অ্যারিস্টটল: যে বিজ্ঞানী ২,০০০ বছর ধরে পৃথিবীর চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন

চীন গ্রিসের এক অসাধারণ বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের জীবন, কাজ এবং অবিনশ্বর উত্তরাধিকারের গল্প

কল্পনা করুন — খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর এথেন্স শহর। রাস্তাঘাটে দার্শনিকদের তর্ক, বাজারে বণিকদের কোলাহল, আর সমুদ্রের ধারে জেলেদের নৌকা। সেই পরিবেশে একজন মানুষ প্রতিদিন সকালে লাইসিয়াম নামের বাগানটিতে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর ছাত্রদের পড়াতেন। হাঁটতে হাঁটতে পড়ানোর এই অভ্যাসের জন্যই তাঁর অনুগামীরা পরিচিতি পেয়েছিল ‘পেরিপেটেটিক’ — যার অর্থ হাঁটন্ত মানুষ। এই মানুষটিই ছিলেন অ্যারিস্টটল।

তিনি শুধু দার্শনিক ছিলেন না। পদার্থবিদ ছিলেন, জীববিজ্ঞানী ছিলেন, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ছিলেন, কবিতার সমালোচক ছিলেন — এমনকি মাছের ডিম দেখে তাদের প্রজনন প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করা সেই বিরল মানুষটিও ছিলেন, যিনি বিজ্ঞানকে শুধু অনুমানের জায়গায় রাখেননি, পর্যবেক্ষণের টেবিলে এনে বসিয়েছেন।

তাঁর মৃত্যুর পরেও প্রায় দুই হাজার বছর ধরে সমগ্র পৃথিবী তাঁর চিন্তাকে সত্য বলে মেনে এসেছে। ইউরোপ তাঁকে ডেকেছে ‘দ্য ফিলোসফার’ — শুধুই ‘দ্য ফিলোসফার’, যেন অন্য কোনো বিশেষণের প্রয়োজনই নেই। ইসলামি দুনিয়ায় তাঁকে বলা হতো ‘প্রথম শিক্ষক’। আর ভারতীয় উপমহাদেশেও তাঁর চিন্তা পরোক্ষে পৌঁছে গিয়েছিল, আরব বণিক ও পণ্ডিতদের হাত ধরে।

“বিজ্ঞান হলো এমন জ্ঞান যা কেবল মতামত নয়, প্রমাণের উপর দাঁড়িয়ে থাকে।” — অ্যারিস্টটল

Table of Contents

শুরুটা কোথায়? একটি ছেলে যে ডাক্তারের পুত্র ছিলেন

aristotle-bigyan-dorshon
শৈশব ও প্রথম কৌতূহল

৩৮৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে উত্তর গ্রিসের স্টাগিরা শহরে অ্যারিস্টটলের জন্ম। তাঁর বাবা নিকোম্যাকাস ছিলেন ম্যাসেডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় আমিন্তাসের রাজবৈদ্য। ছোটবেলা থেকেই তাই রক্ত, হাড়, মাংসপেশি — শরীরের ভেতর থেকে প্রকৃতিকে দেখার একটা দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছিল।

বাবার মৃত্যুর পরে মাত্র সতেরো বছর বয়সে তিনি পাড়ি দিলেন এথেন্সে। গন্তব্য প্লেটোর একাডেমি — সেকালের সবচেয়ে বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে তিনি কাটালেন প্রায় বিশটি বছর। প্রথমে ছাত্র, পরে শিক্ষক।

প্লেটো তাঁকে ভালোবাসতেন, কিন্তু ভয়ও পেতেন একটু। কারণ এই ছেলেটি শুধু গুরুর কথা শুনত না, প্রশ্ন করত। তর্ক করত। একবার বলেছিলেন — ‘প্লেটোকে আমি ভালোবাসি, কিন্তু সত্যকে আরও বেশি ভালোবাসি।’ এই সাহসটুকুই তাঁকে ইতিহাসের পাতায় আলাদা করে রেখেছে।

প্লেটোর সাথে মতবিরোধ — চিন্তার স্বাধীনতার গল্প

greek-scientist-aristotle-bangla
প্লেটো বনাম অ্যারিস্টটল

প্লেটো বিশ্বাস করতেন আদর্শ জগতের কথায় — যেখানে সব কিছুর এক অপরিবর্তনীয় ‘আইডিয়া’ আছে। একটি ঘোড়া হলো সেই আদর্শ ‘ঘোড়ার ধারণার’ একটি অসম্পূর্ণ ছায়া মাত্র। কিন্তু অ্যারিস্টটল বললেন — না, এই ঘোড়াটাই বাস্তব। এর রক্ত, এর মাংস, এর দৌড়ানোর ভঙ্গি — এখানেই সত্য আছে।

প্লেটো গণিত ভালোবাসতেন। অ্যারিস্টটলের আগ্রহ ছিল জীববিজ্ঞানে। একজন আকাশের দিকে তাকাতেন আর ভাবতেন, আরেকজন মাটিতে হাঁটতেন আর দেখতেন। এই পার্থক্যটাই পরে বিজ্ঞানের দুটো ধারার জন্ম দিয়েছে।

প্লেটো যেখানে ভাবলেন — ‘আদর্শ কী হওয়া উচিত’, অ্যারিস্টটল জিজ্ঞেস করলেন — ‘এটা আসলে কীভাবে কাজ করছে?’

জীববিজ্ঞানের আদি পিতা — মাছ থেকে হাতি, সবকিছু তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন

অ্যারিস্টটলের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত জীববিজ্ঞানে। এবং এখানেই তিনি সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি শুধু বই পড়ে, বা চিন্তা করে কাজ করেননি। তিনি দেখেছেন। হাত দিয়ে ছুঁয়েছেন। ব্যবচ্ছেদ করেছেন।

তাঁর রচনাবলিতে প্রায় পাঁচশোটি প্রজাতির পাখি, মাছ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর বর্ণনা আছে। একশোরও বেশি প্রাণীর অভ্যন্তরীণ শারীরস্থান তিনি নিজে বিশ্লেষণ করেছেন। পঁয়ত্রিশটি প্রাণী তিনি নিজ হাতে কেটে দেখেছেন।

এই কাজটা সেই সময়ের জন্য অসাধারণ ছিল। কারণ তখন পর্যন্ত বেশিরভাগ প্রকৃতিবিদ অনুমানের ওপর নির্ভর করতেন। অ্যারিস্টটল বললেন — না, দেখতে হবে। প্রমাণ করতে হবে।

লেসবস দ্বীপে সামুদ্রিক গবেষণা

aristotle-jibon-o-abiskar
সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের প্রথম পদক্ষেপ

প্লেটোর মৃত্যুর পর অ্যারিস্টটল চলে গেলেন এশিয়া মাইনরে, তারপর লেসবস দ্বীপে। সেখানে তাঁর বন্ধু থিওফ্রাস্টাসের সাথে মিলে তিনি এমন কিছু গবেষণা করলেন যা আধুনিক সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর।

লেসবসের সমুদ্রতীরে বসে তিনি অক্টোপাস পর্যবেক্ষণ করলেন। লিখলেন — বিপদ বুঝলে বা বিরক্ত হলে অক্টোপাস তার শরীরের রং পরিবর্তন করতে পারে। এই পর্যবেক্ষণটা এতটাই সঠিক ছিল যে আধুনিক বিজ্ঞান এটি নিশ্চিত করেছে।

হাঙ্গর সম্পর্কে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে মাছ হওয়া সত্ত্বেও হাঙ্গরের ভেতরে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো অমরা বা প্লাসেন্টা থাকে। এই আবিষ্কারটি পরে ঊনবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানীরাও হাতেকলমে প্রমাণ করেছেন।

মুরগির ডিম থেকে ভ্রূণতত্ত্ব

aristotle-biography-bengali
ভ্রূণতত্ত্বের জনক

অ্যারিস্টটলের সবচেয়ে চমকপ্রদ পরীক্ষাগুলির একটি হলো মুরগির ডিমের ভেতরে ভ্রূণের বিকাশ পর্যবেক্ষণ। তিনি প্রতিদিন একটি করে নিষিক্ত ডিম ভেঙে দেখতেন — শিশু মুরগিটি কীভাবে আস্তে আস্তে তৈরি হচ্ছে।

এই পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি আবিষ্কার করলেন যে ভ্রূণের বিকাশে হৃৎপিণ্ডই সবার আগে তৈরি হয়। সেই ক্ষুদ্র স্পন্দনটি শুরু হয় সবার আগে। এই তথ্যটিও পরে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন।

তিনি প্রায় দুই হাজার বছর আগে বুঝেছিলেন — শিশুর জন্মের সময় সে মাথা সামনে করে বের হয়, হাত শরীরের পাশে থাকে। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ আজও চিকিৎসাশাস্ত্রে সঠিক।

প্রাণীদের শ্রেণিবিন্যাস — লিনিয়াসের দুই হাজার বছর আগে

aristotle-jiboni
প্রাণীজগতের প্রথম শ্রেণিবিন্যাস

কার্ল লিনিয়াস আধুনিক শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন আঠারো শতকে। কিন্তু অ্যারিস্টটল এই কাজটা করেছিলেন তার দুই হাজার বছরেরও আগে।

তিনি প্রাণীজগৎকে দুটো বড় ভাগে ভাগ করেছিলেন — যাদের লাল রক্ত আছে এবং যাদের নেই। এই বিভাজনটা আধুনিক মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর ধারণার সাথে প্রায় হুবহু মিলে যায়।

রক্তযুক্ত প্রাণীদের মধ্যে তিনি আলাদা করলেন মানুষ, চতুষ্পদ স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ এবং মাছ। রক্তহীনদের মধ্যে রাখলেন কাঁকড়া, চিংড়ি, অক্টোপাস, শামুক, কীটপতঙ্গ।

তাঁর এই শ্রেণিবিন্যাস যে কতটা গভীর পর্যবেক্ষণের ফল, সেটা বোঝা যায় একটি ছোট্ট তথ্যে — তিনি ডলফিন ও তিমিকে মাছের সাথে রাখেননি, রেখেছেন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সাথে। কারণ তারা সন্তানকে দুধ খাওয়ায়। এই পার্থক্যটা ধরতে পারা সত্যিই অসাধারণ।

যুক্তিবিদ্যার জনক — চিন্তা করার নিয়মকানুন তিনিই তৈরি করেছেন

aristotle-lifestory-bangla
যুক্তিবিদ্যার জনক

অ্যারিস্টটলের আরেকটি মস্ত বড় অবদান হলো যুক্তিবিদ্যা বা লজিক। মানুষ তো সবসময়ই যুক্তি দিয়ে কথা বলেছে, কিন্তু যুক্তি দেওয়ার নিয়মগুলো কী — সেটা কেউ লিখে রাখেনি। অ্যারিস্টটলই প্রথম।

তাঁর ‘অর্গানন’ গ্রন্থে তিনি ‘সিলোজিসম’ বা ন্যায়ানুমানের পদ্ধতি তৈরি করলেন। সহজ করে বলতে গেলে — দুটো সত্য কথা থেকে তৃতীয় একটি সত্য কথা বের করা।

যেমন — সব মানুষ মরণশীল। সক্রেটিস একজন মানুষ। অতএব সক্রেটিস মরণশীল। এই তিনটে বাক্য মিলিয়ে একটা সিলোজিসম তৈরি হয়। এর প্রথম দুটো বাক্য সত্য হলে তৃতীয়টি অনিবার্যভাবে সত্য।

এই পদ্ধতিটা এতটাই শক্তিশালী যে আজও আইনি যুক্তি থেকে শুরু করে গণিতের প্রমাণ পর্যন্ত সর্বত্র এটি ব্যবহার হচ্ছে। কম্পিউটার বিজ্ঞানের মূল ভিত্তিও এই যুক্তিবিদ্যা।

চতুর্বিধ কারণ — ‘কেন’ প্রশ্নের চারটি উত্তর

aristotle-bigyani-greek

কোনো কিছু কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর অ্যারিস্টটল দিয়েছেন চার ভাগে। এই ‘চতুর্বিধ কারণ’ তত্ত্বটি আজও দর্শনের পাঠ্যবইয়ে আছে।

একটা ব্রোঞ্জের মূর্তির উদাহরণ দিয়ে তিনি বোঝালেন। প্রথমত, উপাদান কারণ — মূর্তিটা ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি, তাই ব্রোঞ্জই এর উপাদান কারণ। দ্বিতীয়ত, আকারগত কারণ — মূর্তিটার একটা নির্দিষ্ট আকৃতি আছে, সেটা হলো আকারগত কারণ। তৃতীয়ত, নিমিত্ত কারণ — ভাস্করের হাত এই মূর্তিটা তৈরি করেছে। চতুর্থত, পরিণতি কারণ — মূর্তিটা কোনো উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে, যেমন মন্দিরের সৌন্দর্য বাড়ানো।

এই চারটি কারণ একসাথে না জানলে আমরা কোনো জিনিসকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারি না — এটাই ছিল তাঁর দাবি। এবং আজকের বিজ্ঞানও মূলত এই একই প্রশ্নগুলো করে, শুধু ভাষাটা বদলে গেছে।

পদার্থবিদ্যা ও মহাকাশ — যেখানে তিনি ভুল করেছিলেন, কিন্তু পথ দেখিয়েছিলেন

সৎভাবে বলতে গেলে, অ্যারিস্টটলের পদার্থবিদ্যার বেশিরভাগটাই পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এই ভুলগুলোও ছিল এতটাই সুচিন্তিত এবং পদ্ধতিগত যে পরের দুই হাজার বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এগুলো নিয়ে বিতর্ক করতে করতেই সঠিক উত্তরে পৌঁছেছেন।

তিনি মনে করতেন মহাবিশ্ব দুটো অংশে ভাগ — পৃথিবীর চারপাশের জগৎ যেখানে মাটি, জল, বায়ু ও আগুন দিয়ে সব কিছু তৈরি, এবং আকাশের জগৎ যেখানে আছে ‘ইথার’ নামের এক বিশেষ উপাদান। আকাশের তারারা এই ইথার দিয়ে তৈরি বলেই তারা চিরস্থায়ী ও নিখুঁত।

তিনি বলেছিলেন ভারী জিনিস হালকা জিনিসের চেয়ে দ্রুত পড়ে। এই কথাটা গ্যালিলিও পিসার হেলানো মিনার থেকে দুটো পাথর ফেলে ভুল প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু গ্যালিলিও অ্যারিস্টটলকে পড়েছিলেন বলেই তাঁর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পেরেছিলেন। শূন্যস্থান সম্পর্কে তাঁর ধারণাও পরে ভুল প্রমাণিত হয়।

তাঁর ভুলগুলো ছিল এমন ভুল যা পরের দুই হাজার বছরের বিজ্ঞানকে একটা দিকে এগিয়ে দিয়েছিল। ভুল না থাকলে প্রশ্নও থাকত না।

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের শিক্ষক — একটি অদ্ভুত সম্পর্কের গল্প

greek-scientist-aristotle
শিক্ষক ও ছাত্র

৩৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ম্যাসেডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ তাঁকে ডেকে পাঠালেন তাঁর পুত্রের গৃহশিক্ষক হিসেবে। সেই পুত্রটি পরে পরিচিত হবেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট নামে।

শিক্ষক-ছাত্রের এই সম্পর্কটা ছিল সত্যিই আশ্চর্যজনক। একজন ছিলেন চিন্তার মানুষ, অন্যজন ছিলেন তলোয়ারের মানুষ। একজন মাছের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে মাথা ঘামাতেন, অন্যজন মাথা ঘামাতেন কীভাবে পারস্য সাম্রাজ্য জয় করা যায়।

তবু দুজনের মধ্যে একটা সম্পর্ক ছিল। আলেকজান্ডার যখন পারস্য ও ভারত জয় করতে বেরিয়েছিলেন, তখন তিনি সঙ্গে নিয়েছিলেন উদ্ভিদবিদ ও প্রকৃতিবিদদের। শোনা যায় তিনি তাঁর জয় করা অঞ্চল থেকে বিরল প্রাণী ও উদ্ভিদের নমুনা পাঠাতেন অ্যারিস্টটলের কাছে।

কিন্তু এই সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অ্যারিস্টটল ছিলেন স্বাধীনচেতা, আলেকজান্ডার ছিলেন সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষী। দুজনের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এক সময় মনোমালিন্যে পরিণত হয়েছিল।

লাইসিয়াম — যেখানে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল

aristotle-jibon-o-bani
লাইসিয়াম — জ্ঞানের বাগান

৩৩৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এথেন্সে ফিরে অ্যারিস্টটল প্রতিষ্ঠা করলেন লাইসিয়াম। শুধু একটা স্কুল নয়, এটা ছিল একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান — বিশ্বের প্রথম সংগঠিত গবেষণা কেন্দ্রগুলির একটি।

এখানে লাইব্রেরি ছিল, গবেষণার জায়গা ছিল, আলোচনার হল ছিল। বিভিন্ন বিষয়ের ছাত্র ও শিক্ষকরা একসাথে কাজ করতেন। সকালে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তৃতা, বিকেলে সাধারণ মানুষদের জন্য খোলা আলোচনা।

আজকের বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আমরা যা বুঝি — বিভিন্ন বিষয়ের একসাথে পড়ানো, গবেষণা ও শিক্ষার মিলন — সেই ধারণার গোড়া এখানেই।

ইসলামি সোনালি যুগে অ্যারিস্টটল — কীভাবে একটা জ্ঞান বেঁচে রইল

aristotle-bangla
জ্ঞানের নতুন জীবন

রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর পশ্চিম ইউরোপ এক অন্ধকারে ঢাকা পড়ল। গ্রিক পাণ্ডুলিপিগুলো ধুলো খেতে লাগল মঠের আলমারিতে। মনে হচ্ছিল অ্যারিস্টটলের চিন্তা বুঝি হারিয়েই গেল।

কিন্তু পূর্বদিকে তখন আলো জ্বলছে। আব্বাসীয় খলিফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাগদাদে গড়ে উঠল ‘বাইতুল হিকমা’ বা জ্ঞানের ঘর। এখানে আরব, পার্সি ও ভারতীয় পণ্ডিতরা মিলে গ্রিক বিজ্ঞানের বইগুলো আরবিতে অনুবাদ করলেন।

অ্যারিস্টটলের জীববিজ্ঞানের তিনটি প্রধান গ্রন্থ একত্রিত করে নবম শতাব্দীতে প্রকাশিত হলো ‘কিতাব আল-হায়াওয়ান’ বা প্রাণীদের বই। মুসলিম পণ্ডিতদের কাছে অ্যারিস্টটল এতটাই শ্রদ্ধেয় ছিলেন যে দার্শনিক আল-ফারাবিকে বলা হতো ‘দ্বিতীয় শিক্ষক’ — প্রথম শিক্ষক স্বয়ং অ্যারিস্টটল।

ইবনে সিনা তাঁর চিকিৎসাশাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থে অ্যারিস্টটলের জীববিজ্ঞান ও দর্শনের ওপর ভিত্তি করে নিজের তত্ত্ব গড়লেন। ইবনে রুশদ তাঁর রচনায় এত গভীরভাবে অ্যারিস্টটলের ব্যাখ্যা করলেন যে ইউরোপে তিনি পরিচিত হলেন ‘দ্য কমেন্টেটর’ — ভাষ্যকার — নামে।

ইউরোপে ফেরা — একটি জ্ঞানের দীর্ঘ যাত্রা

দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে স্পেনের টলেডো শহর হয়ে উঠল অনুবাদের কেন্দ্র। আরবি ভাষায় রক্ষিত গ্রিক জ্ঞান আবার লাতিনে অনুবাদ হলো। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এই জ্ঞানকে তাদের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করল।

থমাস অ্যাকুইনাস নামের একজন ডোমিনিকান সন্ন্যাসী চাইলেন খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের সাথে অ্যারিস্টটলের যুক্তিবাদী দর্শনকে মেলানো যায় কিনা। তিনি অ্যারিস্টটলকে এতটাই সম্মান করতেন যে তাঁকে শুধু ‘দ্য ফিলোসফার’ বলে ডাকতেন। অন্য কোনো নাম লাগত না।

একজন প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকের চিন্তা, আরব পণ্ডিতদের হাত ধরে, লাতিন অনুবাদে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানো — এটা শুধু একটি বইয়ের যাত্রা নয়, এটা মানব সভ্যতার জ্ঞানের ধারাবাহিকতার প্রমাণ।

বৈজ্ঞানিক বিপ্লব — যেখানে অ্যারিস্টটল পরাজিত হলেন, কিন্তু মুছে গেলেন না

ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে গ্যালিলিও, কেপলার ও নিউটন প্রমাণ করলেন যে অ্যারিস্টটলের পদার্থবিদ্যা ভুল। আকাশের নিয়ম আর পৃথিবীর নিয়ম আলাদা নয় — সর্বত্র একই গাণিতিক সূত্র কাজ করে।

কিন্তু এই বিজ্ঞানীরা কি অ্যারিস্টটলকে না পড়েই তাঁর বিরুদ্ধে যেতে পারতেন? না। তাঁরা প্রথমে অ্যারিস্টটলকে পড়েছিলেন, তারপর তাঁর যুক্তিগুলোর দুর্বলতা খুঁজেছিলেন।

বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই প্যারাডক্সটা চিরকালীন — আগের প্রজন্মের ভুল না থাকলে পরের প্রজন্মের সঠিক আবিষ্কার হতো না। অ্যারিস্টটল ভুল ছিলেন, কিন্তু তিনি এমনভাবে ভুল ছিলেন যা থেকে শেখা যায়।

ডারউইনের চোখে অ্যারিস্টটল

চার্লস ডারউইন একবার বলেছিলেন — লিনিয়াস ও কুভিয়ারকে আমি প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতাম। কিন্তু অ্যারিস্টটলের তুলনায় তাঁরা কেবল স্কুলছাত্র।

এই মন্তব্যটা অসাধারণভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব এসেছিল অ্যারিস্টটলের উদ্দেশ্যবাদী জীববিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করে। কিন্তু তবুও ডারউইন স্বীকার করলেন যে এই শ্রেণিবিন্যাস, এই পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি — সবকিছু অ্যারিস্টটলই শুরু করেছিলেন।

শেষ জীবন — একটি মানুষের বিদায়

৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের মৃত্যু হলো। এথেন্সে সঙ্গে সঙ্গে ম্যাসেডোনীয় বিরোধী হাওয়া বইতে শুরু করল। অ্যারিস্টটলকে অধার্মিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলো — ঠিক যেমন আগে সক্রেটিসকে করা হয়েছিল।

কিন্তু অ্যারিস্টটল সক্রেটিসের মতো বিষের পাত্র গলায় ঢালতে রাজি ছিলেন না। তিনি বললেন — আমি এথেন্সকে দ্বিতীয়বার দর্শনের বিরুদ্ধে পাপ করার সুযোগ দেব না। এই কথাটা বলে তিনি চলে গেলেন ইউবোয়া দ্বীপে, তাঁর মায়ের দেওয়া সম্পত্তিতে।

সেখানে মাত্র এক বছর ছিলেন। ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, বাষট্টি বছর বয়সে মৃত্যু হলো। পেটের ব্যাধি ছিল বলে মনে করা হয়।

তাঁর উইল থেকে জানা যায় — তিনি তাঁর দাসদের মুক্তি দিয়েছিলেন। তাঁর পোষা পশুদের যত্ন নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী পিথিয়াসের হাড় তাঁর কবরের পাশে রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন — কারণ মৃত্যুর আগে তাঁর স্ত্রী এই ইচ্ছা জানিয়েছিলেন।

এই মানুষটা যিনি পুরো পৃথিবীকে বুঝতে চেয়েছিলেন, শেষমেশ তিনিও ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। যিনি স্ত্রীকে ভালোবাসতেন, পশুদের যত্ন নিতেন, এবং নিজের বিশ্বাসের জন্য জীবন না দিলেও দেশ ছাড়তে রাজি ছিলেন।

অ্যারিস্টটলের উত্তরাধিকার — যা থেকে যায়

aristotle-abiskar
একটি উত্তরাধিকারের গল্প

তাঁর পদার্থবিদ্যা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর মহাজাগতিক তত্ত্ব বাতিল হয়েছে। কিন্তু তবুও কেন আমরা তাঁকে মনে রাখি?

কারণ তিনি পদ্ধতি দিয়েছেন। কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়, কীভাবে শ্রেণিবিন্যাস করতে হয়, কীভাবে যুক্তি সাজাতে হয় — এই পদ্ধতিগুলো তিনিই প্রথম লিখিত আকারে সংগ্রহ করেছেন।

তাঁর জীববিজ্ঞান আজও বিস্মিত করে। একজন মানুষ মাত্র নিজের চোখে দেখে, প্রযুক্তির কোনো সাহায্য ছাড়া, এতটা নিখুঁত পর্যবেক্ষণ করেছিলেন — এটা বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রায় অতুলনীয়।

যুক্তিবিদ্যায় তাঁর অবদান এতটাই মৌলিক যে আজকের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং থেকে আইনি যুক্তি — সর্বত্র তাঁর ছায়া।

এবং সবচেয়ে বড় কথা — তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে মানুষের কৌতূহলের কোনো সীমা নেই। মাছের ডিম থেকে তারার গতি, রাজ্যশাসন থেকে কবিতার সৌন্দর্য — সব কিছুকে বুঝতে চাওয়ার এই উদ্যম একটি মহৎ মানবিক বৈশিষ্ট্য। অ্যারিস্টটল সেই বৈশিষ্ট্যের সর্বোচ্চ প্রতীক।

প্রাসঙ্গিক প্রশ্নোত্তর — পাঠকদের মনে যা আসতে পারে

অ্যারিস্টটলকে ‘জীববিজ্ঞানের জনক’ বলা হয় কেন?

কারণ তিনিই প্রথম জীবন অধ্যয়নকে একটি পদ্ধতিগত বিজ্ঞানে পরিণত করেছিলেন। পর্যবেক্ষণ, শ্রেণিবিন্যাস, ব্যবচ্ছেদ — এই পদ্ধতিগুলো জীববিজ্ঞানে তিনিই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন।

অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

প্লেটো বিশ্বাস করতেন বাস্তব জগতের বাইরে আদর্শ জগৎ আছে, এবং সেখানেই সত্য। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন সত্য এই বাস্তব জগতেই আছে, এটাকে পর্যবেক্ষণ করেই জানতে হবে। এক কথায় — প্লেটো ভাববাদী, অ্যারিস্টটল বাস্তববাদী।

অ্যারিস্টটলের কোন বইগুলো পড়া উচিত?

শুরু করতে পারেন ‘নিকোম্যাকিয়ান এথিক্স’ দিয়ে — জীবনকে কীভাবে সুন্দরভাবে কাটানো যায় সে বিষয়ে। তারপর ‘পলিটিক্স’ — রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে। বিজ্ঞানে আগ্রহ থাকলে ‘হিস্ট্রি অফ অ্যানিম্যালস’।

অ্যারিস্টটলের চিন্তা কি আজও প্রাসঙ্গিক?

অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁর যুক্তিবিদ্যা আজকের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও আইনের ভিত্তি। তাঁর নীতিবিদ্যা আজও নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আলোচিত হয়। তাঁর শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি আধুনিক জীববিজ্ঞানের পূর্বসূরি।

★  ★  ★

অ্যারিস্টটলের জীবন শেষ হয়েছিল নির্বাসনে, একাকীত্বে। কিন্তু তাঁর চিন্তা কখনো নির্বাসিত হয়নি। গ্রিস থেকে রোম, রোম থেকে বাগদাদ, বাগদাদ থেকে টলেডো, টলেডো থেকে প্যারিস ও অক্সফোর্ড — এই দীর্ঘ যাত্রায় তাঁর চিন্তা বহন করে নিয়ে গেছেন অসংখ্য মানুষ, ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন সংস্কৃতিতে।

আজ যখন কোনো বিজ্ঞানী মাইক্রোস্কোপে কোষের দিকে তাকান, যখন কোনো বিচারক যুক্তির মাধ্যমে সত্য খোঁজেন, যখন কোনো শিক্ষক ছাত্রকে ‘কেন’ প্রশ্ন করতে শেখান — তখন অ্যারিস্টটলের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

দুই হাজার বছরেরও বেশি আগে এক ডাক্তারের ছেলে স্টাগিরা থেকে এথেন্সে এসেছিলেন পৃথিবীকে বোঝার স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে।

আরো পড়ুন: থেলস: গ্রিক দর্শনের জনক ও বিজ্ঞানের আদি পথিকৃৎ

আরো পড়ুন:

Leave a Comment