আফ্রিকা কবিতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর

কবি-পরিচিতি

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে, কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে। শৈশব থেকেই সাহিত্যের আবহে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি খুব অল্প বয়স থেকেই ‘ভারতী’ ও ‘বালক’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘হিন্দুমেলার উপহার’, আর প্রথম সার্থক ছোটোগল্প হিসেবে সাহিত্য-সমালোচকেরা ‘দেনাপাওনা’-কে চিহ্নিত করেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অজস্র কবিতা, গান, ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও নাটক রচনা করেছেন; পাশাপাশি ছবিও এঁকেছেন। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ‘গীতাঞ্জলি‘ (Song Offerings)-র ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনিই সমগ্র এশিয়ার মধ্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ভারত ও বাংলাদেশ — এই দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত তাঁরই কলমে রচিত, যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল সম্মান।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘সন্ধ্যাসংগীত’, ‘প্রভাতসংগীত’, ‘মানসী’, ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, ‘গীতাঞ্জলি’, ‘বলাকা’, ‘পূরবী’, ‘মহুয়া’, ‘পুনশ্চ’, ‘পত্রপুট’, ‘শেষ সপ্তক’, ‘নবজাতক’, ‘রোগশয্যায়’ ও ‘আরোগ্য’। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগস্ট এই মহান স্রষ্টার জীবনাবসান ঘটে।


রচনার উৎস ও পটভূমি

উদ্‌ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে
উদ্‌ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে

‘আফ্রিকা’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পত্রপুট‘ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ষোড়শ (১৬ সংখ্যক) কবিতা। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়, পরে ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে সংকলিত হয়। কবি অমিয় চক্রবর্তীর আন্তরিক অনুরোধেই রবীন্দ্রনাথ এই কবিতাটি রচনায় হাত দিয়েছিলেন।

কবিতাটির পিছনে রয়েছে এক জ্বলন্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালির ফ্যাসিস্ট একনায়ক মুসোলিনি আবিসিনিয়া (বর্তমান ইথিওপিয়া) আক্রমণ করেন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এই নির্লজ্জ, বর্বর আগ্রাসন মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথের অন্তরকে গভীরভাবে আলোড়িত করে তোলে।

যুদ্ধ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ এই কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে দ্রোহের আগুন হয়ে জ্বলে উঠেছে। তৃতীয় বিশ্বের একজন কবি হয়েও তিনি এখানে সমগ্র পাশ্চাত্য সভ্যতার আগ্রাসী মুখোশ টেনে খুলে দিয়েছেন।


পাঠ-সারসংক্ষেপ

সৃষ্টির আদিলগ্নে আফ্রিকার জন্ম

কবিতার সূচনায় রবীন্দ্রনাথ আফ্রিকা মহাদেশের ভৌগোলিক জন্মবৃত্তান্ত এক পৌরাণিক কল্পনার আশ্রয়ে তুলে ধরেছেন। সৃষ্টির সেই উদ্‌ভ্রান্ত আদিম যুগে স্রষ্টা যখন নিজের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে অতৃপ্ত, বারবার অসন্তোষে নিজের গড়া রূপকে ভেঙে নতুন করে গড়ছিলেন — সেই অস্থির অধৈর্যের কালে রুদ্র সমুদ্রের প্রবল বাহু পৃথিবীর পূর্ব-ভাগ (প্রাচী ধরিত্রী) থেকে আফ্রিকাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। ঘন অরণ্যের নিবিড় প্রহরায়, স্বল্প আলোর অন্তঃপুরে বন্দি হয়ে রইল এই মহাদেশ।

দুর্গম, রহস্যময় এক ভূখণ্ড

মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আফ্রিকা গড়ে তুলল তার নিজস্ব এক রহস্যময় জগৎ। নিভৃত নির্জনতায় সে সংগ্রহ করছিল দুর্গমের গূঢ় রহস্য, জল-স্থল-আকাশের দুর্বোধ সংকেত পাঠ করছিল, আয়ত্ত করছিল প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু।

ভয়ংকরকে সে বিদ্রূপ করছিল বিরূপের ছদ্মবেশে; নিজেকে উগ্র ও ভীষণ করে তুলে তাণ্ডবের দুন্দুভিনিনাদে আশঙ্কাকেও হার মানাতে চাইছিল। এই বন্য, আদিম শক্তির আবরণেই ঢাকা ছিল আফ্রিকার প্রকৃত মানবরূপ।

ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন ও দাসত্বের কলঙ্ক

‘হায় ছায়াবৃতা’ — এই করুণ সম্বোধনে কবি আফ্রিকার দুর্ভাগ্যের কথা বলেছেন। কালো ঘোমটার নীচে তার মানবরূপ ছিল অপরিচিত, উপেক্ষার মলিন দৃষ্টিতে ঢাকা। এমন সময় এল লোভী, বর্বর মানুষের দল — যাদের নখ আফ্রিকার হিংস্র নেকড়ের চেয়েও তীক্ষ্ণ, যাদের গর্ব সূর্যহারা অরণ্যের অন্ধকারের চেয়েও গভীর। লোহার হাতকড়ি নিয়ে, পায়ে কাঁটা-বসানো জুতো পরে এল এই ‘মানুষ-ধরার দল’।

সভ্য বলে পরিচয় দেওয়া এই মানুষদের বর্বর লোভ নিজেদের নির্লজ্জ অমানুষিকতাকেই উন্মোচিত করে দিল। তারা আফ্রিকার সম্পদ লুণ্ঠন করল, নিরীহ মানুষদের ক্রীতদাস বানিয়ে ধরে নিয়ে গেল নিজেদের দেশে। আফ্রিকার ভাষাহীন ক্রন্দনে অরণ্যপথ বাষ্পাকুল হয়ে উঠল, রক্ত আর অশ্রুতে মিশে কর্দমাক্ত হয়ে উঠল সেই মাটি।

দস্যুদের কাঁটা-মারা জুতোর তলায় জমে থাকা বীভৎস কাদার পিণ্ড আফ্রিকার অপমানিত ইতিহাসে চিরকালীন কলঙ্কচিহ্ন এঁকে দিল।

অত্যাচারীর দেশে ভণ্ড ধর্মাচরণ

কবি এখানে এক মর্মভেদী বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন। যে মুহূর্তে আফ্রিকার মাটি রক্তে-অশ্রুতে ভিজছিল, ঠিক সেই সময়েই সমুদ্রপারে অত্যাচারীদের দেশে (ইউরোপে) মন্দিরে মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘণ্টা, সকাল-সন্ধ্যায় দয়াময় দেবতার নামে চলছিল আরাধনা, শিশুরা খেলা করছিল মায়ের কোলে, আর কবিরা সংগীতে গাইছিল সৌন্দর্যের বন্দনা।

এক পক্ষ যখন অসুন্দরের নির্মম রচনায় ব্যস্ত, তখন সেই একই সভ্যতা অন্যদিকে সুন্দরের উপাসনার ভান করছে — এই ভয়ংকর দ্বিচারিতাই মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথকে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

যুগান্তরের কবির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার আহ্বান

কবিতার শেষাংশে রবীন্দ্রনাথ কালচেতনার এক গভীর মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। আজ যখন পশ্চিম দিগন্তে প্রদোষকালের ঝঞ্ঝাবাতাসে সভ্যতা রুদ্ধশ্বাস, যখন গুপ্ত গহ্বর থেকে পশুরা বেরিয়ে এসে অশুভ ধ্বনিতে দিনের অন্তিমকাল ঘোষণা করছে — তখন কবি আহ্বান জানাচ্ছেন ‘যুগান্তরের কবি’-কে।

এই যুগান্তরের কবি হলেন নতুন যুগের সেই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, মানবপ্রেমী স্রষ্টা, যিনি সমস্ত গ্লানি ও মালিন্য ঘুচিয়ে মানবতার নবযুগ আনবেন। কবি তাঁকে বলছেন — আসন্ন সন্ধ্যার শেষ আলোয় সেই ‘মানহারা মানবী’ আফ্রিকার দ্বারে গিয়ে দাঁড়াতে এবং সভ্যতার অপরাধের জন্য বলতে, ‘ক্ষমা করো’।

এই ক্ষমাপ্রার্থনাই যেন হয় হিংস্র প্রলাপে মত্ত এই সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী। মানবতা, অহিংসা আর প্রেমের পথেই যে অমানবিকতার প্রকৃত প্রায়শ্চিত্ত সম্ভব — এই আস্তিক্যবোধই রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী চেতনার চূড়ান্ত প্রকাশ।


বিশেষ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ
উদ্‌ভ্রান্তউন্মত্ত, দিশাহারা
প্রাচীপৃথিবীর পূর্বভাগ / পূর্বদিক
বনস্পতিযে বড়ো গাছে ফুল না হয়েই ফল ধরে; বৃহৎ বৃক্ষ
দৃষ্টি-অতীতযা চোখে দেখা যায় না
দুন্দুভিদামামা-জাতীয় বাদ্যযন্ত্র, বিশেষত যুদ্ধযাত্রার সময় বাজানো হয়
নিনাদগম্ভীর শব্দ, ধ্বনি
ছায়াবৃতাছায়ায় আচ্ছাদিত
আবিলকলুষিত, মলিন, ঘোলাটে
পঙ্কিলকাদায় ভরা, কর্দমাক্ত
বিভীষিকাভয়ংকর ব্যাপার, আতঙ্ক
প্রদোষকালসন্ধ্যা, দিনের অন্তিম লগ্ন
প্রলাপঅর্থহীন বিকৃত কথা
পুণ্যবাণীপবিত্র বাণী


প্রশ্নোত্তর

এসো যুগান্তরের কবি
এসো যুগান্তরের কবি

ক · অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান: ১)

১. ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?

উত্তর: ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।

২. ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি কোন পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়?

উত্তর: কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়।

৩. কোন কবির অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি রচনা করেন?

উত্তর: কবি অমিয় চক্রবর্তীর অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি রচনা করেন।

৪. উদ্‌ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে কী ঘটেছিল?

উত্তর: সৃষ্টির আদিম যুগে স্রষ্টা নিজের সৃষ্টির প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে নিখুঁত করে তোলার জন্য নতুন সৃষ্টিকে বারবার বিধ্বস্ত করেছিলেন।

৫. ‘ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে, আফ্রিকা’ — কে, কাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল?

উত্তর: রুদ্র সমুদ্রের বাহু প্রাচী ধরিত্রীর বুক থেকে আফ্রিকাকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

৬. ‘প্রাচী ধরিত্রী’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

উত্তর: ‘প্রাচী ধরিত্রী’ বলতে পৃথিবীর পূর্বভাগ বা পূর্বদিকের ভূখণ্ডকে বোঝানো হয়েছে।

৭. আফ্রিকা নিভৃত অবকাশে কী সংগ্রহ করছিল?

উত্তর: আফ্রিকা নিভৃত অবকাশে দুর্গমের রহস্য সংগ্রহ করছিল।

৮. ‘হায় ছায়াবৃতা’ — আফ্রিকাকে ‘ছায়াবৃতা’ বলার কারণ কী?

উত্তর: ঘন অরণ্যে আচ্ছাদিত আফ্রিকা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় সেখানে দীর্ঘদিন সূর্যের আলো ও সভ্যতার আলো পৌঁছাতে পারেনি; তাই তাকে ‘ছায়াবৃতা’ বলা হয়েছে।

৯. ‘এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে’ — ‘ওরা’ কারা?

উত্তর: ‘ওরা’ বলতে অত্যাচারী ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শক্তিকে বোঝানো হয়েছে।

১০. আফ্রিকার নেকড়ের সঙ্গে কীসের তুলনা করা হয়েছে?

উত্তর: অত্যাচারী ঔপনিবেশিকদের তীক্ষ্ণ নখকে আফ্রিকার নেকড়ের নখের চেয়েও ধারালো বলে তুলনা করা হয়েছে।

১১. আফ্রিকার মাটি কীসে পঙ্কিল হয়ে উঠেছিল? উত্তর: আফ্রিকার নিরীহ মানুষদের রক্ত ও অশ্রু মিশে মাটির ধুলো পঙ্কিল হয়ে উঠেছিল।

১২. সমুদ্রপারে অত্যাচারীদের দেশে সেই সময় কী ঘটছিল?

উত্তর: সমুদ্রপারে অত্যাচারীদের দেশে মন্দিরে পূজার ঘণ্টা বাজছিল, দেবতার আরাধনা চলছিল, শিশুরা মায়ের কোলে খেলছিল এবং কবিরা সৌন্দর্যের বন্দনা করছিল।

১৩. কবি ‘যুগান্তরের কবি’-কে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে বলেছেন?

উত্তর: কবি ‘যুগান্তরের কবি’-কে ‘মানহারা মানবী’ আফ্রিকার দ্বারে গিয়ে দাঁড়াতে বলেছেন।

১৪. যুগান্তরের কবিকে আফ্রিকার দ্বারে গিয়ে কী বলতে বলা হয়েছে?

উত্তর: যুগান্তরের কবিকে আফ্রিকার দ্বারে গিয়ে ‘ক্ষমা করো’ বলতে বলা হয়েছে।

১৫. কবির মতে সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী কী হওয়া উচিত?

উত্তর: কবির মতে অত্যাচারিত আফ্রিকার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনাই হওয়া উচিত সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।

১৬. ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থে ‘আফ্রিকা’ কত সংখ্যক কবিতা?

উত্তর: ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থে ‘আফ্রিকা’ ষোড়শ (১৬) সংখ্যক কবিতা।

১৭. আফ্রিকা কীসের ছদ্মবেশে ভীষণকে বিদ্রূপ করছিল?

উত্তর: আফ্রিকা বিরূপের ছদ্মবেশে ভীষণকে বিদ্রূপ করছিল।

১৮. ‘দুন্দুভি’ শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: ‘দুন্দুভি’ হল দামামা-জাতীয় বাদ্যযন্ত্র, যা বিশেষত যুদ্ধযাত্রার সময় বাজানো হয়।


খ · সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান: ৩)

আফ্রিকা — রহস্যময় অরণ্য
আফ্রিকা — রহস্যময় অরণ্য

১. ‘হায় ছায়াবৃতা’ — ‘ছায়াবৃতা’ কথাটি কোথায়, কাকে এবং কেন প্রয়োগ করা হয়েছে?

উত্তর: মানবতাবাদী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘আফ্রিকা’ কবিতায় আফ্রিকা মহাদেশকে ‘ছায়াবৃতা’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে।

আফ্রিকাকে ‘ছায়াবৃতা’ বলার পিছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, আফ্রিকা মহাদেশ নিবিড় অরণ্যে পরিবেষ্টিত। সেখানকার বনভূমি এতটাই ঘন যে গাছপালার আবরণ ভেদ করে সূর্যের আলো মাটি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না; ফলে সমগ্র মহাদেশ যেন এক চিরস্থায়ী ছায়ার আচ্ছাদনে ঢাকা থাকে।

দ্বিতীয়ত, ভৌগোলিক দূরত্ব ও দুর্গমতার কারণে দীর্ঘকাল আফ্রিকা মূল সভ্য পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, বাইরের জগতের জ্ঞান ও আলো সেখানে প্রবেশ করতে পারেনি।

এই দ্বিবিধ অন্ধকার — প্রাকৃতিক ছায়া এবং সভ্যতার আলো থেকে বঞ্চনার অন্ধকার — একত্রে আফ্রিকাকে রহস্যময় ও অপরিচিত করে রেখেছিল। এই কারণেই কবি করুণ সহানুভূতিতে আফ্রিকাকে ‘ছায়াবৃতা’ বলে অভিহিত করেছেন।


২. ‘এল মানুষ-ধরার দল’ — ‘মানুষ ধরার দল’ বলতে কবি কাদের বুঝিয়েছেন? তাদের স্বরূপ বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতায় ‘মানুষ-ধরার দল’ বলতে কবি পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শক্তিকে বুঝিয়েছেন। ঔপনিবেশিক যুগে যারা লোভের বশবর্তী হয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে উপনিবেশ বিস্তার করতে ছড়িয়ে পড়েছিল, তারাই এই দল।

এদের স্বরূপ ছিল অত্যন্ত নির্মম ও অমানবিক। এরা আফ্রিকার প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদ লুণ্ঠন করার জন্য সেই মহাদেশে হানা দিয়েছিল। লোহার হাতকড়ি নিয়ে, পায়ে কাঁটা-বসানো জুতো পরে এসে তারা আফ্রিকার সরল-নিরীহ মানুষদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিল। এদের নখ ছিল আফ্রিকার হিংস্র নেকড়ের চেয়েও তীক্ষ্ণ, এদের অহংকার ছিল সূর্যহারা অরণ্যের অন্ধকারের চেয়েও গভীর ও কালো।

তারা আফ্রিকার নিরপরাধ মানুষদের বন্দি করে ক্রীতদাস বানিয়ে নিজেদের দেশে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের সীমাহীন অত্যাচারে আফ্রিকার অরণ্য বাষ্পাকুল হয়ে ওঠে, রক্ত-অশ্রুতে পঙ্কিল হয়ে ওঠে সেখানকার মাটি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে তাদের এই বর্বরতা এক চিরকলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে রইল।


৩. ‘দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে’ — ‘মানহারা মানবী’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? কাকে তার দ্বারে দাঁড়াতে বলা হয়েছে এবং কেন?

উত্তর: ‘আফ্রিকা’ কবিতায় ‘মানহারা মানবী’ বলতে সম্মান ও মর্যাদা হারানো, অপমানিত ও লাঞ্ছিত আফ্রিকা মহাদেশকে বোঝানো হয়েছে। পাশ্চাত্য সভ্যতার পৈশাচিক অত্যাচার ও লুণ্ঠনে যে অমানবিকতা প্রকাশ পেয়েছে, তা আফ্রিকার আত্মমর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে; তাই তাকে ‘মানহারা মানবী’ রূপে কল্পনা করা হয়েছে।

কবি ‘যুগান্তরের কবি’-কে এই মানহারা মানবীর দ্বারে গিয়ে দাঁড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই যুগান্তরের কবি হলেন নতুন যুগের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, মানবতাবাদী স্রষ্টা।

তাঁকে সেখানে দাঁড়াতে বলার কারণ, রবীন্দ্রনাথ চান আফ্রিকার ওপর সংঘটিত অত্যাচারের জন্য সভ্যতার পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়া হোক। কারণ কবির বিশ্বাস, মানবতাবাদের প্রতিনিধি এই কবিই সমস্ত গ্লানি ও মালিন্যের অবসান ঘটিয়ে মানবপ্রেমের নবযুগ আনবেন — যে যুগে কোনো মানুষকে আর অন্য মানুষের হাতে অপমানিত বা লাঞ্ছিত হতে হবে না। এই ক্ষমাপ্রার্থনার মধ্য দিয়েই সম্ভব অমানবিকতার প্রকৃত প্রায়শ্চিত্ত।


৪. ‘সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই’ — ‘সেই মুহূর্তে’ সমুদ্রপারে কী ঘটছিল? এর মধ্য দিয়ে কবি কোন বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন?

উত্তর: রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’ কবিতায় যে মুহূর্তে আফ্রিকার মাটি নিরীহ মানুষের রক্ত ও অশ্রুতে পঙ্কিল হয়ে উঠছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই সমুদ্রপারে অত্যাচারীদের দেশে (ইউরোপে) এক ভিন্ন দৃশ্য রচিত হচ্ছিল। সেখানে পাড়ায় পাড়ায় মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘণ্টা, সকাল-সন্ধ্যায় দয়াময় দেবতার নামে চলছিল উপাসনা, শিশুরা নিশ্চিন্তে খেলা করছিল মায়ের কোলে, আর কবিরা সংগীতে গাইছিল সৌন্দর্যের আরাধনা।

এই বর্ণনার মধ্য দিয়ে কবি এক মর্মভেদী বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন। একই সভ্যতা একদিকে দূর দেশে বর্বর নিষ্ঠুরতায় অসুন্দরের রচনা করছে, আবার নিজের ঘরে ফিরে সেই সভ্যতাই ধর্ম, স্নেহ আর সৌন্দর্যের উপাসনার ভান করছে।

ধর্মাচরণ ও নান্দনিকতার এই মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সাম্রাজ্যবাদী দ্বিচারিতা ও ভণ্ডামিকেই কবি এই তীব্র বৈপরীত্যের মাধ্যমে উন্মোচিত করেছেন, যা মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথের অন্তরে গভীর বেদনা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।


৫. ‘চিরচিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে’ — কারা, কীসের চিরচিহ্ন রেখে গেল? এই উক্তির তাৎপর্য লেখো।

উত্তর: ‘আফ্রিকা’ কবিতায় অত্যাচারী ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি আফ্রিকার ইতিহাসে অপমান ও লাঞ্ছনার চিরস্থায়ী চিহ্ন রেখে গিয়েছিল।

দস্যুবৃত্তিতে নেমে আসা এই সভ্য বলে দাবি করা মানুষেরা আফ্রিকার নিরীহ অধিবাসীদের ওপর যে বর্বর নির্যাতন চালিয়েছিল, তারই ফলে তাদের কাঁটা-মারা জুতোর তলায় জমে ওঠা রক্ত-অশ্রু-কাদার বীভৎস পিণ্ড আফ্রিকার মাটিতে কলঙ্কের ছাপ এঁকে দিয়েছিল।

এই উক্তির তাৎপর্য গভীর। মানুষের ওপর মানুষের এই নির্মম অত্যাচারের অধ্যায় শুধু আফ্রিকার নয়, সমগ্র মানবসভ্যতার ইতিহাসেই এক অমোচনীয় লজ্জা ও কলঙ্ক হয়ে চিরকাল টিকে থাকবে। কবি বোঝাতে চেয়েছেন, সাম্রাজ্যবাদের এই পাশবিকতা শুধু একটি মহাদেশের বেদনার কাহিনি নয়, বরং মানবতার প্রতি এক চিরন্তন অভিশাপ, যার দায় গোটা সভ্য মানবজাতিকে বহন করতে হবে।


গ · ব্যাখ্যাধর্মী / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান: ৫)

সভ্যতার দুই মুখ
সভ্যতার দুই মুখ

১. ‘আফ্রিকা’ কবিতা অবলম্বনে উপেক্ষিত ও অত্যাচারিত আফ্রিকার বর্ণনা দাও। কবি কীভাবে মানহারা আফ্রিকার পাশে দাঁড়াতে চেয়েছেন তা আলোচনা করো। (৩+২)

উত্তর: মানবতাবাদী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘আফ্রিকা’ কবিতায় এক ধারাবাহিক শোষণ ও লাঞ্ছনার ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

উপেক্ষিত ও অত্যাচারিত আফ্রিকা: প্রকৃতির নিবিড় অরণ্যে ঘেরা আফ্রিকা দীর্ঘকাল সভ্য পৃথিবীর কাছে ছিল অপরিচিত, উপেক্ষিত ও ‘ছায়াবৃতা’। কালো ঘোমটার নীচে তার মানবরূপ ছিল অচেনা, উপেক্ষার মলিন দৃষ্টিতে ঢাকা। কিন্তু সেই নির্জন প্রশান্তি বেশিদিন টেকেনি। যেদিন থেকে সম্পদলোভী সভ্য মানুষের পা আফ্রিকার মাটিতে পড়ল, সেদিন থেকেই শুরু হল পাশবিক নির্যাতন।

অস্ত্রের বলে বলীয়ান পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতা তার নখ-দন্ত বিকশিত করে ঝাঁপিয়ে পড়ল আফ্রিকার সরল মানুষদের ওপর। তারা এল লোহার হাতকড়ি নিয়ে, পায়ে কাঁটা-মারা জুতো পরে। আফ্রিকার সম্পদ তারা লুণ্ঠন করল, নিরপরাধ মানুষদের ক্রীতদাস বানিয়ে ধরে নিয়ে গেল নিজেদের দেশে।

তাদের অকথ্য অত্যাচারে আফ্রিকার ভাষাহীন ক্রন্দনে অরণ্যপথ বাষ্পাকুল হয়ে উঠল, রক্ত-অশ্রুতে পঙ্কিল হয়ে উঠল সেই মাটি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই অধ্যায় এক চিরন্তন কলঙ্ক হয়ে রইল।

মানহারা আফ্রিকার পাশে কবির অবস্থান: এই কবিতায় আফ্রিকা মুমূর্ষু মানবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। কবি বিশ্বাস করেন, মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচারের এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের প্রকৃত প্রায়শ্চিত্ত সম্ভব একমাত্র ক্ষমা ও মানবপ্রেমের মধ্য দিয়ে।

তাই তিনি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ‘যুগান্তরের কবি’-কে আহ্বান জানিয়েছেন আফ্রিকার ‘মানহারা মানবীর’ দ্বারে গিয়ে দাঁড়াতে এবং অত্যাচারী সভ্যতার হয়ে সেই নির্যাতিত মহাদেশের কাছে ‘ক্ষমা করো’ বলে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে। কবির মতে, অহিংসা, প্রেম ও মানবিকতার এই বাণীই যেন হয় হিংস্র প্রলাপে মত্ত সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী। এভাবেই মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ অপমানিত আফ্রিকার পাশে সহমর্মিতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়েছেন।


২. ‘এসো যুগান্তরের কবি’ — ‘যুগান্তরের কবি’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? কবি তাঁকে কেন আহ্বান করেছেন? (২+৩)

উত্তর: যুগান্তরের কবির স্বরূপ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতায় ‘যুগান্তরের কবি’ বলতে বোঝানো হয়েছে নতুন যুগের সেই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, মানবতাবাদী স্রষ্টাকে, যিনি মানবপ্রেম ও মানবধর্মের আদর্শে উদ্বুদ্ধ।

তিনি যাবতীয় অসুন্দর ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে মানবপ্রেমের গান গাইবেন এবং সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করবেন। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের অবসানের পর আসন্ন যে মানবতাবাদী নবযুগ — যে যুগে কোনো মানুষকে আর অন্য মানুষের হাতে অপমানিত বা লাঞ্ছিত হতে হবে না — সেই যুগের কাণ্ডারি হিসেবেই কবি এই যুগান্তরের কবিকে কল্পনা করেছেন।

আহ্বানের কারণ: কবিতায় রবীন্দ্রনাথ আফ্রিকার ওপর হওয়া অত্যাচারকে মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক চিরচিহ্নিত কলঙ্কজনক অধ্যায় বলে চিহ্নিত করেছেন, যা মানবসমাজের চিরস্থায়ী লজ্জা। এই লজ্জা নিবারণের জন্য, এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য সভ্য মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে, অত্যাচারিত ও অপমানিত মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে — তবেই প্রকৃত পাপস্খলন সম্ভব।

আজ যখন পশ্চিম দিগন্তে সভ্যতার প্রদোষকাল ঘনিয়ে এসেছে, যখন গুপ্ত গহ্বর থেকে পশুরূপী হিংস্রতা বেরিয়ে এসে অশুভ ধ্বনিতে দিনের অন্তিমকাল ঘোষণা করছে — তখন কবি এই যুগান্তরের কবিকে আহ্বান করেছেন, যাতে তিনি অমানবিকতার অন্ধকার ও হিংসার প্রলাপের মধ্য থেকে মানবসভ্যতাকে মানবতার আলোয় উত্তীর্ণ করতে পারেন। তাঁকে আসন্ন সন্ধ্যার শেষ আলোয় মানহারা আফ্রিকার দ্বারে দাঁড়িয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে বলা হয়েছে,

কারণ এই ক্ষমা ও প্রেমের বাণীই সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী হয়ে উঠতে পারে। মূলত মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথের আস্তিক্য চেতনা ও মানবধর্মে অবিচল বিশ্বাসেরই প্রতিফলন ঘটেছে এই আহ্বানে।


৩. ‘আফ্রিকা’ কবিতা অবলম্বনে পাশ্চাত্য সভ্যতার আগ্রাসী ও দ্বিচারী স্বরূপ বিশ্লেষণ করো। (৫)

উত্তর: ‘আফ্রিকা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতার দুটি বিপরীত মুখ — আগ্রাসী নিষ্ঠুরতা এবং ভণ্ড ধর্মাচরণ — অসামান্য দক্ষতায় উন্মোচিত করেছেন।

আগ্রাসী স্বরূপ: নবজাগরণে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে পশ্চিমের উন্নত জাতিগুলি যখন দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল, তখন নতুন নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছে নিজেদের লোভ চরিতার্থ করতে তারা অমানবিক শোষণ শুরু করল। অস্ত্রবলে বলীয়ান এই সভ্যতা আফ্রিকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদের লোভে সেখানে হানা দিল।

লোহার হাতকড়ি ও কাঁটা-মারা জুতো নিয়ে আসা এই ‘সভ্য’ মানুষেরা আফ্রিকার নিরীহ মানুষদের ওপর যে বর্বরতা চালাল, তা হিংস্র নেকড়ের পাশবিকতাকেও হার মানায়। কবির ভাষায়, তাদের নখ ছিল নেকড়ের চেয়েও তীক্ষ্ণ, তাদের মনের অন্ধকার ছিল আফ্রিকার সূর্যহারা নিবিড় অরণ্যের চেয়েও কালো। তারা সম্পদ লুণ্ঠন করল, মানুষদের ক্রীতদাস বানিয়ে ধরে নিয়ে গেল নিজেদের দেশে।

দ্বিচারী স্বরূপ: কবির অসামান্য শিল্পদক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে সেই মর্মন্তুদ বৈপরীত্যের চিত্রণে। যখন আফ্রিকার মাটি রক্তে-অশ্রুতে ভিজছিল, ঠিক তখন সমুদ্রপারে সেই অত্যাচারীদের দেশে মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘণ্টা, দয়াময় দেবতার নামে চলছিল আরাধনা, শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে, কবিরা করছিল সৌন্দর্যের বন্দনা।

যে সভ্যতা দূর দেশে নির্মম দস্যুবৃত্তিতে লিপ্ত, সেই একই সভ্যতা নিজভূমে ধর্ম, স্নেহ ও সৌন্দর্যের উপাসক সেজে আছে। ধর্মের মুখোশের আড়ালে লুকানো এই ভয়ংকর দ্বিচারিতাই সাম্রাজ্যবাদের প্রকৃত চরিত্র।

মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ এই আগ্রাসন ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদকে মানবতাবাদের পরিপন্থী বলে মনে করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমা, প্রেম ও মানবিকতার আদর্শকেই সভ্যতার প্রকৃত মুক্তির পথ হিসেবে তুলে ধরেছেন।


৪. ‘আফ্রিকা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী চেতনার পরিচয় দাও। (৫)

উত্তর: ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদী চেতনার এক উজ্জ্বল দলিল। তৃতীয় বিশ্বের একজন কবি হয়েও তিনি এখানে সংকীর্ণ দেশ বা জাতিগত সীমা অতিক্রম করে সমগ্র মানবজাতির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ইতালির মুসোলিনি যখন আবিসিনিয়া আক্রমণ করেন, সেই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন কবির মানবিক অন্তরকে আলোড়িত করে তোলে। তিনি দূরদেশের নিপীড়িত আফ্রিকার বেদনাকে নিজের বেদনা বলে অনুভব করেছেন — এখানেই তাঁর বিশ্বমানবতাবোধের প্রকাশ।

কবি মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচারকে গোটা মানবসভ্যতার লজ্জা বলে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর কাছে অন্যায় দেশ-কাল নির্বিশেষে অন্যায়ই; অত্যাচারীর জাতি বা ধর্ম যাই হোক, নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ানোই মানবধর্ম। তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতাকে মানবতার পরিপন্থী বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

কবিতার শেষে তাঁর মানবতাবাদ পৌঁছেছে এক আধ্যাত্মিক উচ্চতায়। তিনি প্রতিশোধ নয়, ঘৃণা নয় — বরং ক্ষমা ও প্রেমকেই অমানবিকতার প্রকৃত প্রায়শ্চিত্ত বলে ঘোষণা করেছেন। অত্যাচারিত আফ্রিকার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনাকে তিনি সভ্যতার ‘শেষ পুণ্যবাণী’ বলে অভিহিত করেছেন। এই ক্ষমাশীলতা ও প্রেমের আদর্শই প্রমাণ করে, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নয়, তা মানুষের শুভবুদ্ধি ও নৈতিক উত্তরণে গভীরভাবে আস্থাশীল।


৫. ‘আফ্রিকা’ কবিতায় আফ্রিকা মহাদেশের সৃষ্টি ও প্রাকৃতিক স্বরূপের যে বর্ণনা রয়েছে তা নিজের ভাষায় লেখো। (৫)

উত্তর: ‘আফ্রিকা’ কবিতার সূচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক পৌরাণিক কল্পনার আশ্রয়ে আফ্রিকা মহাদেশের সৃষ্টি ও তার আদিম প্রাকৃতিক রূপ তুলে ধরেছেন।

সৃষ্টির বৃত্তান্ত: কবি বলেছেন, সৃষ্টির সেই উদ্‌ভ্রান্ত আদিম যুগে স্রষ্টা যখন নিজের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে অতৃপ্ত ছিলেন, বারবার অসন্তোষে নতুন সৃষ্টিকে ভেঙে গড়ছিলেন — সেই অধৈর্যের অস্থির মুহূর্তে রুদ্র সমুদ্রের প্রবল বাহু পৃথিবীর পূর্বভাগ (প্রাচী ধরিত্রী) থেকে আফ্রিকাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল।

তারপর ঘন অরণ্যের নিবিড় প্রহরায়, স্বল্প আলোর অন্তঃপুরে বন্দি করে রাখল এই মহাদেশকে। ভৌগোলিকভাবে এই বর্ণনা ইঙ্গিত করে, একসময় আফ্রিকা প্রাচ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল, পরে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনে তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

প্রাকৃতিক স্বরূপ: বিচ্ছিন্ন আফ্রিকা নিভৃত অবকাশে গড়ে তুলল তার নিজস্ব রহস্যময় জগৎ। সে সংগ্রহ করছিল দুর্গমের রহস্য, চিনে নিচ্ছিল জল-স্থল-আকাশের দুর্বোধ সংকেত, আয়ত্ত করছিল প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু। বিরূপের ছদ্মবেশে সে ভীষণকে বিদ্রূপ করছিল, নিজেকে উগ্র ও ভয়ংকর করে তুলে তাণ্ডবের দুন্দুভিনিনাদে আশঙ্কাকেও হার মানাতে চাইছিল।

এই দুর্গম, ভয়ংকর ও রহস্যময় প্রকৃতির আবরণেই ঢাকা ছিল আফ্রিকার প্রকৃত মানবরূপ, যা দীর্ঘকাল সভ্য পৃথিবীর কাছে থেকে গিয়েছিল অপরিচিত ও উপেক্ষিত। কবির এই বর্ণনায় আফ্রিকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভয়াবহতা ও রহস্যময়তা এক অপূর্ব শিল্পরূপ লাভ করেছে।

অসুখী একজন প্রশ্ন উত্তর — পাবলো নেরুদা (অনুবাদ: নবারুণ ভট্টাচার্য)

জ্ঞানচক্ষু প্রশ্ন উত্তর — আশাপূর্ণা দেবী

  • সংস্কৃত কারক-বিভক্তি প্রশ্ন উত্তর | HS তৃতীয় সেমিস্টার ব্যাকরণ সাজেশন 2026
    উচ্চ মাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সেমিস্টার সংস্কৃত কারক-বিভক্তি প্রশ্ন উত্তর (কর্তৃ, কর্ম, করণ) অধ্যায়ের সম্পূর্ণ MCQ, শূন্যস্থান, স্তম্ভ মিলিয়ে ও সত্য-মিথ্যা প্রশ্ন উত্তর। সংস্কৃত কারক-বিভক্তি প্রশ্ন উত্তর — HS তৃতীয় সেমিস্টার সম্পূর্ণ সাজেশন উচ্চ মাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সেমিস্টার সংস্কৃত ব্যাকরণের কারক-বিভক্তি (কর্তৃ, কর্ম, করণ) অধ্যায় থেকে পরীক্ষায় নিয়মিত প্রশ্ন আসে। আজকের পোস্টে সংস্কৃত কারক-বিভক্তি …

    Read more

  • সংস্কৃত প্রত্যয় প্রশ্ন উত্তর | HS তৃতীয় সেমিস্টার তদ্ধিত-নামধাতু সাজেশন ২০২৬
    উচ্চ মাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সেমিস্টার সংস্কৃত প্রত্যয় প্রশ্ন উত্তর অধ্যায়ের (অণ্, মতুপ্, তরপ্, তমপ্, ঈয়সুন্, ইষ্ঠন্, ক্যচ, কাম্যচ, ক্যঙ্) সম্পূর্ণ MCQ, শূন্যস্থান, স্তম্ভ মিলিয়ে ও সত্য-মিথ্যা প্রশ্ন উত্তর। সংস্কৃত প্রত্যয় প্রশ্ন উত্তর — HS তৃতীয় সেমিস্টার তদ্ধিত ও নামধাতু সম্পূর্ণ সাজেশন উচ্চ মাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সেমিস্টার সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রত্যয় অধ্যায় (তদ্ধিত প্রত্যয়: অণ্, …

    Read more

  • WBCHSE Unseen Comprehension Class 12 তৃতীয় সিমেস্টার Unseen — ১০টা সম্পূর্ণ প্যাসেজ, প্রশ্ন ও উত্তর
    WBCHSE দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সিমেস্টার ইংরেজি পরীক্ষার জন্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ-ভিত্তিক ১০টা WBCHSE Unseen Comprehension Class 12 প্যাসেজ, প্রতিটাতে ১০টা করে প্রশ্ন উত্তরসহ। WBCHSE Unseen Comprehension Class 12 তৃতীয় সিমেস্টার ১০টা সম্পূর্ণ প্যাসেজ ও প্রশ্ন-উত্তর WBCHSE দ্বাদশ শ্রেণির (তৃতীয় সিমেস্টার) মডেল প্রশ্নপত্রগুলোতে প্রতিবারই একটা করে Unseen Comprehension প্যাসেজ থাকে (নম্বর ৩১-৪০), যেখানে একজন বিজ্ঞানী/গবেষক বিরল বন্যপ্রাণী …

    Read more

  • WBCHSE Textual Grammar Class 12 — সব টেক্সট থেকে সম্পূর্ণ প্রশ্ন-উত্তর
    The Bet, Strong Roots, Night Train at Deoli, Our Casuarina Tree, Ulysses ও Riders to the Sea — এই ছয়টা টেক্সট থেকে WBCHSE Textual Grammar Class 12-এর সবকটা প্রশ্নের উত্তরসহ সম্পূর্ণ সংকলন। WBCHSE Textual Grammar Class 12 দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সিমেস্টার সম্পূর্ণ গ্রামার প্রশ্ন-উত্তর WBCHSE দ্বাদশ শ্রেণির (তৃতীয় সিমেস্টার) ইংরেজি পরীক্ষায় প্রতিটা টেক্সট থেকে আলাদা …

    Read more

  • Strong Roots Abdul Kalam WBCHSE MCQ — WBCHSE Class 12 তৃতীয় সিমেস্টার সম্পূর্ণ MCQ
    Strong Roots Abdul Kalam WBCHSE MCQ — WBCHSE Class 12 প্রবন্ধের WBCHSE দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সিমেস্টার সিলেবাসের সবকটা প্রশ্নের উত্তরসহ সম্পূর্ণ সংকলন। Strong Roots Abdul Kalam WBCHSE MCQ দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সিমেস্টার সম্পূর্ণ MCQ প্রশ্ন-উত্তর A.P.J. Abdul Kalam-এর আত্মজৈবনিক রচনা Strong Roots (Wings of Fire বই থেকে নেওয়া) WBCHSE দ্বাদশ শ্রেণির (তৃতীয় সিমেস্টার) ইংরেজি সিলেবাসের …

    Read more

  • Riders to the Sea Synge WBCHSE MCQ— WBCHSE Class 12 তৃতীয় সিমেস্টার সম্পূর্ণ MCQ প্রশ্ন-উত্তর
    Riders to the Sea Synge WBCHSE MCQ — WBCHSE Class 12 তৃতীয় সিমেস্টার, দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সিমেস্টার সিলেবাসের সবকটা প্রশ্নের উত্তরসহ সম্পূর্ণ সংকলন। Riders to the Sea Synge WBCHSE MCQ দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সিমেস্টার সম্পূর্ণ MCQ প্রশ্ন-উত্তর J.M. Synge-এর একাঙ্ক নাটক Riders to the Sea WBCHSE দ্বাদশ শ্রেণির (তৃতীয় সিমেস্টার) ইংরেজি সিলেবাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ নাটক। …

    Read more

Leave a Comment