহাস নিয়েও তাঁর ভাবনা ছিল অনেকটা আধুনিক নৃতত্ত্বের কাছাকাছি — আদিম মানুষ প্রথমে বিচ্ছিন্নভাবে বন্য প্রাণীর মতো বাঁচত, পরে হিংস্র প্রাণীর ভয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে ভাষা আর সমাজ তৈরি করে।
সুখের সংজ্ঞা — ইউথিমিয়া

ডিমোক্রিটাসের নীতিবিদ্যাটাও বেশ চমৎকার। তাঁর মতে জীবনের লক্ষ্য হলো “ইউথিমিয়া” — এক ধরনের প্রশান্তি, মানসিক স্থিরতা। এটা টাকা, ক্ষমতা বা ক্ষণিক সুখে নেই, বরং পরিমিতি আর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায়।
তাঁর পরমাণু তত্ত্ব অনুযায়ী, আত্মা গঠিত হয়েছে আগুনের মতো সূক্ষ্ম, গোলাকার, দ্রুতগামী পরমাণু দিয়ে। মৃত্যুর পর এই পরমাণু ছড়িয়ে যায় মহাশূন্যে — তার মানে মৃত্যুর পর আত্মা বা চেতনার কোনো অস্তিত্ব থাকে না। শুনতে নিরাশাজনক লাগতে পারে, কিন্তু আসলে এটা একটা মুক্তির বার্তা — মৃত্যুভয় বা নরকভয়ের কোনো জায়গা এখানে নেই। এই চিন্তাটাই পরে এপিকিউরাস আরও বিস্তৃত করেছিলেন।
কার্ল মার্ক্স কেন ডিমোক্রিটাসকে নিয়ে থিসিস লিখলেন
এটা একটা চমকপ্রদ ব্যাপার যা অনেকেই জানে না। ১৮৪১ সালে কার্ল মার্ক্স তাঁর ডক্টরাল থিসিস লিখেছিলেন ডিমোক্রিটাস আর এপিকিউরাসের প্রকৃতি দর্শনের তুলনায়।
মার্ক্স দেখিয়েছিলেন, ডিমোক্রিটাস ছিলেন কট্টর নিয়তিবাদী — তাঁর জগতে পরমাণুর গতি সম্পূর্ণ “প্রয়োজনীয়তা” দিয়ে নিয়ন্ত্রিত, কোনো স্বাধীন ইচ্ছার জায়গা নেই। অথচ এপিকিউরাস এই কাঠামোতেই একটা নতুন ধারণা যুক্ত করেন — “ক্লিনামেন” বা পরমাণুর স্বতঃস্ফূর্ত বিচ্যুতি। মার্ক্সের মতে, এই বিচ্যুতিই প্রমাণ করে বস্তুর নিজস্ব সক্রিয়তা আছে, আর এখান থেকেই মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার দার্শনিক বীজ বপন হয়। মার্ক্স ডিমোক্রিটাসকে বস্তুবাদের আদি জনক স্বীকার করলেও এপিকিউরাসকে দিয়েছিলেন আরও বড় সম্মান — গ্রিক দর্শনের শ্রেষ্ঠ আলোকবর্তিকা।
সত্তর-আশিটা বই, আর সবই হারিয়ে গেল

ডায়োজিনিস ল্যার্টিয়াসের বিবরণ বলছে, ডিমোক্রিটাস সত্তর থেকে আশিটা গ্রন্থ লিখেছিলেন। বিষয়ভিত্তিক একটা ভাগ করলে দেখা যায় তাঁর কাজের পরিধি কতটা বিস্তৃত ছিল।
নীতিবিদ্যায় লিখেছিলেন পিথাগোরাস, অফ ট্রাঙ্কুইলিটি, অফ ভার্চ্যু, অফ দ্য গুডের মতো গ্রন্থ। প্রকৃতি বিজ্ঞান আর মহাকাশ নিয়ে দ্য গ্রেট ডায়াকসমস, দ্য লেসার ডায়াকসমস, অন নেচার, অন দ্য প্ল্যানেটস। গণিতে অন নাম্বারস, অন জ্যামিতিকস, অন ম্যাপিং, অন ট্যাঞ্জেন্সিস। জীববিজ্ঞান আর চিকিৎসায় অন ফ্লেশ, অন অ্যানিম্যালস, অন প্ল্যান্টস, অন দ্য সেন্সেস। আর শিল্প-সাহিত্য-ভাষা নিয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল, লিখেছিলেন অন পোয়েট্রি, অন পেইন্টিং, অন ডিকশন, দ্য আর্ট অফ রেটরিক।
এত বিচিত্র বিষয়ে কাজ করার সাহস সত্যিই বিরল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই গ্রন্থগুলোর একটাও আজ সম্পূর্ণ অবস্থায় টিকে নেই। সিসেরো তাঁর গদ্যশৈলীকে প্লেটোর সমকক্ষ বলেছিলেন। প্লেটো নাকি তাঁর তত্ত্বে এতটাই বিরক্ত হয়েছিলেন যে তাঁর সব বই পুড়িয়ে ফেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আর অ্যারিস্টটল, যিনি পরমাণুবাদের কট্টর সমালোচক ছিলেন, তিনিও ডিমোক্রিটাসকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন যে তাঁর তত্ত্ব খণ্ডন করার জন্য আস্ত একটা মনোগ্রাফ লিখেছিলেন। যাঁকে খণ্ডন করতে এত পরিশ্রম লাগে, তিনি যে কতটা শক্তিশালী চিন্তক ছিলেন, এটাই তার প্রমাণ।
আবিষ্কারক কে — ডিমোক্রিটাস নাকি লিউসিপ্পাস?
এখানে একটা পুরনো বিতর্কের কথা না বললে গল্পটা অসম্পূর্ণ থাকবে। ডিমোক্রিটাসকে পরমাণুবাদের প্রবর্তক বলা হলেও, ইতিহাসে লিউসিপ্পাস নামেও একজন গ্রিক দার্শনিকের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাঁকে অনেকে আসল প্রবর্তক মনে করেন। সত্যি বলতে, কে প্রথম এই ধারণা দিয়েছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। এমনও বলা হয়, ডিমোক্রিটাস আর লিউসিপ্পাসের আগেও কিছু গ্রিক দার্শনিক একই বিষয়ে ভেবেছিলেন। তবে এটা ঠিক, ডিমোক্রিটাসের হাতেই এই তত্ত্ব সবচেয়ে পরিণত আর সুসংগঠিত রূপ পায়।
পরবর্তী যুগে, অষ্টাদশ-উনবিংশ শতকে জন ডাল্টন পরমাণু নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, কিন্তু সেই গবেষণাও ত্রুটিমুক্ত ছিল না। তবু এটা স্বীকার করতেই হবে — হাতে-কলমে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই, কেবল যুক্তি দিয়ে ডিমোক্রিটাস যে পরমাণুবাদ প্রচার করেছিলেন, তা ছিল তাঁর গভীর চিন্তার এক অসামান্য প্রমাণ। সেই কারণেই তাঁকে পরমাণুবাদের প্রথম প্রবক্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
মজার বিষয় হলো, প্লেটো আর অ্যারিস্টটলের ঘোর বিরোধিতার কারণে ডিমোক্রিটাসের এই তত্ত্ব তাঁর সময়ের পরে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করেছিল। ইউরোপের নবজাগরণের সময় গ্রিক পণ্ডিতদের গবেষণা পুনরায় খুঁজতে গিয়েই পশ্চিমা পণ্ডিতদের নজর পড়ে ডিমোক্রিটাসের ওপর। সেই থেকেই তিনি পরমাণুবাদের আদি জনক হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেলেন।
শেষ কথা
ডিমোক্রিটাস এমন এক যুগের মানুষ ছিলেন, যখন বিজ্ঞান আর দর্শনের কোনো স্পষ্ট সীমারেখা ছিল না। অথচ তিনি দেবতা বা পুরাণের আশ্রয় না নিয়ে, কেবল যুক্তি আর পর্যবেক্ষণ দিয়ে মহাবিশ্বকে বুঝতে চেয়েছিলেন। প্রায় দুই হাজার বছর পরে জন ডাল্টন যখন পরমাণু নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালালেন, তখন প্রমাণিত হলো — সেই হাসিখুশি প্রাচীন মানুষটা দিক ভুল করেননি।
তাঁর তত্ত্ব আর ডাল্টনের তত্ত্বে অবশ্যই অনেক ফারাক আছে — ডিমোক্রিটাসের পরমাণু ছিল দার্শনিক অনুমানের ফসল, ডাল্টনের পরমাণু পরীক্ষার ফল। কিন্তু বস্তুর নিত্যতা, গতির চিরন্তনতা, ক্ষুদ্রতম কণা দিয়ে জগৎ ব্যাখ্যা করার যে ভিত্তি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে, তার শুরুটা ওই আবডেরার এক হাসিখুশি মানুষের মাথা থেকেই।
যে মানুষ মানুষের মূর্খতা দেখে হাসতেন, তিনিই হয়তো সবচেয়ে গভীরভাবে বুঝেছিলেন এই মহাবিশ্বকে। আর সেই হাসির আড়ালে ছিল এমন এক যৌক্তিক, বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি, যা পশ্চিমা সভ্যতার বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।
আরো পড়ুন: থেলস: গ্রিক দর্শনের জনক ও বিজ্ঞানের আদি পথিকৃৎ
আরো পড়ুন: অ্যারিস্টটল: যে বিজ্ঞানী ২,০০০ বছর ধরে পৃথিবীর চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন
- ডিমোক্রিটাস: যে মানুষটা হাসতে হাসতে মহাবিশ্বের রহস্য সমাধান করেছিলেন
একটা মানুষ, যিনি প্রতিদিন রাস্তায় হাঁটতেন আর মানুষের বোকামি দেখে হাসতেন। প্রতিবেশীরা ভাবত লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই “পাগল” মানুষটাই আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে এমন একটা তত্ত্ব দিয়ে গেছেন, যা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একদম ভিত্তিপ্রস্তর। তাঁর নাম ডিমোক্রিটাস। আবডেরার সেই হাসিখুশি দার্শনিক, যাঁকে ইতিহাস স্মরণ করে “দ্য লাফিং ফিলোসফার” নামে। আজ একটু … - পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬-২৭: শিক্ষা আর চাকরির ক্ষেত্রে কী কী বদল আসছে, এক নজরে দেখে নিন
২২শে জুন, ২০২৬-এ বিধানসভায় পেশ হলো রাজ্যের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট। এবারের ভাবনার কেন্দ্রে আছে “পঞ্চশক্তি” — পাঁচটা স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা। তার মধ্যে দুটো স্তম্ভ সরাসরি ছুঁয়ে যাচ্ছে রাজ্যের ছাত্রছাত্রী আর চাকরিপ্রার্থীদের জীবন — একটা হলো জ্ঞান-শক্তি, অর্থাৎ শিক্ষা ও মানব-মূলধন, আর অন্যটা সেবা-শক্তি, যার অধীনে এসেছে বড় নিয়োগের ঘোষণা। আপনি … - অ্যারিস্টটল: যে বিজ্ঞানী ২,০০০ বছর ধরে পৃথিবীর চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন
চীন গ্রিসের এক অসাধারণ বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের জীবন, কাজ এবং অবিনশ্বর উত্তরাধিকারের গল্প কল্পনা করুন — খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর এথেন্স শহর। রাস্তাঘাটে দার্শনিকদের তর্ক, বাজারে বণিকদের কোলাহল, আর সমুদ্রের ধারে জেলেদের নৌকা। সেই পরিবেশে একজন মানুষ প্রতিদিন সকালে লাইসিয়াম নামের বাগানটিতে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর ছাত্রদের পড়াতেন। হাঁটতে হাঁটতে পড়ানোর এই অভ্যাসের জন্যই তাঁর অনুগামীরা পরিচিতি … - অন্নপূর্ণা যোজনায় ভেরিফিকেশন শুরু হয়ে গেল — কারা বাদ পড়বেন, পোর্টাল কোথায়, কীভাবে চেক করবেন? সম্পূর্ণ আপডেট
অন্নপূর্ণা যোজনার ভেরিফিকেশন শুরু, পোর্টালও চালু — এখনই জেনে নিন আপনার কী করণীয় গতকাল যে বিজ্ঞপ্তিতে অন্নপূর্ণা যোজনার ঘোষণা হয়েছিল, তার পরের ধাপ শুরু হয়ে গেছে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেক্রেটারির পক্ষ থেকে রাজ্যের সমস্ত জেলার জেলাশাসক (DM) এবং কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের কমিশনারকে একটি বিশেষ নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে — “Request for Verification of Annapurna … - লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধ হয়ে এলো অন্নপূর্ণা যোজনা — এবার প্রতি মাসে ₹৩০০০! কারা পাবেন, কীভাবে আবেদন করবেন?
Annapurna Yojana West Bengal 2026 — মাসে ₹৩০০০ সরাসরি ব্যাংকে, ১ জুন থেকেই শুরু অনেকদিন ধরেই গুঞ্জন চলছিল। অবশেষে সরকারি নথিতে সেটা নিশ্চিত হয়ে গেল। এসে গেল Annapurna Yojana West Bengal 2026 পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মহিলা ও শিশু উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণ বিভাগ ১৯ মে ২০২৬ তারিখে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। বিজ্ঞপ্তি নম্বর 2411-WCD/O/AB-4/2026-এ জানানো হয়েছে, … - ১ জুন থেকে পশ্চিমবঙ্গের সব মহিলা সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারবেন — ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড কীভাবে পাবেন, কোথায় আবেদন করবেন?
West Bengal Free Bus Travel Women 2026, টিকিট লাগবে না — পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই সিদ্ধান্ত লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবন বদলে দিতে পারে প্রতিদিন সকালে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা, ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে উঠা, তারপর পকেট থেকে টাকা বের করে টিকিট কাটা — রাজ্যের কোটি কোটি মহিলার কাছে এই ছবিটা এবার বদলে যেতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার …