আলেকজান্ডার ফ্লেমিং: পেনিসিলিন আবিষ্কারের পেছনের গল্প

Table of Contents

জন্ম: 6ই আগস্ট, 1981

মৃত্যু: 11 ই মার্চ, 1955

Alexander Fleming
Alexander Fleming আলেকজান্ডার ফ্লেমিং

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ছিলেন একাধারে পদার্থবিদ,জীববিজ্ঞানী এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানী। ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কারের জন্য জগৎ বিখ্যাত। পেনিসিলিন হলো প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক ঔষধ যা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমনের চিকিৎসা করতে ব্যবহার করা হয়। তার অপর একটি আবিষ্কার লাইসোজাইম উৎসেচক। যা তিনি 1921 সালে আবিষ্কার করেন। আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ১৯৪৫ সালে চিকিৎসা বিদ্যায় নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর জন্ম ও শিক্ষাজীবন:

১৮৮১ সালের ৬ ই আগস্ট আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর জন্ম হয় স্কটল্যান্ডে। পিতার নাম হিউগ ফ্লেমিং এবং মা গ্রেস স্টারলিং মর্টন।ফ্লেমিং এর পরিবার ছিল কৃষি নির্ভর পরিবার। তারা মোট সাত ভাই বোন। মাত্র ৭ বছর বয়সে তার পিতার মৃত্যু হয়।

তখন থেকেই তার মাকে কৃষি কাজে সাহায্য করতে থাকেন।ফ্লেমিং লাউডৌন মুর স্কুল এবং দার্ভেল স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। ১৩ বছর বয়সে রয়েল পলিটেকনিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার পড়াশোনার জন্য তার মা অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন।

আর্থিক দারিদ্র্য ও পরিবারের অসচ্ছলতা তার পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।। পড়াশুনা চলাকালীন তিনি পড়ানোর কাজও শুরু করেন। তার দাদাকে অনুসরণ করে তিনি 1908 সালে সেন্ট মেরি’স হসপিটালে স্কলারশিপ নিয়ে ভর্তি হন। এবং কৃতিত্বের সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করেন ও স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হন।

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং: অ্যান্টিবায়োটিকের মহানায়ক

ফ্লেমিং এর ইচ্ছে ছিল তিনি সার্জারি নিয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে ব্যাকটেরিওলজিস্ট হয়ে উঠেন। এই সময় তার শিক্ষক এডওয়ার্ড রাইট এর কাছ থেকে ভ্যাকসিন সম্বন্ধে শিক্ষা লাভ করেন।

তিনি শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নানা রকম ঔষধের বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন স্যার রাইট এর কাছ থেকে।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রয়েল একাডেমী মেডিকেল কর্প এর ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করেন।

যুদ্ধের সময় বিভিন্ন মেডিকেল ক্যাম্পে আহত সৈনিকদের উপর অ্যান্টিসেপটিক এর প্রভাব পর্যালোচনা করেন। আশ্চর্যজনকভাবে তিনি দেখেন ক্ষত নিরাময় অ্যান্টিসেপটিক উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করছে।

এর সাথে রোগীদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহারে। তিনি বললেন যে আন্টিসেপটিক ট্রিটমেন্ট এর ফলে বেশি পরিমাণ সৈন্য মারা যাচ্ছে, যতটা না চোট আঘাতের ইনফেকশন থেকে।

লাইসোজম এর আবিষ্কার

পরীক্ষাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সময় হঠাৎ করেই তিনি আবিষ্কার করেন। এই লাইসোজাইম আমাদের অশ্রু, চামড়া এবং নখে সাধারণভাবে থাকে। ফ্লেমিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি এটি আবিষ্কার করেন। বর্তমানে লাইসোজাইম বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় যেমন ঠান্ডা লাগা, গলা ইনফেকশন এবং প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

পেনিসিলিনের আবিষ্কার Alexander Fleming Discovery and Development of Penicillin in Bengali

তার যুগান্তকারী আবিষ্কার ছিল পেনিসিলিন। ফ্লেমিং এটি আবিষ্কার করেছিলেন একদমই অপ্রত্যাশিতভাবে
১৯২৮ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি কিছু জীবন নিয়ে গবেষণা করছিলেন এবং ল্যাবরেটরীতে সেগুলোকে বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছিলেন।

কিছুদিন পর ছুটি কাটিয়ে এসে ল্যাবরেটরীতে হঠাৎ দেখলেন পাত্রটিতে একটি ডেলা রয়েছে। সেই ডেলাটি জীবাণু ধ্বংস করেছে। প্রথমে তিনি এটিকে ‘মোল্ড জুস‘ নাম দিয়েছিলেন পরবর্তীকালীন নাম হয় পেনিসিলিন।এটি ছিল বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার কারণ এটি আবিষ্কারের পর বহু রোগের নিরাময় সম্ভব হয়েছে।

১৯২৯ সালে ফ্লেমিং এর এই আবিষ্কার বৃটিশ জার্নাল এক্সপেরিমেন্টাল প্যাথলজি তে প্রকাশিত হয়।
যদিও ফ্লেমিং যেটি আবিষ্কার করেন যা জীবাণু ধ্বংস করতে পারে কিন্তু এটি কিভাবে বেশি পরিমাণে উৎপন্ন করতে হয় তার পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারেননি।

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

১৯৪০ সালে বিজ্ঞানী দ্বয় হাওয়ার্ড ফ্লোরে এবং আর্নস্ট বরিস চেইন ফ্লেমিং এর গবেষণা আরো বিস্তারিতভাবে করেন এবং তারা এটি থেকে বেশি পরিমাণে তৈরিতে সক্ষম হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিভিন্ন হসপিটালে এই ওষুধ ব্যবহার হয়েছিল। এর ফলে যুদ্ধ থেকে হওয়া বিভিন্ন ক্ষত খুব দ্রুত নিরাময় করে বহু সৈনিকের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল।

বহু বছর ধরে অনেক মানুষের প্রাণ রক্ষা করেছে ফ্লেমিং এর এই আবিষ্কার।তার ই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ১৯৪৫ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন অন্য আরো দুজন বিজ্ঞানীর সাথে। তখনকার বেশিরভাগ বিজ্ঞান সভার সাম্মানিক সদস্য তাকে করা হয়েছিল। তাকে সোসাইটি ফর জেনারেল মাইক্রোবায়োলজির সভাপতি নির্বাচন করা হয়।

এছাড়াও তাকে হান্টেরিয়ান প্রফেসরশিপ দেওয়া হয়েছিল রয়েল কলেজ অফ সার্জেনস অফ ইংল্যান্ড থেকে। তাছাড়াও তিনি ১৯৪৪ সালে ‘স্যার‘ উপাধি পান।ফ্লেমিং এর স্ত্রীর নাম ছিল সারা মারিওন। তিনি পেশায় ছিলেন একজন নার্স। তাদের একমাত্র সন্তান হয়েছিল যিনি পরবর্তীকালে চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন
১৯৫৫ সালে ১১ ই মার্চ ৭৩ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাক এ ফ্লেমিং মারা যান।

Credit: Wonder House

একটি আবিষ্কার পুরো পৃথিবীকে পাল্টে দিতে পারে। সেই আবিষ্কার মানবজাতির জন্য নিয়ে আসতে পারে ভালো বা মন্দ, দুটোই। কেউ ভালো কাজ করে জায়গা করে নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়, আবার কেউ খারাপ কাজের জন্য পরিচিত হয়েছেন। তবে এমনও কিছু মানুষ আছেন, যারা হঠাৎ করেই বড় কোনো আবিষ্কার করে মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছেন। এরকম উদাহরণ ইতিহাসে খুবই বিরল। এই বিরল মানুষদেরই একজন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। প্রায় নিজের অজান্তেই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন পেনিসিলিন

FAQs

Q.1: আলেকজান্ডার ফ্লেমিং কে ছিলেন?

Ans: আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ছিলেন একাধারে পদার্থবিদ, জীববিজ্ঞানী এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানী। তিনি পেনিসিলিন আবিষ্কারের জন্য বিশ্ববিখ্যাত।

Q.2: পেনিসিলিন কী?

Ans: পেনিসিলিন হলো প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ যা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

Q.3: ফ্লেমিং এর অপর কোনো আবিষ্কার আছে কি?

Ans: হ্যাঁ, তিনি ১৯২১ সালে লাইসোজাইম নামক একটি উৎসেচক আবিষ্কার করেন। এটি সাধারণত মানুষের অশ্রু, চামড়া এবং নখে পাওয়া যায়।

Q.4: আলেকজান্ডার ফ্লেমিং কবে এবং কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?

Ans: তিনি ১৮৮১ সালের ৬ আগস্ট স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন।

Q.5: ফ্লেমিং এর শিক্ষাজীবন কেমন ছিল?

Ans: ফ্লেমিং লাউডৌন মুর স্কুল এবং দার্ভেল স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ১৩ বছর বয়সে রয়েল পলিটেকনিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি সেন্ট মেরি’স হসপিটালে স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং স্বর্ণপদক লাভ করেন।

Q.6: ফ্লেমিং কিভাবে পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন?

Ans: ১৯২৮ সালে, ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে গবেষণা করার সময়, তিনি ল্যাবরেটরিতে একটি ডেলা দেখতে পান যা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করেছিল। পরে এটি পেনিসিলিন নামে পরিচিত হয়।

Q.7: পেনিসিলিনের ব্যাপক উৎপাদন কিভাবে সম্ভব হয়েছিল?

Ans: ১৯৪০ সালে বিজ্ঞানী হাওয়ার্ড ফ্লোরে এবং আর্নস্ট বরিস চেইন ফ্লেমিং এর গবেষণার ওপর ভিত্তি করে পেনিসিলিনের ব্যাপক উৎপাদনের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

Q.8: ফ্লেমিং নোবেল পুরস্কার কবে লাভ করেন?

Ans: তিনি ১৯৪৫ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

Q.9: ফ্লেমিং এর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।

Ans: ফ্লেমিং এর স্ত্রীর নাম ছিল সারা মারিওন, যিনি পেশায় একজন নার্স ছিলেন। তাদের একমাত্র সন্তান চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন।

Q.10: ফ্লেমিং এর মৃত্যু কবে হয়?

Ans: আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ১৯৫৫ সালের ১১ মার্চ ৭৩ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাক এ মৃত্যুবরণ করেন।

আরো পড়ুন :

প্রফুল্ল চাকী: এক অকাল মৃত্যুবরণকারী দেশপ্রেমিক

আরো পড়ুন :

আলবার্ট আইনস্টাইন এর জীবন থেকে ১০টি অজানা তথ্য

আরো পড়ুন :

চারুচন্দ্র দত্ত: ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিস্মরণীয় যোদ্ধা

আরো পড়ুন :

বাংলার রাজনীতিতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস | দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস জীবনী

Leave a Comment