অপটোজেনেটিক্স কী? ২০২৬ সালের চিকিৎসায় নোবেলের গল্প

অপটোজেনেটিক্স কী ও কীভাবে কাজ করে? শৈবালের আলো-সংবেদী প্রোটিন থেকে ২০২৬ সালের চিকিৎসায় নোবেল, আর অন্ধত্বের চিকিৎসায় প্রথম প্রমাণের গল্প সহজ ভাষায়।

Table of Contents

অপটোজেনেটিক্স কী? পুকুরের শৈবাল থেকে ২০২৬ সালের চিকিৎসায় নোবেল

খালি চোখে প্রায় দেখাই যায় না, এমন একটা এককোষী সবুজ শৈবাল আলোর দিকে সাঁতরে যায়। সে পারে, কারণ তার কোষপর্দায় একটা প্রোটিন আছে। সেই প্রোটিনের জিন যদি ইঁদুরের মস্তিষ্কের একটা নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে নীল আলোর এক ঝলকেই সেই কোষ জেগে ওঠে। আলো নিভলে সে থামে।

৫ অক্টোবর ২০২৬, সোমবার, স্টকহোম থেকে ঘোষণা এল: এই আবিষ্কারের জন্যই চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পাচ্ছেন কার্ল ডাইসেরথ, পিটার হেগেম্যান ও গেয়র্গ নাগেল। প্রযুক্তিটির নাম অপটোজেনেটিক্স। অপটোজেনেটিক্স কী, কীভাবে কাজ করে, আর পুকুরের একটা কৌতূহল কীভাবে অন্ধত্বের চিকিৎসা পর্যন্ত পৌঁছল, সেই গল্পই এই লেখায়।

অপটোজেনেটিক্স কী, সহজ ভাষায়

অপটোজেনেটিক্স কী, এক বাক্যে: অপটিক্স (আলো) আর জেনেটিক্স (জিনবিদ্যা) মিলিয়ে এমন একটি পদ্ধতি, যাতে জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের বেছে নেওয়া স্নায়ুকোষকে আলো ফেলে চালু বা বন্ধ করা যায়।

কাজটা তিন ধাপে হয়:

  1. আলো-সংবেদী একটি প্রোটিনের (বিজ্ঞানীরা বলেন অপসিন) জিন সংগ্রহ করা হয়।
  2. নিরীহ করে বানানো ভাইরাসের মতো বাহকে সেই জিন ভরে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠানো হয়। কৌশল এমন যে জিনটা শুধু বেছে নেওয়া ধরনের স্নায়ুকোষেই কাজ করে। ফলে শুধু ওই কোষগুলো আলো-সংবেদী হয়ে ওঠে।
  3. সরু অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে আলো ফেলা হয়। আলোর রঙ অনুযায়ী কোষ চালু হয় অথবা নিস্তব্ধ।

এর আগে স্নায়ুকোষ নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় ছিল ইলেকট্রোড আর ওষুধ। ইলেকট্রোড আশপাশের সব কোষকেই ছুঁয়ে ফেলে। ওষুধ ছড়ায় ধীরে, আর ইচ্ছেমতো এক মুহূর্তে থামানো যায় না। আলো সেখানে ঠিক যে কোষে জিন আছে শুধু তাকে নাড়ায়, আর ঠিক যে মুহূর্তে ফেলা হয় সে মুহূর্তেই।

প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষ আছে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার কোটি, প্রতিটি অসংখ্য সংযোগে বাঁধা। এই জট ছাড়াতে হলে এমন নির্দিষ্টতাই দরকার ছিল।

৫ অক্টোবরের ঘোষণা: কারা পেলেন, কেন

neurons-network-blue-lit-cluster
কল্পিত চিত্র: আলোয় চালু হওয়া একদল স্নায়ুকোষ

কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি পুরস্কারটি দিয়েছে "আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল ও অপটোজেনেটিক্স সংক্রান্ত আবিষ্কারের জন্য"। অঙ্কটা ১ কোটি ২০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা, প্রায় ১২ লক্ষ মার্কিন ডলার। তিনজন সমান ভাগে পাচ্ছেন।

বিজ্ঞানীবর্তমান কর্মস্থলমূল অবদান
কার্ল ডাইসেরথস্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও হাওয়ার্ড হিউজেস মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটআলো-নিয়ন্ত্রিত প্রোটিনকে স্তন্যপায়ীর স্নায়ুকোষে কাজ করানো, পরে জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কে প্রয়োগ
পিটার হেগেম্যানহামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বার্লিনশৈবালের আলো-সংবেদী ব্যবস্থা বিশ্লেষণ, চ্যানেলরোডপসিন শনাক্তকরণ
গেয়র্গ নাগেলভুর্জবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানিচ্যানেলরোডপসিন যে সত্যিই আলোয় খোলা আয়ন চ্যানেল, তা বৈদ্যুতিকভাবে প্রমাণ

নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান পের সভেনিংসন বলেছেন, মস্তিষ্কের মানচিত্র আঁকার যে সুযোগ আমরা একসময় শুধু স্বপ্নেই দেখতে পারতাম, অপটোজেনেটিক্স তা এনে দিয়েছে। (উক্তিটি ইংরেজি থেকে বাংলা করা।) ডাইসেরথের নিজের ভাষ্য: আলো এখানে তথ্য সংগ্রহের কাজে লাগছে না, লাগছে কিছু ঘটানোর কাজে।

অপটোজেনেটিক্স কী |পুকুরের শৈবাল কীভাবে পথ দেখাল

green-algae-village-pond-morning
কল্পিত চিত্র: এককোষী শৈবালের বাসস্থানের একটি পরিচিত দৃশ্য

গল্পের শুরু কোনো স্নায়ুবিজ্ঞানের ল্যাবে নয়। ক্ল্যামাইডোমোনাস নামের এককোষী শৈবাল আলোর দিকে সাঁতরায়, কারণ সালোকসংশ্লেষের জন্য তার আলো দরকার। আলো খুঁজে পেতে সে ব্যবহার করে কোষের গায়ের একটি ক্ষুদ্র চক্ষুবিন্দু। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ায় পিটার হেগেম্যান জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটে জানতে চাইলেন, এই শৈবাল আলো টের পায় কীভাবে।

আলো পড়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কোষে বৈদ্যুতিক সাড়া তৈরি হয়। এত দ্রুত সাড়ার পেছনে থাকা বহু ধাপের জটিল সংকেত-শৃঙ্খল, এমন ধারণা তখন স্বাভাবিক ছিল। হেগেম্যানের সন্দেহ ছিল অন্যরকম: একটাই প্রোটিন হয়তো আলো ধরে এবং কোষে বিদ্যুৎ ঢোকার পথও খুলে দেয়।

সেই সন্দেহ প্রমাণ করতে তাঁর সঙ্গে এলেন ফ্রাঙ্কফুর্টের গেয়র্গ নাগেল, বৈদ্যুতিক মাপজোকে যাঁর দক্ষতা। পরপর দুই বছরে প্রকাশিত দুটি গবেষণাপত্রে ছবিটা পরিষ্কার হল:

  • ২০০২ সালে Science জার্নালে চ্যানেলরোডপসিন-১ (ChR1) নিয়ে লেখা: এটি আলোয় খোলা একটি প্রোটন-চ্যানেল।
  • ২০০৩ সালে PNAS জার্নালে চ্যানেলরোডপসিন-২ (ChR2): এটি আলোয় সরাসরি খুলে যাওয়া, ধনাত্মক আয়ন চলাচলের উপযোগী চ্যানেল।

ChR2 অন্য প্রাণীর কোষে বসালেও কাজ করে। নাগেলরা পরীক্ষা করেছিলেন ব্যাঙের ডিম্বাণু ও মানুষের কোষ-কালচারে। নীল আলো পড়লে প্রোটিনের ভেতরের রেটিনাল অণু (ভিটামিন এ-র সঙ্গে সম্পর্কিত, মানুষের চোখেও যার মতো অণু আলো ধরে) আকার বদলায়। সঙ্গে সঙ্গে প্রোটিনের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম ছিদ্র খোলে, আর ধনাত্মক আয়ন কোষে ঢোকে। স্নায়ুকোষের ভাষায় এই ঢোকার নামই উদ্দীপনা।

এই আবিষ্কারের আসল গুরুত্ব এখানেই: যে প্রোটিন একাই আলো ধরে আর দরজা খোলে, তার জিন যে কোনও কোষে বসিয়ে সেই কোষকে আলো-সংবেদী বানানো সম্ভব।

ডাইসেরথ: পেট্রি ডিশ থেকে জীবন্ত মস্তিষ্কে

কার্ল ডাইসেরথ মনোরোগ-চিকিৎসক এবং বায়োইঞ্জিনিয়ার। একটি বাংলা দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি স্নায়ু-শল্যচিকিৎসক হওয়ার পথে ছিলেন। মানসিক রোগের চিকিৎসাকেন্দ্রে কাজ করতে গিয়ে রোগীদের কষ্ট তাঁকে ব্যথিত করে, আর রোগের মূল খুঁজতে তিনি গবেষণার পথে পা বাড়ান। তাঁর দরকার ছিল মস্তিষ্কের একটা নির্দিষ্ট ধরনের কোষকে নির্দিষ্ট সময়ে চালু বা বন্ধ করার উপায়।

২০০৫ সালে Nature Neuroscience-এ বেরোল সেই কাজ, "Millisecond-timescale, genetically targeted optical control of neural activity"। লেখকদের তালিকায় ছিলেন এডওয়ার্ড বয়ডেন (তখন ডাইসেরথের গবেষণাগারের ছাত্র, প্রথম লেখক), ফেং ঝাং, আর্নস্ট বাম্বের্গ, গেয়র্গ নাগেল এবং ডাইসেরথ। ইঁদুরের কালচার করা স্নায়ুকোষে ChR2 ঢুকিয়ে নীল আলোর ঝলক ফেলা হল।

কোষগুলো আলোর তালে তাল মিলিয়ে সংকেত ছুড়তে লাগল, মিলিসেকেন্ডের নির্ভুলতায়। প্রায় দুই বছর পর একই পদ্ধতি কাজ করল জীবন্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে। ২০০৬ সাল নাগাদ এর নাম দাঁড়াল "অপটোজেনেটিক্স"।

আলো কীভাবে সুইচ হয়: চালু, বন্ধ, আর রঙের খেলা

channelrhodopsin-blue-light-ion-channel-illustration
কল্পিত চিত্র। আসল আণবিক গঠনের হুবহু প্রতিলিপি নয়

ChR2 কোষকে চালু করে। উল্টোটাও দরকার ছিল, কারণ কোনও কোষ থামলে কী হয় তা না দেখে তার কাজ বোঝা যায় না। প্রকৃতিতে মিলল আরও আলো-সংবেদী প্রোটিন, যাদের কেউ চালায়, কেউ থামায়:

প্রোটিনকীভাবে কাজ করেসাধারণত কোন আলোকোষের ফল
চ্যানেলরোডপসিন-২ধনাত্মক আয়ন ঢুকতে দেয়নীলসক্রিয়
হ্যালোরোডপসিনক্লোরাইড আয়ন ভেতরে পাম্প করেহলুদ-কমলানিস্তব্ধ
আর্কিয়ারোডপসিনপ্রোটন বাইরে পাম্প করেসবুজ-হলুদনিস্তব্ধ
ক্রিমসনআরচ্যানেলরোডপসিনের মতো, লালচে আলোয় সাড়া দেয়লালচে-কমলাসক্রিয়

পরে বিশ্বজুড়ে বহু গবেষণাগার এই প্রোটিনগুলোর গতি, সংবেদনশীলতা ও রঙ বদলে নতুন সংস্করণ বানিয়েছে। তাতে একই মস্তিষ্কে দুই ধরনের কোষকে দুই রঙের আলোয় আলাদাভাবে চালানোও সম্ভব হয়েছে।

মস্তিষ্কের কোন সুইচ কী করে

research-goggles-eye-clinic-bench
কল্পিত চিত্র। ট্রায়ালের আসল গগলসের ছবি নয়।

একটা কোষ চালু করলে কী ঘটে, সেটা দেখে বিজ্ঞানীরা প্রথমবার কার্যকারণ সম্পর্ক ধরতে পারলেন। ইইজি যেমন মস্তিষ্কের সাড়া শুধু শোনে, অপটোজেনেটিক্স তেমনি সুইচ টিপে ফল দেখায়। ইঁদুরের উপর এভাবে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলেছে:

  • স্মৃতি: ২০১২ সালে সুসুমু টোনেগাওয়ার গবেষণাগারের কাজে (ডাইসেরথ ছিলেন সহ-লেখকদের একজন) ভয়ের স্মৃতি বহনকারী কোষ ট্যাগ করা হয়। পরে সম্পূর্ণ আলাদা খাঁচায় সেই কোষেই আলো ফেলতেই ইঁদুর ভয়ে জমে যায়, যেন পুরোনো ভয়টা ফিরে এসেছে।
  • ঘুম ও জাগরণ: হাইপোথ্যালামাসের হাইপোক্রেটিন (অরেক্সিন) নামের স্নায়ুকোষ ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। আলো দিয়ে তাদের চালিয়ে ঘুমন্ত ইঁদুরকে জাগানো গেছে।
  • পার্কিনসন্স রোগের মডেল: রোগাক্রান্ত ইঁদুরের নির্দিষ্ট স্নায়ু-সার্কিটে আলো ফেলে চলাফেরার জড়তা কমানো গেছে। গভীর মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ দিয়ে উদ্দীপনার প্রচলিত পদ্ধতিতে (ডিবিএস) আশপাশের কোষও প্রভাবিত হয়। আলো-পদ্ধতিতে লক্ষ্য শুধু জিন-বসানো কোষ।
  • ব্যথা, তৃষ্ণা, আচরণ: কোন সার্কিট ব্যথা বা তৃষ্ণার অনুভূতি, মনোযোগ, সামাজিক আচরণ বা খুশির প্রতিক্রিয়া সামলায়, তা ঠিকঠাক চিনে ফেলা সম্ভব হয়েছে।

Read More: রজার বেকন: মধ্যযুগের অন্ধকারে যে সন্ন্যাসী জ্বালিয়েছিলেন বিজ্ঞানের আলো

কল্যাণী এইমসের বায়োকেমিস্ট্রির শিক্ষক-চিকিৎসক অতনুকুমার দত্ত একটি বাংলা দৈনিকের প্রতিবেদনে বলেছেন, "মস্তিষ্কে স্নায়ুর কার্যকারিতা বুঝতে অপ্টোজেনেটিক্সের গুরুত্ব রয়েছে। বিভিন্ন নিউরোসাইকিয়াট্রিক রোগের চিকিৎসায় তা সাফল্য দিতে পারে।" "পারে" শব্দটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে এই কাজের প্রায় সবটাই এখনও প্রাণীর উপর, মানুষের চিকিৎসায় নয়।

অন্ধত্বে প্রথম প্রমাণ: PIONEER ট্রায়াল

optical-fibre-blue-light-neuroscience-lab
কল্পিত চিত্র: মস্তিষ্কে আলো পৌঁছনোর একটি সরঞ্জাম

মানুষের চিকিৎসায় সবচেয়ে এগোনো ক্ষেত্র চোখ। রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা রোগে আলো-ধরা ফটোরিসেপ্টর কোষ ক্রমে নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু রেটিনার ভেতরের স্তরের গ্যাংলিয়ন কোষ বেঁচে থাকে। ধারণাটা হল, ওই বেঁচে থাকা কোষকেই আলো-সংবেদী বানিয়ে দেওয়া।

২০২১ সালের ২৪ মে Nature Medicine-এ প্রকাশিত হল তার প্রথম প্রকাশিত প্রমাণ, PIONEER ট্রায়ালের একটি ফল। জোসে-অ্যালেন সাহেল (পিটসবার্গ ও প্যারিস) ও বোটন্ড রোস্কার (বাসেল) গবেষক দল রোগীর রেটিনাল গ্যাংলিয়ন কোষে ক্রিমসনআরের জিন পৌঁছে দেয়। চিকিৎসাটা এমন:

Read More: টাইকো ব্রাহে: যে জ্যোতির্বিদ নাক হারিয়েও আকাশ দেখা থামাননি

  • রোগী ছিলেন ৫৮ বছরের একজন পুরুষ, একটি চোখে চিকিৎসা হয়।
  • নিরীহ ভাইরাস-বাহকে (GS030-DP) জিন চোখের ভেতরে ইনজেকশন দেওয়া হয়।
  • রোগীকে বিশেষ গগলস (GS030-MD) পরানো হয়। গগলস বাইরের দৃশ্যের আলোর পরিবর্তন ধরে সেই অনুযায়ী লালচে আলোর স্পন্দন রেটিনায় ফেলে।
  • ইনজেকশনের সাড়ে চার মাস পর প্রশিক্ষণ শুরু হয়। প্রায় সাত মাস পরে রোগী উন্নতি টের পান।

ফল: গগলস পরে রোগী বস্তু দেখতে পেতেন, কোথায় আছে বুঝতেন, গুনতে এবং ছুঁতে পারতেন। গগলস ছাড়া পারতেন না। ইইজিতে দেখা যায়, পরীক্ষার সময় তাঁর মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স সাড়া দিচ্ছিল। দৈনন্দিন চলাফেরায়, ঘরের আসবাব ও জিনিস চিনতেও সুবিধা হয়েছে বলে তিনি জানান।

একটি সতর্কতা থেকেই যায়: এটি একজন রোগীর একটি চোখের ফল, আর গবেষকেরা নিজেরাই বলেছেন, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও ফল লাগবে। দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে যায়নি। তবু প্রথম প্রমাণ হিসেবে এর মূল্য বড়। দুই দশকের বেশি অপটোজেনেটিক থেরাপির কাজের স্বীকৃতিতে সাহেল ও রোস্কা ২০২৬ সালে ১০ লক্ষ ইউরোর অ্যান্তোনিও চম্পালিমাউড ভিশন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন, ১৫ সেপ্টেম্বর লিসবনে।

আলো ভেতরে পৌঁছনোর সমস্যা

অপটোজেনেটিক্সের সীমাবদ্ধতাও পরিষ্কার। মস্তিষ্কের টিস্যু আলোকে ছড়িয়ে দেয় ও শুষে নেয়, তাই গভীরে আলো পৌঁছতে সাধারণত খুলিতে ছিদ্র করে অপটিক্যাল ফাইবার বসাতে হয়। জিন পৌঁছনোর জন্য ভাইরাস-বাহকও দরকার। মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার তথ্য এখনও কম।

এ কারণেই কিছু গবেষক দল আলোকে অস্ত্রোপচার ছাড়া ভেতরে পাঠানোর উপায় খুঁজছেন, যেমন ইনফ্রারেড আলোকে ভেতরে দৃশ্যমান আলোয় বদলে দেওয়া ন্যানোকণা, অথবা আল্ট্রাসাউন্ডনির্ভর কৌশল। এগুলো এখনও গবেষণাগারের স্তরে।

কারা বাদ পড়লেন: কৃতিত্বের প্রশ্ন

নোবেল পুরস্কারে সর্বোচ্চ তিনজন। অপটোজেনেটিক্সের পেছনে লোক ছিলেন তার চেয়ে বেশি, তাই ঘোষণার পরপরই প্রশ্ন উঠেছে:

  • এডওয়ার্ড বয়ডেন (এমআইটি): ২০০৫-এর যুগান্তকারী গবেষণাপত্রের প্রথম লেখক, তখন ডাইসেরথের গবেষণাগারের পিএইচডি ছাত্র। অনেকে সামাজিক মাধ্যমে তাঁর নাম চেয়েছেন। নোবেল কমিটি কারণ ব্যাখ্যা করেনি। কমিটি জ্যেষ্ঠদের বেছেছে, এমন ধারণার পক্ষে প্রমাণ নেই।
  • গেরো মিজেনবক: ২০০২ সালে প্রথম জিনের সাহায্যে আলোক-সংবেদী নন এমন স্নায়ুকোষকে আলো-সংবেদী বানিয়েছিলেন।
  • ঝুও-হুয়া প্যান (ওয়েন স্টেট): ২০০৪ সালে রেটিনার গ্যাংলিয়ন কোষে চ্যানেলরোডপসিন কাজ করান। তাঁর গবেষণাপত্র ছাপা হয় ২০০৬ সালে, ততদিনে ডাইসেরথ-বয়ডেনের কাজ আলোড়ন তুলে ফেলেছে।

মিজেনবক ও প্যান, দুজনেরই নাম কমিটির পটভূমি-নথিতে উল্লিখিত। ২০১৩ সালের ব্রেইন প্রাইজ পেয়েছিলেন ছ'জন: বাম্বের্গ, বয়ডেন, ডাইসেরথ, হেগেম্যান, মিজেনবক ও নাগেল। ডাইসেরথ নিজেও বলেছেন, এ কাজে ছাত্র, পোস্টডক ও সহযোগীদের বিরাট সম্প্রদায়ের হাত ছিল।

এক শৈবালের কৌতূহল থেকে যা শেখার

হেগেম্যান যখন শৈবালের আলো-সাড়া নিয়ে ভাবছিলেন, তখন কেউ বলেনি তাঁর কাজ একদিন অন্ধ মানুষের চিকিৎসায় লাগবে। কৌতূহল-তাড়িত মৌলিক গবেষণার হিসাব এভাবেই চলে: ফল আসে অপ্রত্যাশিত দিক থেকে, দীর্ঘ সময় পরে। যে এককোষী শৈবালকে আমরা পুকুরের সবুজ ছোপ বলে জানি, সে আজ নোবেলের মঞ্চে। পরের বড় প্রশ্নের উত্তর কোথায় লুকিয়ে আছে, কেউ জানে না।

এই লেখা তথ্যের জন্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। রোগের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

Q.1: অপটোজেনেটিক্স কী?

Ans: জিনবিদ্যা আর আলোর মিলিত পদ্ধতি, যাতে জীবন্ত প্রাণীর নির্দিষ্ট ধরনের স্নায়ুকোষে আলো-সংবেদী প্রোটিনের জিন বসিয়ে আলো ফেলে সেই কোষকে চালু বা বন্ধ করা যায়।

Q.2: ২০২৬ সালে চিকিৎসায় নোবেল কারা পেলেন?

Ans: কার্ল ডাইসেরথ (স্ট্যানফোর্ড), পিটার হেগেম্যান (হামবোল্ট, বার্লিন) ও গেয়র্গ নাগেল (ভুর্জবুর্গ)। আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল ও অপটোজেনেটিক্সের আবিষ্কারের জন্য, ৫ অক্টোবর ২০২৬ ঘোষণা।

Q.3: চ্যানেলরোডপসিন কী, কোথা থেকে এল?

Ans: এটি এককোষী শৈবাল ক্ল্যামাইডোমোনাস-এর আলো-সংবেদী প্রোটিন। নীল আলো পড়লে এতে একটা ছিদ্র খোলে, যা দিয়ে ধনাত্মক আয়ন কোষে ঢোকে। হেগেম্যান ও নাগেল ২০০২-০৩ সালে এর কাজ প্রমাণ করেন।

Q.4: অপটোজেনেটিক্স কি মানুষের উপর ব্যবহার হয়েছে?

Ans: হয়েছে, মূলত চোখের রোগে। ২০২১ সালের PIONEER ট্রায়ালে রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসায় আক্রান্ত একজন রোগীর আংশিক দৃষ্টি-সাড়া ফিরেছিল। মস্তিষ্কের রোগে এটি, যতদূর জানা যায়, এখনও প্রধানত গবেষণার স্তরে।

Q.5: অপটোজেনেটিক্স আর ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন কি একই?

Ans: না। ডিবিএস-এ মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক স্রোত দেওয়া হয় এবং আশপাশের কোষ প্রভাবিত হতে পারে। অপটোজেনেটিক্সে জিনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোষকে আলো-সংবেদী করে আলো ফেলা হয়।

Q.6: এডওয়ার্ড বয়ডেন নোবেল পাননি কেন?

Ans: নোবেল কমিটি কারণ প্রকাশ করেনি। পুরস্কারে সর্বোচ্চ তিনজনের নিয়ম আছে, আর বয়ডেন ২০১৩ সালে অন্য পাঁচজনের সঙ্গে ব্রেইন প্রাইজ পেয়েছিলেন।

  • অপটোজেনেটিক্স কী? ২০২৬ সালের চিকিৎসায় নোবেলের গল্প
    অপটোজেনেটিক্স কী ও কীভাবে কাজ করে? শৈবালের আলো-সংবেদী প্রোটিন থেকে ২০২৬ সালের চিকিৎসায় নোবেল, আর অন্ধত্বের চিকিৎসায় প্রথম প্রমাণের গল্প সহজ ভাষায়। অপটোজেনেটিক্স কী? পুকুরের শৈবাল থেকে ২০২৬ সালের চিকিৎসায় নোবেল খালি চোখে প্রায় দেখাই যায় না, এমন একটা এককোষী সবুজ শৈবাল আলোর দিকে সাঁতরে যায়। সে পারে, কারণ তার কোষপর্দায় একটা প্রোটিন আছে। সেই ...

    Read more

  • হ্যালোঅ্যালকেন হ্যালোঅ্যারিন রসায়ন – HS 3rd Semester Chemistry সম্পূর্ণ MCQ প্রশ্নোত্তর
    উচ্চমাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সেমিস্টার হ্যালোঅ্যালকেন হ্যালোঅ্যারিন রসায়ন অধ্যায়ের সবকটি MCQ প্রশ্ন উত্তরসহ। SN1, SN2, নিউক্লিওফিলিক প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত সব প্রশ্ন এখানে। হ্যালোঅ্যালকেন হ্যালোঅ্যারিন রসায়ন: HS 3rd Semester Chemistry সম্পূর্ণ MCQ প্রশ্নোত্তর তৃতীয় সেমিস্টার রসায়নের জৈব অংশের প্রথম বড় অধ্যায় হ্যালোঅ্যালকেন-হ্যালোঅ্যারিন — এখানে SN1/SN2 বিক্রিয়া প্রক্রিয়া, নিউক্লিওফিলিক প্রতিস্থাপন, গ্রিনিয়ার্ড বিকারক এবং বিভিন্ন নামজাদা বিক্রিয়া (ফিনকেলস্টাইন, সোয়ার্টস, ...

    Read more

  • p ব্লক মৌল রসায়ন (P Block Elements) – HS 3rd Semester Chemistry সম্পূর্ণ MCQ প্রশ্নোত্তর
    উচ্চমাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সেমিস্টার p ব্লক মৌল রসায়ন অধ্যায়ের সবকটি MCQ প্রশ্ন উত্তরসহ। নাইট্রোজেন পরিবার, হ্যালোজেন, নোবেল গ্যাস যৌগ সংক্রান্ত সব প্রশ্ন এখানে। p ব্লক মৌল রসায়ন: HS 3rd Semester Chemistry সম্পূর্ণ MCQ প্রশ্নোত্তর তৃতীয় সেমিস্টার রসায়নের p-ব্লক মৌল অধ্যায়টি নাইট্রোজেন পরিবার, অক্সিজেন পরিবার, হ্যালোজেন পরিবার এবং নোবেল গ্যাস যৌগ নিয়ে তৈরি — এই ...

    Read more

  • তরল অবস্থা রসায়ন (Liquid State) – HS 3rd Semester Chemistry সম্পূর্ণ MCQ প্রশ্নোত্তর
    উচ্চমাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সেমিস্টার তরল অবস্থা রসায়ন অধ্যায়ের সবকটি MCQ প্রশ্ন উত্তরসহ। হেনরির সূত্র, রাউল্টের সূত্র, সংখ্যাগত ধর্ম সংক্রান্ত সব প্রশ্ন এখানে। তরল অবস্থা রসায়ন: HS 3rd Semester Chemistry সম্পূর্ণ MCQ প্রশ্নোত্তর উচ্চমাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সেমিস্টার রসায়নের তরল অবস্থা (Liquid State) অধ্যায়টি সংখ্যাগত ধর্ম (Colligative Properties) দিয়ে ভরপুর — হেনরির সূত্র, রাউল্টের সূত্র, ...

    Read more

  • HS তৃতীয় সেমিস্টার গণিত মডেল প্রশ্নপত্র SET-I সমাধান — সব অধ্যায় মিলিয়ে ৪০ নম্বরের মক টেস্ট
    WBCHSE দ্বাদশ শ্রেণি HS তৃতীয় সেমিস্টার গণিত মডেল প্রশ্নপত্র (SET-I) — সম্বন্ধ-অপেক্ষক থেকে সম্ভাবনাতত্ত্ব পর্যন্ত সব টপিক মিলিয়ে ৪০টি MCQ প্রশ্নের সম্পূর্ণ সমাধান। HS তৃতীয় সেমিস্টার গণিত মডেল প্রশ্নপত্র (SET-I) সম্পূর্ণ সমাধান উচ্চ মাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণির HS তৃতীয় সেমিস্টার গণিত মডেল প্রশ্নপত্র, পরীক্ষার প্রকৃত ধরন বোঝার জন্য এই মিশ্র-টপিক মডেল প্রশ্নপত্র (SET-I, পূর্ণমান ৪০) — ...

    Read more

  • সম্ভাবনাতত্ত্ব প্রশ্ন উত্তর (Probability) MCQ — HS তৃতীয় সেমিস্টার গণিত
    WBCHSE দ্বাদশ শ্রেণি তৃতীয় সেমিস্টার গণিতের সম্ভাবনাতত্ত্ব প্রশ্ন উত্তর অধ্যায়ের ৩৫টি MCQ প্রশ্নের সম্পূর্ণ সমাধানসহ উত্তর — শর্তাধীন সম্ভাবনা, বেইজ উপপাদ্য, প্রত্যাশিত মান। সম্ভাবনাতত্ত্ব প্রশ্ন উত্তর (Probability) সম্পূর্ণ MCQ — HS তৃতীয় সেমিস্টার গণিত উচ্চ মাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণির তৃতীয় সেমিস্টার গণিত পরীক্ষায় সম্ভাবনাতত্ত্ব প্রশ্ন উত্তর (Probability) অধ্যায় থেকে শর্তাধীন সম্ভাবনা (conditional probability), স্বাধীন ঘটনা (independent ...

    Read more

মন্তব্য করুন