টাইকো ব্রাহে: যে জ্যোতির্বিদ নাক হারিয়েও আকাশ দেখা থামাননি

একটু ভাবুন। ১৫৬০ সাল। ডেনমার্কের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে চৌদ্দ বছর বয়সের একটা ছেলে আইন পড়তে বসে আছে। হঠাৎ বাইরে লোকজনের ভিড়। সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে। সূর্যগ্রহণ হচ্ছে।

কিন্তু অবাক করা বিষয়টা সূর্যগ্রহণ নয়। অবাক করা বিষয়টা হলো — জ্যোতির্বিদরা আগে থেকেই বলে দিতে পেরেছিলেন ঠিক কখন এই গ্রহণ হবে। নিখুঁতভাবে।

এই ছেলেটার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরতে লাগল — মানুষ কীভাবে এটা জানল? আকাশের এত বড় ঘটনা কীভাবে গণনা করা যায়?

সেই একটা প্রশ্ন তার সারাজীবন বদলে দিয়েছিল।

ছেলেটার নাম টাইকো ব্রাহে।


Table of Contents

ডেনমার্কের সবচেয়ে বড় ঘরের ছেলে

১৫৪৬ সালের ১৪ই ডিসেম্বর। স্ক্যানিয়ার নুটস্টর্প দুর্গে জন্ম নিলেন টাইকো। বাবা ওত্তে ব্রাহে ছিলেন ডেনিশ রাজকীয় প্রিভি কাউন্সেলর, হেলসিংবার্গ দুর্গের গভর্নর। মায়ের দিক থেকেও রক্তে রাজকীয় সংযোগ। ব্রাহে, বিল, রুড, ট্রোলে, রোজেনক্র্যান্টজ — ডেনমার্ক-সুইডেনের সর্বোচ্চ সারির পরিবারগুলোর নাম তাঁর বংশলতিকায় জড়িয়ে।

কিন্তু জন্মের মাত্র দুই বছরের মধ্যে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।

তাঁর নিঃসন্তান পিতৃব্য ইয়র্গেন ব্রাহে — অত্যন্ত ধনী, প্রভাবশালী — ছোট্ট টাইকোকে রীতিমতো তুলে নিয়ে গেলেন নিজের প্রাসাদে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে তাঁকে নিজের সন্তান হিসেবে মানুষ করতে শুরু করলেন।

এই চাচার ঘরেই বড় হলেন টাইকো। লাতিন শিখলেন, রাষ্ট্রনীতি শিখলেন। চাচার স্বপ্ন ছিল ভাতিজা হবেন একজন বড় রাষ্ট্রনায়ক।

কিন্তু আকাশ তাঁকে ডাকছিল অন্য পথে।


আইন পড়তে গিয়ে আকাশে মন

ইউরেনিবর্গ ও স্টার্নেবার্গ
ইউরেনিবর্গ ও স্টার্নেবার্গ

১৫৫৯ সালে মাত্র বারো বছর বয়সে কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। আইন আর অলঙ্কারশাস্ত্র পড়ার কথা।

কিন্তু ১৫৬০ সালের ২১শে আগস্টের আংশিক সূর্যগ্রহণ সব বদলে দিল।

জ্যোতির্বিদরা আগে থেকে বলেছিলেন ঠিক কোন সময়ে গ্রহণ হবে। আর হলোও সেইভাবেই। চৌদ্দ বছরের টাইকো ভাবলেন — মানুষ আকাশকে এতটা জানতে পারে কীভাবে? গণনা দিয়ে এত বড় ঘটনা ধরা যায় কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি আইন ছেড়ে দিলেন। রাতের পর রাত আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে লাগলেন।

১৫৬২ সালে চাচা তাঁকে পাঠালেন লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে — উচ্চতর আইন পড়তে। সাথে দিলেন কঠোর গৃহশিক্ষক আন্ডার্স সোরেনসেন ভেডেলকে, যাতে টাইকো আইনের বাইরে না যান।

দিনের বেলা ভেডেলের নজরে আইন পড়লেন। রাতে ভেডেল ঘুমিয়ে পড়লে চুপচাপ বাইরে বেরিয়ে আকাশ দেখলেন। সাধারণ কম্পাস, ছোট একটা গ্লোব আর রেডিয়াস নিয়ে নক্ষত্রের দূরত্ব মাপার চেষ্টা করলেন।


বৃহস্পতি-শনির মিলন এবং একটা বড় আবিষ্কার

টাইকো ব্রাহের জীবনপঞ্জি
টাইকো ব্রাহের জীবনপঞ্জি

১৫৬৩ সালের আগস্ট। টাইকো তখন লিপজিগে। আকাশে বৃহস্পতি আর শনি একে অপরের কাছাকাছি আসছে — জ্যোতির্বিদদের ভাষায় মহাসংযোগ।

টাইকো দেখলেন, তৎকালীন দুটো প্রধান গ্রহ সারণী — আলফনসাইন এবং কোপার্নিকীয় — এই সংযোগের সময় নির্ধারণে যথাক্রমে প্রায় এক মাস এবং দুই দিনের মতো ভুল করেছে।

সতেরো বছর বয়সের ছেলে, কিন্তু বুঝলেন একটা বড় কথা। আকাশকে জানতে হলে বইয়ের তথ্যের উপর নির্ভর করলে হবে না। রাতের পর রাত নিজে দেখতে হবে, মাপতে হবে, রেকর্ড করতে হবে।

এই বোঝাপড়াটাই তাঁর সারাজীবনের দর্শন হয়ে গেল।


নাক হারানোর গল্প

১৫৬৫ সালে চাচা ইয়র্গেন ব্রাহে মারা গেলেন। ডেনমার্কের রাজাকে পানি থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। চাচার মৃত্যুতে পারিবারিক বাধা কাটল। টাইকো পুরোপুরি গণিত আর জ্যোতির্বিজ্ঞানে ডুবে গেলেন।

রস্টক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। ১৫৬৬ সালের ২৯শে ডিসেম্বর। এক ক্রিসমাস পার্টিতে তাঁর তৃতীয় কাজিন মান্দারুপ পার্সবার্গের সাথে বিতর্ক লেগে গেল — একটা গাণিতিক সূত্র নিয়ে। কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল।

বিতর্ক তলোয়ারযুদ্ধে গড়াল।

সেই দ্বন্দ্বে পার্সবার্গের তলোয়ারের আঘাতে টাইকোর নাকের অগ্রভাগের হাড় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

এরপর সারাজীবন তিনি পিতলের তৈরি একটা কৃত্রিম নাক পরে থাকলেন। পকেটে সবসময় রাখতেন আঠার একটা ছোট কৌটা — নাকটা আলগা হলে যাতে সাথে সাথে লাগিয়ে নেওয়া যায়।

মজার ব্যাপার হলো, এই ঘটনার পর পার্সবার্গ আর টাইকো আবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গেলেন।


১৫৭২ সালের নতুন তারা — মহাজাগতিক বিশ্বাস ভেঙে পড়ল

তিনটি মহাজাগতিক মডেলের তুলনা
তিনটি মহাজাগতিক মডেলের তুলনা

১৫৭২ সালের ১১ই নভেম্বর। সন্ধ্যার পর টাইকো হেরেভাদ অ্যাবেতে রসায়নাগার থেকে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন।

ক্যাসিওপিয়া নক্ষত্রমণ্ডলে এমন একটা আলো দেখলেন যা আগে কখনো ছিল না। নতুন। চোখ ধাঁধানো। দিনের পর দিন ক্রমশ উজ্জ্বল হতে থাকল। শেষ পর্যন্ত শুক্র গ্রহকেও ছাড়িয়ে গেল উজ্জ্বলতায়।

তারপর ১৮ মাস জ্বলে ১৫৭৪ সালের শুরুতে অদৃশ্য হয়ে গেল।

টাইকো এই বিষয়ে ১৫৭৩ সালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন — ডি নোভা স্টেলা বা নোভা তারার উপর।

আজ আমরা জানি এটা ছিল আসলে একটা সুপারনোভা বিস্ফোরণ — SN 1572, যাকে বলা হয় “টাইকোর সুপারনোভা”। একটা দূরবর্তী শ্বেত বামন নক্ষত্র ধ্বংস হয়ে এত আলো ছড়িয়েছিল।

কিন্তু এই আবিষ্কারের আসল গুরুত্ব ছিল অন্য জায়গায়।

তখনকার প্রচলিত বিশ্বাস ছিল অ্যারিস্টটলের — চাঁদের উপরের আকাশ অপরিবর্তনশীল, শাশ্বত, চিরন্তন। সেখানে কোনো নতুন কিছু আসতে পারে না, পুরনো কিছু মিলিয়ে যেতে পারে না।

টাইকো তাঁর নিখুঁত পরিমাপক যন্ত্র দিয়ে দেখালেন, এই নতুন আলোর কোনো লম্বন বা প্যারালাক্স নেই — মানে এটা পৃথিবীর কাছের কোনো বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনা নয়, এটা আছে সুদূর নক্ষত্রজগতে।

দুই হাজার বছরের পুরনো একটা বিশ্বাস ভেঙে পড়ল।


১৫৭৭ সালের ধূমকেতু — আরেকটা বিশ্বাসের পতন

১৫৭২ সালের নতুন তারা
১৫৭২ সালের নতুন তারা

১৫৭৭ সালের নভেম্বরে আকাশে দেখা দিল একটা উজ্জ্বল ধূমকেতু। টাইকো তখন ভেন দ্বীপে মাছ ধরছিলেন। পানিতে ধূমকেতুটার প্রতিবিম্ব দেখেই তিনি চিনলেন।

এরপর শুরু হলো নিবিড় পর্যবেক্ষণ। প্রাগে থাকা তাঁর বন্ধু জ্যোতির্বিদ থাডিউস হ্যাজিসিয়াসের পর্যবেক্ষণের সাথে নিজের পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে দেখলেন।

ফলাফল অবাক করা। ধূমকেতুটা পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বের চার থেকে ছয় গুণ বেশি দূরে।

অ্যারিস্টটল বলেছিলেন ধূমকেতু হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে হওয়া ঘটনা। টাইকো প্রমাণ করলেন — না, এটা আকাশের গভীরে।

আর যদি ধূমকেতু মহাকাশে এত দূরে থেকে বিভিন্ন গ্রহের কাছ দিয়ে চলে যেতে পারে, তাহলে প্রাচীনরা যে বলতেন গ্রহগুলো কঠিন স্ফটিক গোলকের গায়ে আটকে আছে — সেই গোলক থাকলে ধূমকেতু ভেঙে চূর্ণ করে দিত সব। গোলকের তত্ত্বটাও ভেঙে পড়ল।


ডেনমার্কের রাজার উপহার — ভেন দ্বীপ ও স্বর্গের দুর্গ

এই সুপারনোভা আবিষ্কারের পর টাইকোর নাম ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। অন্য দেশের রাজা-বাদশাহরা তাঁকে নিজেদের দেশে আমন্ত্রণ জানাতে লাগলেন।

ডেনমার্কের রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডরিক বুঝলেন, এই মানুষটাকে ধরে রাখতে হবে। ১৫৭৬ সালের ২৩শে মে রাজকীয় ফরমানে কোপেনহেগেনের পূর্বে ওরেসুন্ড প্রণালীর ভেন দ্বীপটার একক কর্তৃত্ব দেওয়া হলো টাইকোকে। সাথে বার্ষিক অনুদান — ডেনিশ জাতীয় আয়ের প্রায় দশ শতাংশ।

এই অসামান্য পৃষ্ঠপোষকতায় টাইকো ভেন দ্বীপে গড়ে তুললেন ইউরোপের প্রথম আধুনিক বৃহৎ গবেষণা কেন্দ্র — ইউরেনিবর্গ, মানে “স্বর্গের দুর্গ”।

তিনতলা বিশাল ভবন। উচ্চতা উনিশ মিটার। দুই পাশে দুটো পর্যবেক্ষণ গ্যালারি। নিচে ভূগর্ভে আলকেমির গবেষণাগার। নিজস্ব মুদ্রণযন্ত্র। ইউরোপের রাজা-বাদশাহদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা।

কিন্তু কিছুদিন পর টাইকো একটা সমস্যা ধরলেন। টাওয়ারের উপরে বাতাসের ধাক্কায় ভারী যন্ত্রপাতি কাঁপে। মেঝেতে মানুষের পায়ের শব্দেও যন্ত্র নড়ে যায়। এক আর্ক-মিনিটের নির্ভুলতা রাখতে হলে এটা চলে না।

তাই ১৫৮৪ সালে ইউরেনিবর্গের পাশেই তৈরি করলেন আরেকটা মানমন্দির — সম্পূর্ণ মাটির নিচে। নাম দিলেন স্টার্নেবার্গ, মানে “তারার দুর্গ”। পাঁচটা গম্বুজাকৃতির কক্ষ, সরাসরি পাথরের উপর বসানো। বাতাস নেই, কম্পন নেই। ছাদের ঢাকনা সরিয়ে আকাশ দেখা যায়।

এই দুটো মানমন্দিরে টানা বিশ বছরেরও বেশি কাজ করলেন টাইকো।


বিশেষ যন্ত্রপাতি — দূরবীনের আগে নিখুঁততার সন্ধান

টেলিস্কোপ তখনো আবিষ্কার হয়নি। খালি চোখে আকাশ দেখার যন্ত্র দিয়ে কতটা নিখুঁতভাবে মাপা যায় — সেই সীমাটাই টাইকো ঠেলে দিয়েছিলেন সবচেয়ে দূরে।

তাঁর দেওয়াল-সংলগ্ন বিশাল ম্যুরাল কোয়াড্রেন্ট এক আর্ক-মিনিট পর্যন্ত নির্ভুলভাবে কোণ মাপতে পারত। এতই নিখুঁত যে যন্ত্রটার কেন্দ্রে টাইকোর নিজের ছবি আঁকা ছিল।

দেড় মিটার ব্যাসের পিতলে মোড়ানো গ্রেট গ্লোবে ১,০০৫টা নক্ষত্রের অবস্থান সরাসরি খোদাই করা হয়েছিল।

আর্মিলারি স্ফিয়ার, সেক্সট্যান্ট, রিভলভিং কোয়াড্রেন্ট — সব যন্ত্র তিনি নিজে নকশা করেছিলেন, নিজে তৈরি করিয়েছিলেন।

পুরনো যন্ত্রগুলো ছিল কাঠের। বাঁকা হয়ে যেত, ভুল হতো। টাইকো ব্যবহার শুরু করলেন লোহার ফ্রেমে নিখুঁত ব্রোঞ্জের পাত — অনেক শক্ত, অনেক নির্ভুল।

চোখের সামনে আলোর লম্বন ত্রুটি কমাতে তিনি এমন একটা বিশেষ পিনহোল সিস্টেম তৈরি করলেন যা আগে কেউ করেননি।

বায়ুমণ্ডলে আলো বাঁকে — এই সংশোধনীর জন্য তিনি নিজে একটা সারণী তৈরি করলেন। রাতের আকাশ থেকে যে তথ্য সংগ্রহ করছেন, তাতে বায়ুমণ্ডলের প্রভাব বাদ দিয়ে সত্যিকারের অবস্থান বের করলেন।

এই কাজের প্রভাব এতটাই সুদূরপ্রসারী ছিল যে, ১৬৭০ সালে চীনে বেইজিংয়ের ইম্পেরিয়াল মানমন্দির পুনর্গঠনের সময় বেলজিয়ান মিশনারি ফার্দিনান্দ ভার্বিয়েস্ট টাইকোর অ্যাস্ট্রোনমি ইন্সটারাটা মেকানিকা বইটা গাইডবুক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।


টাইকনিক মডেল — একটা সৎ আপস

কোপার্নিকাস বলেছিলেন সূর্য স্থির, পৃথিবী ঘোরে। কিন্তু টাইকো এটা মানতে পারলেন না।

তাঁর যুক্তি ছিল সহজ। পৃথিবী যদি সূর্যের চারপাশে ঘোরে, তাহলে বছরের বিভিন্ন সময়ে পৃথিবী আকাশের বিভিন্ন জায়গায় থাকবে। সেই কারণে নক্ষত্রগুলোকে একটু সরে যেতে দেখার কথা — যাকে বলে নক্ষত্রীয় প্যারালাক্স।

টাইকো তাঁর সবচেয়ে নিখুঁত যন্ত্র দিয়ে খুঁজলেন। পেলেন না।

তার মানে হয় পৃথিবী স্থির, নয়তো নক্ষত্রগুলো অকল্পনীয় দূরত্বে। টাইকো বিশ্বাস করতে পারলেন না যে শনির কক্ষপথ আর নক্ষত্রদের মাঝে এত বিশাল শূন্যস্থান থাকতে পারে।

তাই ১৫৮৩ সালে একটা মধ্যবর্তী মডেল প্রস্তাব করলেন — টাইকনিক বিশ্বতত্ত্ব

এই মডেলে পৃথিবী স্থির থাকে কেন্দ্রে, সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, আর বাকি পাঁচটা গ্রহ সূর্যের চারপাশে ঘোরে।

টলেমির মডেল? তাতে শুক্র গ্রহের দশা বা ফেজ ব্যাখ্যা করা যায় না।
কোপার্নিকাসের মডেল? তাতে গির্জার আপত্তি আছে, আর প্যারালাক্সের প্রমাণ নেই।
টাইকনিক মডেল? শুক্রের দশা ব্যাখ্যা হয়, পৃথিবীও স্থির থাকে।

১৬১০ সালে গ্যালিলিও যখন দূরবীন দিয়ে শুক্রের দশা আবিষ্কার করলেন, তখন টলেমির মডেল পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেল। কিন্তু টাইকনিক মডেল টিকে রইল বিকল্প হিসেবে।

ক্যাথলিক চার্চ যখন কোপার্নিকাসকে নিষিদ্ধ করল, তখন জেসুইট পণ্ডিতরা টাইকনিক মডেলকে “বাইবেলসম্মত আধুনিক বিকল্প” হিসেবে সরকারিভাবে গ্রহণ করলেন।

মডেলটা শেষ পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু সেই সময়ের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে এটা ছিল একটা অসাধারণ যৌক্তিক আপস।


বিশ বছরের পরিশ্রম আর ৮ আর্ক-মিনিটের যাদু

১৫৮৮ সালে রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডরিক মারা গেলেন। নতুন রাজা চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ানের বিজ্ঞানে কোনো আগ্রহ ছিল না। অনুদান কমিয়ে দিলেন। একাডেমিক শত্রুরা পাশে পেয়ে কুৎসা রটাতে শুরু করল।

ক্ষুব্ধ, মর্মাহত টাইকো ১৫৯৭ সালে ভেন দ্বীপ ছেড়ে চলে গেলেন। প্রাগে গেলেন, যেখানে সম্রাট দ্বিতীয় রুডলফ তাঁকে সাদরে গ্রহণ করলেন রাজকীয় প্রধান জ্যোতির্বিদ হিসেবে।

সেখানে ১৬০০ সালে এলেন এক তরুণ জার্মান গণিতবিদ — জোহানেস কেপলার।

কেপলার ছিলেন মনেপ্রাণে কোপার্নিকীয়। তাঁর দরকার ছিল নিখুঁত তথ্য। টাইকোর কাছে ছিল বিশ বছরের নিখুঁত পর্যবেক্ষণের অমূল্য খাতা।

কিন্তু টাইকো সব তথ্য একসাথে দেননি। শুধু মঙ্গল গ্রহের ডেটা বিশ্লেষণ করতে বললেন।

তারপর ১৬০১ সালের অক্টোবরে টাইকো হঠাৎ মারা গেলেন।

কেপলার টাইকোর সব তথ্য পেলেন। মঙ্গলের কক্ষপথ নিয়ে চার বছর গণনা করলেন। দেখলেন, সূর্যকে কেন্দ্রে রেখে নিখুঁত বৃত্তাকার কক্ষপথের হিসাব করলে টাইকোর তথ্যের সাথে ৮ আর্ক-মিনিটের ফারাক থাকছে।

৮ আর্ক-মিনিট মানে অনেক ছোট কোণ। প্রাচীনকালে টলেমি নিজেই স্বীকার করতেন ১০ আর্ক-মিনিটের ভুল স্বাভাবিক। তাহলে এই ৮ আর্ক-মিনিটকে ভুল হিসেবে উড়িয়ে দেওয়াই যেত।

কিন্তু কেপলার জানতেন — টাইকো ব্রাহের যন্ত্র ও পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে ১ থেকে ২ আর্ক-মিনিটের বেশি ভুল হওয়াই অসম্ভব। তাহলে এই ৮ আর্ক-মিনিট যন্ত্রের ভুল নয় — এটা মহাকাশের বাস্তবতা।

গ্রহ বৃত্তাকার পথে ঘোরে না। বৃত্ত নয়, উপবৃত্ত — ইলিপস।

সেই ৮ আর্ক-মিনিটের ক্ষুদ্র বিচ্যুতি থেকেই কেপলার আবিষ্কার করলেন তাঁর বিখ্যাত গ্রহ গতির তিনটি সূত্র। সেই সূত্রের উপর ভিত্তি করে নিউটন আবিষ্কার করলেন মহাকর্ষের সূত্র।

টাইকোর বিশ বছরের পরিশ্রম না থাকলে কেপলার এই সত্য খুঁজে পেতেন না। আর কেপলারের কাজ না থাকলে নিউটনের পক্ষে মহাকর্ষ আবিষ্কার করা হয়তো আরও অনেকটা পিছিয়ে যেত।


মৃত্যু এবং একটা ঐতিহাসিক রহস্য

টাইকো ব্রাহের মৃত্যু রহস্য
টাইকো ব্রাহের মৃত্যু রহস্য

১৬০১ সালের ১৩ই অক্টোবর। প্রাগে এক জমকালো নৈশভোজে আমন্ত্রিত টাইকো।

রাজকীয় আদবে, সম্রাটের আগে টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়া অসম্মানজনক। তাই অতিরিক্ত মদ্যপানের পর প্রকৃতির ডাক থাকলেও উঠলেন না।

বাড়ি ফিরে দেখা গেল মূত্রনালীতে তীব্র রক্তক্ষরণ। টানা পাঁচ রাত ঘুমাতে পারলেন না। তীব্র জ্বর, প্রলাপ। ২৪শে অক্টোবর ১৬০১ সালে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে মারা গেলেন।

মৃত্যুর আগে শেষবার বলেছিলেন — “আমি যেন বৃথা বেঁচে না থাকি।”

পরের শতাব্দীগুলোতে তাঁর মৃত্যু নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তৈরি হলো। কেউ বলল কেপলার বিষ দিয়ে খুন করেছেন। কেউ বলল ডেনমার্কের রাজার ষড়যন্ত্র।

১৯৯১ সালে বিজ্ঞানীরা কবর খুঁড়ে পরীক্ষা করলেন। টাইকোর দাড়ির চুলে পারদের উপস্থিতি পেলেন। বিষ খাওয়ানো হয়েছে বলে মনে হলো।

কিন্তু ২০১২ সালে আরহুস বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও উন্নত পরীক্ষায় প্রমাণ হলো — পারদের এই উপস্থিতি বাইরে থেকে, কারণ মৃতদেহ সংরক্ষণে পারদ ব্যবহার করা হয়েছিল। রক্তে পারদের পরিমাণ স্বাভাবিক বা তারও কম।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত — টাইকো বিষপ্রয়োগে মারা যাননি। মূত্রনালীর সংক্রমণ থেকে ইউরেমিয়া হয়ে কিডনি বিকল হয়ে স্বাভাবিক মৃত্যু।

৪ঠা নভেম্বর ১৬০১ সালে প্রাগের ঐতিহাসিক টিন চার্চে রাজকীয় সম্মানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।


নভোতারার আবিষ্কার — ছাব্বিশ বছর বয়সেই বিখ্যাত

মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে ১৫৭৩ সালে টাইকো তাঁর প্রথম গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশ করলেন — অতিনোভা তারা সম্পর্কে।

নভোতারা বা নোভা তারা কী? নক্ষত্রের দেহে পারমাণবিক বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেন নষ্ট হয়ে হিলিয়াম গঠিত হয় এবং প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয়। আরও হিলিয়াম জমতে থাকে, তাপ বাড়তে থাকে। এক সময় নক্ষত্রটি অতিমাত্রায় উজ্জ্বল হয়ে আলো ছড়ায়। এমন নক্ষত্রকেই নোভা বা নভোতারা বলে।

টাইকো ব্রাহে এক বিশেষ ধরনের দূরবীনের সাহায্যে নক্ষত্রের শেষ পরিণতি দেখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে নভোতারার আবিষ্কারক হিসেবে টাইকোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

ডেনমার্কের রাজা খুশি হয়ে তাঁর জন্য সেই বিখ্যাত মানমন্দির করে দিয়েছিলেন যেখানে দীর্ঘ ত্রিশ বছর গবেষণার কাজে লিপ্ত ছিলেন। এরপর তিনি আরও তথ্য আবিষ্কার করলেন এবং সেগুলি নিজের নোটবুকে লিখে রাখলেন ও সংযুক্ত করলেন নিজস্ব মতামত।


টাইকোর সবচেয়ে বড় অবদান

টাইকো ব্রাহের সবচেয়ে বড় অবদান মঙ্গল গ্রহ সম্পর্কীয় গবেষণা, যার ফল সুদূরপ্রসারী।

বিজ্ঞানের চর্চা করার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক। ধর্মের নামে গোঁড়ামি ও কুসংস্কার তিনি পছন্দ করতেন না। মানুষের নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং এই মহৎ উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

এক শ্রেণির ঈর্ষাপরায়ণ ও পরশ্রীকাতর মানুষের জন্য তাঁর জীবন বিষিয়ে উঠেছিল। সেই মানুষরা টাইকো ব্রাহের নামে কুৎসা রটাতে লাগলেন। এই পরিস্থিতি তাঁকে খুবই আঘাত করেছিল। তখন তিনি সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে লুকিয়ে রইলেন মানমন্দিরের মধ্যেই। অবশেষে ডেনমার্ক ত্যাগ করে চলে গেলেন।


শেষ কথা

টাইকো ব্রাহে ভুল মডেল দিয়ে গিয়েছিলেন মহাজাগতিক বিশ্বের। পৃথিবী ঘোরে না — এই কথাটা তিনি ধরে রেখেছিলেন।

কিন্তু যে জিনিসটা তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন, তা কোনো তত্ত্বের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান — বিশ বছরের নিখুঁত তথ্য।

সেই তথ্য দিয়ে কেপলার পেলেন গ্রহের গতির সূত্র। সেই সূত্র দিয়ে নিউটন পেলেন মহাকর্ষের সূত্র। সেই সূত্র দিয়ে আজ আমরা মহাকাশে যান পাঠাই।

একটা সোনার শিকল। আর তার প্রথম কড়া ছিলেন এই মানুষটা — যিনি নাক হারিয়েও আকাশ থেকে মুখ ফেরাননি, রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়েও গবেষণা ছাড়েননি, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শুধু একটাই চায়েছিলেন —

“আমি যেন বৃথা বেঁচে না থাকি।”

বৃথা যাননি, টাইকো। মোটেই বৃথা যাননি।

আরো পড়ুন: থেলস: গ্রিক দর্শনের জনক ও বিজ্ঞানের আদি পথিকৃৎ

আরো পড়ুন: অ্যারিস্টটল: যে বিজ্ঞানী ২,০০০ বছর ধরে পৃথিবীর চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন

  • টাইকো ব্রাহে: যে জ্যোতির্বিদ নাক হারিয়েও আকাশ দেখা থামাননি
    একটু ভাবুন। ১৫৬০ সাল। ডেনমার্কের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে চৌদ্দ বছর বয়সের একটা ছেলে আইন পড়তে বসে আছে। হঠাৎ বাইরে লোকজনের ভিড়। সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে। সূর্যগ্রহণ হচ্ছে। কিন্তু অবাক করা বিষয়টা সূর্যগ্রহণ নয়। অবাক করা বিষয়টা হলো — জ্যোতির্বিদরা আগে থেকেই বলে দিতে পেরেছিলেন ঠিক কখন এই গ্রহণ হবে। নিখুঁতভাবে। এই ছেলেটার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরতে …

    Read more

  • রজার বেকন: মধ্যযুগের অন্ধকারে যে সন্ন্যাসী জ্বালিয়েছিলেন বিজ্ঞানের আলো
    একটু ভাবুন। ত্রয়োদশ শতাব্দী। ইউরোপজুড়ে চার্চের অন্ধকার শাসন। বিজ্ঞানচর্চা মানেই ধর্মের বিরোধিতা। কেউ যদি বলে — “প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করব না” — তাকে পাগল বলা হবে, বিধর্মী বলা হবে। সেই যুগে একজন মানুষ সন্ন্যাসীর পোশাক পরে, হাতে কাচের লেন্স আর বই নিয়ে বললেন — “অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো কিছুই সঠিকভাবে জানা সম্ভব নয়।” এই একটা কথার …

    Read more

  • হ্যানিম্যান: যে ডাক্তার রোগীর যন্ত্রণা দেখে নিজেই ডাক্তারি ছেড়ে দিয়েছিলেন — তারপর বদলে দিয়েছিলেন পুরো চিকিৎসার ধারণাটাই
    একটু ভাবুন। আপনি একজন ডাক্তার। সারাদিন রোগী দেখছেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অস্বস্তি জমছে — কারণ আপনি নিজেই জানেন, আপনি যে চিকিৎসা দিচ্ছেন সেটা রোগীকে সারাচ্ছে না, বরং তাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। রক্তমোক্ষণ, পারদ, জোঁকের ব্যবহার — এই সব “চিকিৎসা” দেখে আপনার বুক ভারী হয়ে আসছে। কী করবেন আপনি? বেশিরভাগ মানুষ হয়তো মুখ বুজে …

    Read more

  • ডিমোক্রিটাস: যে মানুষটা হাসতে হাসতে মহাবিশ্বের রহস্য সমাধান করেছিলেন
    একটা মানুষ, যিনি প্রতিদিন রাস্তায় হাঁটতেন আর মানুষের বোকামি দেখে হাসতেন। প্রতিবেশীরা ভাবত লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই “পাগল” মানুষটাই আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে এমন একটা তত্ত্ব দিয়ে গেছেন, যা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একদম ভিত্তিপ্রস্তর। তাঁর নাম ডিমোক্রিটাস। আবডেরার সেই হাসিখুশি দার্শনিক, যাঁকে ইতিহাস স্মরণ করে “দ্য লাফিং ফিলোসফার” নামে। আজ একটু …

    Read more

  • পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬-২৭: শিক্ষা আর চাকরির ক্ষেত্রে কী কী বদল আসছে, এক নজরে দেখে নিন
    ২২শে জুন, ২০২৬-এ বিধানসভায় পেশ হলো রাজ্যের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট। এবারের ভাবনার কেন্দ্রে আছে “পঞ্চশক্তি” — পাঁচটা স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা। তার মধ্যে দুটো স্তম্ভ সরাসরি ছুঁয়ে যাচ্ছে রাজ্যের ছাত্রছাত্রী আর চাকরিপ্রার্থীদের জীবন — একটা হলো জ্ঞান-শক্তি, অর্থাৎ শিক্ষা ও মানব-মূলধন, আর অন্যটা সেবা-শক্তি, যার অধীনে এসেছে বড় নিয়োগের ঘোষণা। আপনি …

    Read more

  • অ্যারিস্টটল: যে বিজ্ঞানী ২,০০০ বছর ধরে পৃথিবীর চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন
    চীন গ্রিসের এক অসাধারণ বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের জীবন, কাজ এবং অবিনশ্বর উত্তরাধিকারের গল্প কল্পনা করুন — খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর এথেন্স শহর। রাস্তাঘাটে দার্শনিকদের তর্ক, বাজারে বণিকদের কোলাহল, আর সমুদ্রের ধারে জেলেদের নৌকা। সেই পরিবেশে একজন মানুষ প্রতিদিন সকালে লাইসিয়াম নামের বাগানটিতে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর ছাত্রদের পড়াতেন। হাঁটতে হাঁটতে পড়ানোর এই অভ্যাসের জন্যই তাঁর অনুগামীরা পরিচিতি …

    Read more

Leave a Comment