আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি প্রশ্ন উত্তর

কবি-পরিচিতি

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের জন্ম ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের চাঁদপুরে (বর্তমানে বাংলাদেশ)। তাঁর আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ; পৈতৃক ভিটে ছিল বরিশাল জেলার বানারিপাড়া গ্রামে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেন।

সাহিত্যসাধনার পাশাপাশি সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা তাঁর সমগ্র জীবনজুড়ে প্রতিফলিত হয়েছে। যে-কোনো অন্যায়, অবিচার ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে তাঁর কলম বরাবর সোচ্চার থেকেছে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দিনগুলি রাতগুলি’। উল্লেখযোগ্য অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘নিহিত পাতাল ছায়া’, ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়’, ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ এবং ‘জলই পাষাণ হয়ে আছে’।

ছোটোদের জন্যও তিনি লিখেছেন ‘সকালবেলার আলো’, ‘সুপুরিবনের সারি’-র মতো রচনা; ‘কুন্তক’ ছদ্মনামে লিখেছেন ‘শব্দ নিয়ে খেলা’ ও ‘কথা নিয়ে খেলা’। প্রবন্ধ-সাহিত্যেও রবীন্দ্র-গবেষক হিসেবে তাঁর অবদান অসামান্য — ‘কালের মাত্রা ও রবীন্দ্র নাটক’, ‘ছন্দোময় জীবন’, ‘এই শহরের রাখাল’ প্রভৃতি এর প্রমাণ।

সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৭৭), রবীন্দ্র পুরস্কার, সরস্বতী সম্মান, পদ্মভূষণ এবং সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (২০১৬) — বহু সম্মানে তিনি ভূষিত হয়েছেন। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ উপাধিতে সম্মানিত করে। ২০২১ খ্রিস্টাব্দের ২১ এপ্রিল করোনা আক্রান্ত হয়ে এই মহান কবির জীবনাবসান ঘটে।


আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি প্রশ্ন উত্তর, রচনার উৎস ও পটভূমি

আমাদের ডান পাশে ধস বেঁধে বেঁধে থাকি কবিতা
আমাদের ডান পাশে ধস বেঁধে বেঁধে থাকি কবিতা

‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটি শঙ্খ ঘোষের ‘জলই পাষাণ হয়ে আছে’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ৩১তম কবিতা। কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে, আর কবিতাটির রচনাকাল সম্ভবত ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ।

এই কবিতার পটভূমিতে রয়েছে একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নের অস্থির, রক্তাক্ত পৃথিবী। বিশ শতকের শেষ দশক থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের তেল-সম্পদকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। ইরাক, আফগানিস্তান ও প্যালেস্তাইনের মতো দেশ যুদ্ধবিধ্বস্ত হয়ে পড়ে; একই সঙ্গে তালিবানসহ নানা জঙ্গিগোষ্ঠীর আক্রমণ, বিভিন্ন দেশে গৃহযুদ্ধ আর সন্ত্রাসে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রতিনিয়ত বিপন্ন হয়ে ওঠে।

ক্ষমতালোভী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মান্ধতার এই ভয়াবহ পরিবেশে দাঁড়িয়ে বিশ্বনাগরিক কবি শঙ্খ ঘোষ রচনা করেন এই প্রতিবাদী অথচ আশাবাদী কবিতাটি। এখানে একদিকে যুদ্ধবিরোধী কবির তীব্র প্রতিবাদ, অন্যদিকে বিপন্ন মানুষের প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধ একসূত্রে গাঁথা হয়েছে।


পাঠ-সারসংক্ষেপ: আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি প্রশ্ন উত্তর

আমাদের শিশুদের শব কবিতার মূলভাব
আমাদের শিশুদের শব কবিতার মূলভাব

চতুর্দিকে বিপদ, মানুষ আজ দিশাহারা

কবিতার সূচনাতেই শঙ্খ ঘোষ সমকালীন পৃথিবীর ভয়ংকর সংকটের ছবি এঁকেছেন। মানুষের ডান পাশে ধস, বাঁ পাশে গিরিখাদ, মাথার ওপর বোমারু বিমান আর পায়ে পায়ে হিমানীর বাঁধ — অর্থাৎ ডান-বাম-উপর-নীচ, চতুর্দিকেই বিপদ ও অনিশ্চয়তা। কোথাও নিরাপদ আশ্রয় নেই, এগিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই।

যুদ্ধ, দাঙ্গা আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় মানুষের ঘরবাড়ি উড়ে গেছে, সে আজ গৃহহীন ও দিশাহীন। কবি এই পঙ্‌ক্তিগুলির মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ও হানাদার শক্তির আগ্রাসনে বিপন্ন সাধারণ মানুষের অসহায় অবস্থা তুলে ধরেছেন।

ইতিহাসহীন, উপেক্ষিত সাধারণ মানুষ

কবি বলেছেন, শত শত সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, যুদ্ধবিগ্রহ আর রাজা-মহারাজাদের কাহিনি ইতিহাসে লেখা থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কথা সেখানে ঠাঁই পায় না। ইতিহাস কেবল অসাধারণ, ক্ষমতাবানদের কথা বলে; খেটে-খাওয়া শ্রমিক-কৃষকের কোনো ইতিহাস থাকে না।

তাদের চোখমুখ যেন ঢাকা — প্রকৃত সত্য জেনেও তারা যেন অন্ধ ও বোবা। এই নীচুতলার মানুষেরাই সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি, অথচ তারা ‘ভিখারি বারোমাস’ — যুগে যুগে বঞ্চিত, উপেক্ষিত ও নির্যাতিত। প্রাপ্য অধিকার বা শ্রমের মূল্য তারা কোনোদিন পায় না, তাই দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানোই তাদের নিয়তি।

শিশুদের মৃত্যু — মানবতার মৃত্যু

কবি এক মর্মন্তুদ চিত্র তুলে ধরেছেন — কাছে-দূরে ছড়িয়ে আছে শিশুদের মৃতদেহ। যুদ্ধ, দাঙ্গা ও সন্ত্রাসে ভরা এই দুনিয়ার হিংস্রতা থেকে নিষ্পাপ শিশুরাও রেহাই পায় না। শিশুরা যে-কোনো দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ, তাদের স্বপ্ন। তাই শিশুর মৃত্যু মানে সুন্দরের মৃত্যু, মনুষ্যত্বের মৃত্যু, সমগ্র মানবতার মৃত্যু।

এই ভয়াবহতার মুখে দাঁড়িয়ে কবির মনে প্রশ্ন জাগে — এভাবে চললে আমরাও কি এ-মুহূর্তে মরে যাব না কি? তবু এই মৃত্যুচেতনার মধ্যেই তিনি জীবনের দিকে ফিরে দাঁড়ানোর ডাক দেন।

সংঘবদ্ধতাই একমাত্র শক্তি

কবিতার শেষাংশে শঙ্খ ঘোষ নৈরাশ্যের অন্ধকার থেকে আশার আলোয় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি বলেছেন — ‘কিছুই কোথাও যদি নেই / তবু তো কজন আছি বাকি / আয় আরো হাতে হাত রেখে / আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।’

অর্থাৎ, সব হারিয়ে গেলেও যে কজন মানুষ এখনও বেঁচে আছে, তারা যদি পরস্পরের হাতে হাত রেখে সংঘবদ্ধ হয়, তবেই প্রতিকূল পরিবেশকে অতিক্রম করা সম্ভব। কারণ সংঘবদ্ধতাই শক্তি; ঐক্য ছাড়া বিপন্ন মানুষের আর কোনো বল নেই, কোনো পথ নেই। এই অক্ষয় সঞ্জীবন-মন্ত্রই কবিতাটিকে একটি চিরকালীন যুদ্ধবিরোধী ও মানবতাবাদী রচনায় পরিণত করেছে।


বিশেষ শব্দার্থ গুলো: আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি প্রশ্ন উত্তর

শব্দঅর্থ
গিরিখাদপর্বতের মধ্যবর্তী সরু, বিপজ্জনক, গভীর নীচু জায়গা; যা কখনও পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়
ধসভূমি বা পাহাড় ধসে পড়া
বোমারুবোমা ফেলে যে যুদ্ধবিমান
হিমানীবরফ, তুষার
শবমৃতদেহ
বারোমাসসারা বছর, সবসময়
দোরে দোরেদ্বারে দ্বারে, ঘরে ঘরে


প্রশ্নোত্তর: ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’

আমাদের ইতিহাস নেই শঙ্খ ঘোষ ব্যাখ্যা
আমাদের ইতিহাস নেই শঙ্খ ঘোষ ব্যাখ্যা

ক · অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান: ১)

১. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটি শঙ্খ ঘোষের কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত? উত্তর: কবিতাটি শঙ্খ ঘোষের ‘জলই পাষাণ হয়ে আছে’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।

২. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ — কবিতাটি ওই কাব্যগ্রন্থের কত সংখ্যক কবিতা? উত্তর: কবিতাটি ‘জলই পাষাণ হয়ে আছে’ কাব্যগ্রন্থের ৩১তম কবিতা।

৩. ‘আমাদের’ বলতে কবি কাদের বুঝিয়েছেন? উত্তর: ‘আমাদের’ বলতে কবি দেশ-কাল নির্বিশেষে পৃথিবীর সমস্ত শোষিত, বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত সাধারণ মানুষকে বুঝিয়েছেন।

৪. ‘গিরিখাদ’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ কী? উত্তর: ‘গিরিখাদ’ হল দুই পর্বতের মাঝে সৃষ্ট গভীর ও সরু খাদ।

৫. ‘বোমারু’ শব্দের অর্থ কী? উত্তর: ‘বোমারু’ হল সেই যুদ্ধবিমান, যা আকাশ থেকে বোমা ফেলে।

৬. ‘হিমানী’ শব্দের অর্থ কী? উত্তর: ‘হিমানী’ শব্দের অর্থ বরফ বা তুষার।

৭. ‘আমাদের ঘর গেছে উড়ে’ — কথাটি কেন বলা হয়েছে? উত্তর: বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, দাঙ্গা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বহু মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে — সেই গৃহহীনতা বোঝাতেই কবি এ কথা বলেছেন।

৮. ‘আমাদের পথ নেই কোনো’ বলার কারণ কী? উত্তর: বর্তমান পৃথিবীতে মানুষ চরম অসহায় ও নিরুপায়; চলার পথের সর্বত্র প্রতিকূলতা আর দিশাহীনতা — এই অবস্থা বোঝাতেই কবি এমন মন্তব্য করেছেন।

৯. ‘আমাদের চোখমুখ ঢাকা’ — এর কারণ কী? উত্তর: ইতিহাস সবসময় ক্ষমতাবানের কথা বলে; দুর্বল সাধারণ মানুষ প্রকৃত সত্য জেনেও যেন অন্ধ ও বোবা হয়ে থাকতে বাধ্য হয় — তাই তাদের চোখমুখ ঢাকা।

১০. ‘আমরা ভিখারি বারোমাস’ — এ কথা বলার কারণ কী? উত্তর: সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শোষণে নিপীড়িত সাধারণ মানুষ চিরকাল বঞ্চিত ও অধিকারহীন; আশ্রয় ও জীবিকা হারিয়ে তারা যেন চিরকালীন ভিখারিতে পরিণত হয়েছে, তাই এ কথা বলা হয়েছে।

১১. ‘আমাদের শিশুদের শব’ — ‘শব’ বলতে কী বোঝায়? উত্তর: ‘শব’ বলতে মৃতদেহ বোঝায়; এখানে যুদ্ধ ও সন্ত্রাসে নিহত শিশুদের মৃতদেহকে বোঝানো হয়েছে।

১২. ‘পৃথিবী হয়তো গেছে মরে’ — এমন বলার কারণ কী? উত্তর: শাসকের ষড়যন্ত্র, সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবক্ষয়ে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অর্থই হারিয়ে গেছে; মানবতার এই চরম দুর্দিনের দিশাহীন অর্থহীনতা প্রকাশ করতেই কবি এমন বলেছেন।

১৩. ‘আয় আরো হাতে হাত রেখে’ — এই পঙ্‌ক্তির অর্থ কী? উত্তর: ধ্বংসের মধ্যেও কবি মানবিক ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে পরস্পরের হাতে হাত রেখে সংঘবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

১৪. শঙ্খ ঘোষের আসল নাম কী? উত্তর: শঙ্খ ঘোষের আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ।

১৫. শঙ্খ ঘোষ কোন সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন? উত্তর: শঙ্খ ঘোষ ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন।

১৬. শঙ্খ ঘোষের প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম কী? উত্তর: শঙ্খ ঘোষের প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘দিনগুলি রাতগুলি’।

১৭. কবিতায় মানুষের চারদিকে কী কী বিপদের কথা বলা হয়েছে? উত্তর: মানুষের ডান পাশে ধস, বাঁ পাশে গিরিখাদ, মাথার ওপর বোমারু বিমান এবং পায়ে হিমানীর বাঁধ — এই চতুর্মুখী বিপদের কথা বলা হয়েছে।

১৮. কবিতাটি সম্ভবত কোন সময়ে রচিত? উত্তর: কবিতাটি সম্ভবত ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ রচিত।


খ · সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান: ৩)

১. ‘আমরা ভিখারি বারোমাস’ — ‘আমরা’ বলতে কাদের কথা বলা হয়েছে? তারা নিজেদের ভিখারি বলেছে কেন?

উত্তর: শঙ্খ ঘোষের ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় ‘আমরা’ বলতে দেশ-কাল নির্বিশেষে পৃথিবীর সমস্ত শোষিত, বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত সাধারণ মানুষের কথা বলা হয়েছে — দুঃখ-দারিদ্র্য, মারি-মড়ক আর যুদ্ধ-বিগ্রহে যাদের জীবন প্রতিনিয়ত বিপন্ন।

তারা নিজেদের ভিখারি বলেছে, কারণ অর্থ, ক্ষমতা বা প্রতিপত্তি কোনোকিছুই তাদের নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে এই নীচুতলার খেটে-খাওয়া মানুষেরাই সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি, অথচ যুগে যুগে তারা বঞ্চিত, অবহেলিত ও নির্যাতিত থেকে গেছে। শ্রমের প্রকৃত মূল্য বা ন্যায্য অধিকার তারা কখনোই পায় না।

মূলত পৃথিবীর ইতিহাসই তাদের প্রতি বঞ্চনার ইতিহাস; এই কারণেই তাদের ভিখারি-দশা কোনোদিন ঘোচে না। সারা বছর, সবসময় দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানোই যেন তাদের নিয়তি — তাই কবি তাদের ‘বারোমাস’ ভিখারি বলে অভিহিত করেছেন।


২. ‘আমাদের ইতিহাস নেই / অথবা এমনই ইতিহাস’ — উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় শঙ্খ ঘোষ ‘আমাদের’ বলতে পৃথিবীর সমস্ত শোষিত, বঞ্চিত ও সাধারণ মানুষকে বুঝিয়েছেন। এই প্রসঙ্গেই তিনি বলেছেন, এই মানুষদের কোনো ইতিহাস নেই।

এর তাৎপর্য গভীর। পৃথিবীর ইতিহাস মূলত শত শত সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, যুদ্ধবিগ্রহ আর রাজা-মহারাজাদের কীর্তিকাহিনিতে ভরা। ইতিহাস সবসময় অসাধারণ, ক্ষমতাবান মানুষের কথা বলে; খেটে-খাওয়া শ্রমিক-কৃষকের মতো সাধারণ মানুষের কথা সেখানে কোনোদিন ঠাঁই পায় না।

তাই কবি বলেছেন, হয় এই মানুষদের কোনো ইতিহাস নেই, অথবা এই ইতিহাসহীনতাই তাদের প্রকৃত ইতিহাস। অর্থাৎ, ইতিহাসের পাতায় চিরকাল উপেক্ষিত ও অনুল্লেখিত থেকে যাওয়াটাই এই বঞ্চিত মানুষগুলির নিয়তি। এই মর্মন্তুদ সত্যের মধ্য দিয়ে কবি সমাজের নীচুতলার মানুষের প্রতি তাঁর গভীর সহমর্মিতা ও তীব্র সমাজচেতনার পরিচয় দিয়েছেন।


৩. ‘আমাদের শিশুদের শব / ছড়ানো রয়েছে কাছে দূরে।’ — এ কথা বলার অর্থ কী?

উত্তর: শঙ্খ ঘোষের ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতা থেকে গৃহীত এই পঙ্‌ক্তিতে কবি সমকালীন পৃথিবীর এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।

যুদ্ধ, দাঙ্গা ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসে জর্জরিত আজকের দুনিয়ার হিংস্রতার হাত থেকে নিষ্পাপ শিশুরাও রেহাই পায় না। কাছে-দূরে সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা শিশুদের মৃতদেহ সেই ভয়াবহতারই সাক্ষ্য বহন করে।

এই উক্তির অর্থ আরও গভীর। কোনো দেশের শিশুরা সেই দেশ ও জাতি তথা সমগ্র বিশ্বের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। তাই শিশুর মৃত্যু কেবল একটি প্রাণের মৃত্যু নয় — তা সুন্দরের মৃত্যু, মনুষ্যত্বের মৃত্যু, সামগ্রিক মানবতার মৃত্যু। সভ্যতার এই অমানবিক অবক্ষয় ও ভবিষ্যৎ-বিনাশের ভয়াবহতাকে নির্দেশ করতেই কবি এই মর্মস্পর্শী উক্তিটি ব্যবহার করেছেন।


৪. ‘আমাদের পথ নেই আর’ — ‘আমাদের’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে? তাদের পথ নেই কেন?

উত্তর: ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় শঙ্খ ঘোষ ‘আমাদের’ বলতে দেশ-কাল নির্বিশেষে পৃথিবীর সমস্ত শোষিত, বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত মানুষের কথা বুঝিয়েছেন — দুঃখ-দারিদ্র্য, মারি-মড়ক আর যুদ্ধ-বিগ্রহে যাদের জীবন প্রতিনিয়ত বিপন্ন।

তাদের পথ নেই, কারণ অর্থ বা ক্ষমতা কোনোকিছুই তাদের নেই, তাদের পক্ষে দাঁড়ানোর মতোও কেউ নেই। প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার সামনে তারা যেমন অসহায়, তেমনই সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন কিংবা শাসকের অবদমনের কাছেও তারা সম্পূর্ণ নিরুপায়। চতুর্দিকে বিপদ ও প্রতিকূলতায় ঘেরা এই মানুষগুলির এগিয়ে যাওয়ার কোনো নিরাপদ পথই খোলা নেই — এই দিশাহীনতা বোঝাতেই বলা হয়েছে তাদের কোনো পথ নেই।


৫. ‘আয় আরো হাতে হাত রেখে / আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।’ — এই আহ্বানের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: শঙ্খ ঘোষের ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতার শেষ পঙ্‌ক্তিতে ধ্বনিত এই আহ্বান সমগ্র কবিতার মূল সুর ও সঞ্জীবন-মন্ত্র।

সমকালীন পৃথিবী যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও অস্থিরতায় বিপর্যস্ত; চতুর্দিকে ধ্বংস, মৃত্যু আর নৈরাশ্য। এমন ঘোর দুর্দিনে দাঁড়িয়েও কবি হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি বলেছেন, সব হারিয়ে গেলেও যে কজন মানুষ এখনও বেঁচে আছে, তারাই যেন পরস্পরের হাতে হাত রেখে সংঘবদ্ধ হয়।

এই আহ্বানের তাৎপর্য হল — সংঘবদ্ধতাই শক্তি। বিপন্ন, অসহায় মানুষের ঐক্যই একমাত্র বল, যার জোরে সমস্ত প্রতিকূলতা ও অন্ধকারকে অতিক্রম করা সম্ভব। মৃত্যু নয়, জীবনের দিকে ফিরে দাঁড়ানোর এই মন্ত্রই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অমানবিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো প্রতিরোধ। এভাবেই কবি তাঁর যুদ্ধবিরোধী মনোভাব, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও গভীর সমাজচেতনার এক অক্ষয় প্রকাশ ঘটিয়েছেন।


গ · ব্যাখ্যাধর্মী / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান: ৫)

আয় আরো হাতে হাত রেখে সংঘবদ্ধতা
আয় আরো হাতে হাত রেখে সংঘবদ্ধতা

১. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতার মূল বক্তব্য সংক্ষেপে লেখো। (৫)

উত্তর: সাহিত্যকে বলা হয় সমাজের দর্পণ, আর সেই সাহিত্যই কালজয়ী হয়ে ওঠে যেখানে স্রষ্টা তাঁর দেশ-কালের সংকটকে অতিক্রম করে চিরন্তন সত্যকে স্পর্শ করেন। শঙ্খ ঘোষের ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটি তেমনই এক কালজয়ী রচনা।

এই কবিতার মূল বক্তব্য গড়ে উঠেছে সমকালীন বিশ্বের সংকট ও তার প্রতিকারের ইঙ্গিতকে কেন্দ্র করে। কবি দেখিয়েছেন, বিশ শতকের শেষ দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল-সম্পদকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইরাক, আফগানিস্তান, প্যালেস্তাইনের যুদ্ধ, দিকে দিকে জঙ্গিহানা আর সন্ত্রাসের মধ্যে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা বিপন্ন। মানুষের ডান-বাম-উপর-নীচ, চতুর্দিকেই বিপদ; তাদের ঘর উড়ে গেছে, পথ হারিয়ে গেছে।

কবি সেই সব মানুষের কথা ভেবেছেন, ইতিহাস যাদের নাম জানে না — যারা মাঠে-কলকারখানায় খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষ। ক্ষমতাবান রাষ্ট্রনেতা বা উগ্রবাদী জঙ্গিদের যুদ্ধের খেলার মধ্যে পড়ে তাদের কতজন বাঁচে-মরে, তার খবর কেউ রাখে না। এমনকি নিষ্পাপ শিশুরাও এই হিংস্রতা থেকে রেহাই পায় না — কাছে-দূরে ছড়িয়ে থাকে তাদের মৃতদেহ।

তবু এই চরম নৈরাশ্যের মধ্যেও কবি জীবনের জয়গান গেয়েছেন। তিনি আহ্বান জানিয়েছেন — ‘কিছুই কোথাও যদি নেই / তবু তো কজন আছি বাকি / আয় আরো হাতে হাত রেখে / আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।’ অর্থাৎ, সংঘবদ্ধতাই বিপন্ন মানুষের একমাত্র শক্তি; ঐক্যের বলেই যাবতীয় প্রতিকূলতা অতিক্রম করা সম্ভব। এই যুদ্ধবিরোধী মানবিক আহ্বানই কবিতার মূল বক্তব্য।


২. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় কবির সমাজচেতনার যে পরিচয় পাওয়া যায় তা নিজের ভাষায় লেখো। (৫)

(অথবা — কবিতাটিতে যুগযন্ত্রণার যে ভাষ্য উঠে এসেছে তা নিজের ভাষায় লেখো।)

উত্তর: ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত শঙ্খ ঘোষের ‘জলই পাষাণ হয়ে আছে’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটি কবির প্রগাঢ় সমাজচেতনা ও সময়চেতনার এক উজ্জ্বল দলিল।

এখানে একদিকে যেমন উঠে এসেছে সমকালীন বিশ্বব্যাপী অশান্তির অসুস্থ পরিবেশ, তেমনই তা হয়ে উঠেছে সর্বকালের যুদ্ধ ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে এক চিরন্তন প্রতিবাদ। বিশ শতকের শেষ দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল-সম্পদকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইরাক, আফগানিস্তান, প্যালেস্তাইনের মতো দেশে যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর আক্রমণে প্রতিনিয়ত বিপন্ন হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা। একশ্রেণির ক্ষমতাশালী মানুষের যুদ্ধবাজ মনোভাবের মধ্যে পড়ে সাধারণ মানুষের এই দুরবস্থার ছবিই কবিতার ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে।

কবির সমাজচেতনার গভীরতা প্রকাশ পেয়েছে সেই মানুষদের প্রতি তাঁর মমত্বে, ইতিহাস যাদের কথা মনে রাখে না। তিনি দেখিয়েছেন, খেটে-খাওয়া দরিদ্র মানুষরাই সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি, অথচ তারা ‘ভিখারি বারোমাস’ — চিরবঞ্চিত, উপেক্ষিত। যাদের ডানে-বাঁয়ে-উপরে-নীচে কোথাও শান্তির আশ্রয় নেই, যাদের জীবন-মৃত্যুর খবর কোনো ইতিহাস রাখে না — তাদের উদ্দেশেই কবির এই সহানুভূতিশীল উচ্চারণ।

তবে কবির সমাজচেতনা কেবল হতাশা বা প্রতিবাদে থেমে থাকেনি। নৈরাশ্য, শূন্যতা ও অসহায়তার মধ্যেও তিনি সংঘবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন — ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’। মৃত্যু নয়, জীবনের দিকে ঘুরে দাঁড়ানোর এই ইতিবাচক বার্তাই কবির সমাজচেতনাকে এক অক্ষয় সঞ্জীবন-মন্ত্রে পরিণত করেছে।


৩. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় কবি কেন বেঁধে বেঁধে থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন তা নিজের ভাষায় লেখো। (৫)

উত্তর: শঙ্খ ঘোষের ‘জলই পাষাণ হয়ে আছে’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটিতে বিশ শতকের শেষ দশক থেকে শুরু হওয়া পৃথিবীব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তার মধ্যে পড়ে সাধারণ মানুষের বিপন্নতার কথা উঠে এসেছে।

কবি তাঁর অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, সমসাময়িক কালে কীভাবে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও জঙ্গিহানায় গোটা পৃথিবী অস্থির হয়ে উঠেছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল-সম্পদকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতির টানাপোড়েন, ইরাক-আফগানিস্তান-প্যালেস্তাইনের যুদ্ধ, অন্যদিকে বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গিহানা — এই সবের মধ্যে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা বিপন্ন।

খেতে-খামারে কাজ করা এই দরিদ্র মানুষরাই সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি, অথচ তারা ‘ভিখারি বারোমাস’। কোনো দেশের কোনো ইতিহাস তাদের কথা মনে রাখেনি, রাখে না। তাদের ডান-বাম-উপর-নীচ, অর্থাৎ চতুর্দিকেই বিপদ আর অনিশ্চয়তা।

এই অসহায় অবস্থাতেই কবি সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। তিনি বলেছেন — ‘কিছুই কোথাও যদি নেই / তবু তো কজন আছি বাকি / আয় আরো হাতে হাত রেখে / আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।’ কারণ কবির বিশ্বাস, এখনও সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি, এখনও সময় আছে সংঘবদ্ধ হওয়ার। এই সংঘবদ্ধতার শক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের আর কোনো বল নেই, কোনো পথ নেই।

সংঘবদ্ধতাই যে চরম প্রতিকূলতা অতিক্রমের একমাত্র উপায় — এই দৃঢ় প্রত্যয় থেকেই কবি বারবার হাতে হাত রেখে, জোট বেঁধে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। যুদ্ধবিরোধী মনোভাব, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা আর গভীর সমাজচেতনায় এই আহ্বান কবিতাটিকে অনন্যসাধারণ করে তুলেছে।


৪. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় প্রতিফলিত যুদ্ধবিরোধী চেতনা ও মানবতাবোধের পরিচয় দাও। (৫)

উত্তর: শঙ্খ ঘোষের ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতাটি একটি শক্তিশালী যুদ্ধবিরোধী ও মানবতাবাদী রচনা, যেখানে কবির অন্তরের গভীর মানবিক বেদনা ও প্রতিবাদ একসূত্রে মিশে গেছে।

যুদ্ধবিরোধী চেতনা: কবিতাটির পটভূমিতে রয়েছে একবিংশ শতকের সূচনালগ্নের রক্তাক্ত পৃথিবী। মধ্যপ্রাচ্যের তেল-সম্পদকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, ইরাক-আফগানিস্তান-প্যালেস্তাইনের যুদ্ধ, তালিবানসহ নানা জঙ্গিগোষ্ঠীর সন্ত্রাস — এই সবের ভয়াবহতাকে কবি তীব্রভাবে তুলে ধরেছেন।

মানুষের মাথার ওপর বোমারু বিমান, চতুর্দিকে ধ্বংস আর মৃত্যু — এই চিত্রের মাধ্যমে কবি ক্ষমতালোভী যুদ্ধবাজ শক্তির অমানবিকতার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিশেষত নিষ্পাপ শিশুদের মৃতদেহের মর্মন্তুদ চিত্র যুদ্ধের নিষ্ঠুরতাকে সবচেয়ে তীক্ষ্ণভাবে উন্মোচিত করেছে।

মানবতাবোধ: কবির যুদ্ধবিরোধিতা কেবল ধ্বংসের বর্ণনায় সীমাবদ্ধ নয়; তার মূলে রয়েছে গভীর মানবপ্রেম। তিনি সেই সাধারণ, বঞ্চিত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, ইতিহাস যাদের কথা মনে রাখে না। তাদের দুঃখ-দুর্দশাকে তিনি নিজের বলে অনুভব করেছেন।

আর এই মানবতাবোধের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ কবিতার শেষে — যেখানে তিনি হতাশার অন্ধকারে না ডুবে সমস্ত বিপন্ন মানুষকে হাতে হাত রেখে সংঘবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মৃত্যুর মুখেও জীবনের প্রতি এই অটুট আস্থা ও ঐক্যের বার্তাই কবির মানবতাবোধকে চিরন্তন মহিমা দিয়েছে।

এভাবেই যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ ও মানবতার জয়গান — এই দুইয়ের সম্মিলনে কবিতাটি হয়ে উঠেছে এক কালজয়ী আবেদনময় সৃষ্টি।


৫. ‘আমাদের ডান পাশে ধস / আমাদের বাঁয়ে গিরিখাদ’ — এই অংশে সাধারণ মানুষের যে বিপন্নতার ছবি ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো। (৫)

উত্তর: শঙ্খ ঘোষের ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতার সূচনায় এই পঙ্‌ক্তিগুলির মধ্য দিয়ে সমকালীন বিশ্বের সাধারণ মানুষের চরম বিপন্নতা ও অসহায়তার এক তীব্র চিত্র ফুটে উঠেছে।

কবি প্রতীকের আশ্রয়ে মানুষের চারপাশের বিপদকে মূর্ত করে তুলেছেন। ডান পাশে ধস, বাঁ পাশে গিরিখাদ, মাথার ওপর বোমারু বিমান আর পায়ে পায়ে হিমানীর বাঁধ — অর্থাৎ ডান-বাম-উপর-নীচ, চতুর্দিকেই অপেক্ষা করছে মৃত্যু ও ধ্বংস। কোনো দিকেই নিরাপত্তা নেই, নেই এগিয়ে যাওয়ার কোনো পথ।

এই ভৌগোলিক প্রতিকূলতার রূপকল্প আসলে যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত মানুষের জীবনের বাস্তব বিপন্নতাকেই প্রকাশ করে।

এই বিপদের ফলেই মানুষের ঘর উড়ে গেছে, সে আজ গৃহহীন ও দিশাহীন। সাম্রাজ্যবাদী ও হানাদার শক্তির আগ্রাসনে সাধারণ মানুষ আশ্রয় ও জীবিকা হারিয়ে চরম সংকটে নিপতিত। তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ যেমন নেই, তেমনই ফিরে যাওয়ার আশ্রয়ও নেই।

মূলত এই অংশে কবি একটি বৃহত্তর সত্য তুলে ধরেছেন — ক্ষমতাবানদের যুদ্ধ ও স্বার্থের লড়াইয়ের মধ্যে পড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিরীহ সাধারণ মানুষ। তাদের এই অসহায় বিপন্নতাই কবিকে ব্যথিত করেছে এবং শেষপর্যন্ত সংঘবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাতে প্রেরণা জুগিয়েছে।


জ্ঞানচক্ষু প্রশ্ন উত্তর — আশাপূর্ণা দেবী

অসুখী একজন প্রশ্ন উত্তর — পাবলো নেরুদা (অনুবাদ: নবারুণ ভট্টাচার্য)

আফ্রিকা কবিতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর

  • আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি প্রশ্ন উত্তর
    কবি-পরিচিতি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের জন্ম ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের চাঁদপুরে (বর্তমানে বাংলাদেশ)। তাঁর আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ; পৈতৃক ভিটে ছিল বরিশাল জেলার বানারিপাড়া গ্রামে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেন। …

    Read more

  • আফ্রিকা কবিতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | দশম শ্রেণি প্রশ্ন উত্তর
    কবি-পরিচিতি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে, কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে। শৈশব থেকেই সাহিত্যের আবহে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি খুব অল্প বয়স থেকেই ‘ভারতী’ ও ‘বালক’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘হিন্দুমেলার উপহার’, আর প্রথম সার্থক ছোটোগল্প হিসেবে সাহিত্য-সমালোচকেরা ‘দেনাপাওনা’-কে চিহ্নিত করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অজস্র কবিতা, গান, ছোটোগল্প, …

    Read more

  • অসুখী একজন প্রশ্ন উত্তর — পাবলো নেরুদা (অনুবাদ: নবারুণ ভট্টাচার্য)
    কবি পরিচিতি পাবলো নেরুদা ছিলেন চিলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, প্রাবন্ধিক এবং একইসঙ্গে দক্ষ কূটনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদ। ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই তাঁর জন্ম। রাজনৈতিক জীবনে তিনি চিলির বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মানবতা, প্রেম, রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও যুদ্ধবিরোধী চেতনা তাঁর কবিতার মূল সুর। ১৯৫০ সালে আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার এবং ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার …

    Read more

  • জ্ঞানচক্ষু প্রশ্ন উত্তর — আশাপূর্ণা দেবী
    (দশম শ্রেণি, বাংলা — সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর) লেখক পরিচিতি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবীর জন্ম ১৯০৯ সালের ৮ জানুয়ারি, উত্তর কলকাতায়। সেকালের সামাজিক রীতি অনুযায়ী তাঁর প্রথাগত বিদ্যালয়-শিক্ষা লাভের সুযোগ ঘটেনি, বাড়িতেই তাঁর শিক্ষার সূচনা। অথচ এই সীমাবদ্ধতা তাঁকে দমিয়ে রাখেনি— নিজের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, জীবনবোধ আর মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে …

    Read more

  • টাইকো ব্রাহে: যে জ্যোতির্বিদ নাক হারিয়েও আকাশ দেখা থামাননি
    একটু ভাবুন। ১৫৬০ সাল। ডেনমার্কের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে চৌদ্দ বছর বয়সের একটা ছেলে আইন পড়তে বসে আছে। হঠাৎ বাইরে লোকজনের ভিড়। সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে। সূর্যগ্রহণ হচ্ছে। কিন্তু অবাক করা বিষয়টা সূর্যগ্রহণ নয়। অবাক করা বিষয়টা হলো — জ্যোতির্বিদরা আগে থেকেই বলে দিতে পেরেছিলেন ঠিক কখন এই গ্রহণ হবে। নিখুঁতভাবে। এই ছেলেটার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরতে …

    Read more

  • রজার বেকন: মধ্যযুগের অন্ধকারে যে সন্ন্যাসী জ্বালিয়েছিলেন বিজ্ঞানের আলো
    একটু ভাবুন। ত্রয়োদশ শতাব্দী। ইউরোপজুড়ে চার্চের অন্ধকার শাসন। বিজ্ঞানচর্চা মানেই ধর্মের বিরোধিতা। কেউ যদি বলে — “প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করব না” — তাকে পাগল বলা হবে, বিধর্মী বলা হবে। সেই যুগে একজন মানুষ সন্ন্যাসীর পোশাক পরে, হাতে কাচের লেন্স আর বই নিয়ে বললেন — “অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো কিছুই সঠিকভাবে জানা সম্ভব নয়।” এই একটা কথার …

    Read more

Leave a Comment