অশোক সেন — যে বাঙালি বিজ্ঞানী নোবেলের তিনগুণ পুরস্কার পেয়ে সাইকেলেই অফিস যান

Table of Contents

অশোক সেন — ৩ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার, তবুও সাইকেলে অফিস। মহাবিশ্বের রহস্য ভেদ করা এই বাঙালি বিজ্ঞানীকে কি আপনি চেনেন?

একটা সাধারণ দৃশ্য কল্পনা করুন। প্রয়াগরাজের রাস্তায় একজন মধ্যবয়সী মানুষ সাইকেলে করে অফিস যাচ্ছেন। কাঁধে ঝোলানো একটা সাধারণ ব্যাগ। পরনে সাধারণ পোশাক। চেহারায় কোনো আভিজাত্যের চিহ্ন নেই। এই মানুষটি কে?

পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারের প্রায় তিনগুণ অর্থমূল্যের — ৩ মিলিয়ন বা ৩০ লক্ষ মার্কিন ডলারের — পুরস্কারজয়ী বিজ্ঞানী। যাঁর রয়্যাল সোসাইটি ফেলোশিপের প্রস্তাব করেছিলেন স্বয়ং স্টিফেন হকিং। যাঁর গবেষণা ছাড়া আধুনিক স্ট্রিং তত্ত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যেত। তাঁর নাম অশোক সেন

কলকাতায় জন্ম। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র। অমল কুমার রায়চৌধুরীর মতো কিংবদন্তি শিক্ষকের সান্নিধ্যে বড় হওয়া। এবং শেষমেশ মহাবিশ্বের সবচেয়ে গভীর রহস্যের কিছু অংশ উন্মোচন করে ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করে রাখা। এই পোস্টে আমরা তাঁর পুরো গল্পটা বলব — শৈশব থেকে স্ট্রিং থিওরির বিপ্লব পর্যন্ত।


মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা কী?

অশোক সেনকে বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে তিনি কী নিয়ে কাজ করেন। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে দুটো বিশাল তত্ত্বের সাথে লড়াই করছেন। একদিকে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা (General Relativity) — যা মহাকর্ষ এবং মহাবিশ্বের বড় কাঠামো ব্যাখ্যা করে। গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি — সব কিছু।

অন্যদিকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা (Quantum Mechanics) — যা অতিপারমাণবিক কণার জগৎ ব্যাখ্যা করে। ইলেকট্রন, কোয়ার্ক — এই সব।

সমস্যা হলো, দুটো তত্ত্ব আলাদা আলাদাভাবে দারুণ কাজ করে। কিন্তু যখনই ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রে বা বিগ ব্যাং-এর মুহূর্তে কী ঘটেছিল সেটা বোঝার চেষ্টা হয় — দুটো তত্ত্ব একসাথে ব্যবহার করতে গেলেই গণিত ভেঙে পড়ে। এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে জন্ম নিয়েছে স্ট্রিং তত্ত্ব (String Theory)

মূল ধারণাটা হলো — মহাবিশ্বের মৌলিক কণাগুলো আসলে বিন্দু নয়। তারা হলো অতি ক্ষুদ্র স্পন্দিত তন্তু বা ‘স্ট্রিং’। এই স্ট্রিংগুলো বিভিন্নভাবে কাঁপলে বিভিন্ন কণা তৈরি হয় — ঠিক যেমন গিটারের একটি তার টানটান করে বাঁধলে একটা সুর বের হয়, ঢিলা করলে আরেকটা।

এই তত্ত্বকে গাণিতিকভাবে পূর্ণাঙ্গ করার কাজে যাঁরা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে অশোক সেন অন্যতম শীর্ষস্থানীয়।


কলকাতার ছেলে — শৈশব ও পরিবার

১৯৫৬ সালের ১৫ জুলাই। কলকাতায় জন্ম অশোক সেনের। বাবা অনিল কুমার সেন — স্কটিশ চার্চ কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক। পরিবারের আদি নিবাস পূর্ববঙ্গে, কিন্তু মাতামহ অনেক আগেই কলকাতায় চলে এসেছিলেন। পরিবারজুড়ে শিক্ষার প্রতি একটা গভীর টান। শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়ে শুরু হলো পড়াশোনা। বাংলা মাধ্যম।

কিন্তু সেই সময়টা ছিল কলকাতার ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তাল একটা অধ্যায়। নকশাল আন্দোলনের জেরে স্কুল-কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় সহিংসতা। একাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষার আগে প্রায় ছয় মাস স্কুল বন্ধ থাকল। ছয় মাস একা বাড়িতে বসে পড়তে হলো। কোনো শিক্ষক নেই, কোনো ক্লাস নেই।

এটা অনেকের কাছে দুঃস্বপ্ন হতে পারত। কিন্তু অশোক সেনের জন্য এটা হয়ে গেল একটা শিক্ষা। নিজে নিজে শেখার ক্ষমতা — autodidactic হওয়ার ক্ষমতা — যা পরে তাঁর বৈজ্ঞানিক জীবনে বারবার কাজে লেগেছে।

একটা মজার কথা — সেই স্কুলে ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাস ছিল অসাধারণ। সকাল ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে স্কুলে গিয়ে ক্যালরিমিটার, স্ফেরোমিটার, মাইক্রোমিটার স্ক্রু-গেজ নিয়ে নিজে হাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। পরে যখন সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক পদার্থবিদ হলেন, তখনও ভৌত জগতের এই বাস্তব অনুভূতিটা তাঁর ভেতরে ছিল।


প্রেসিডেন্সি কলেজ — এবং অমল কুমার রায়চৌধুরীর সান্নিধ্য

১৯৭৫ সাল। প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন পদার্থবিজ্ঞানে। সেই সময় প্রেসিডেন্সি কলেজ মানে শুধু একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় — পুরো পূর্ব ভারতের সেরা মেধার মিলনস্থল। রাজ্য বোর্ডের সেরা দশজনের মধ্যে পাঁচজনই তাঁর ব্যাচে।

বাংলা মাধ্যম থেকে এসে ইংরেজিতে পরীক্ষা দেওয়াটা শুরুতে একটু কঠিন মনে হয়েছিল। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের গণিতের ভাষা তো সার্বজনীন। সেই ভাষায় কোনো বাধা নেই। আর সেখানেই পাওয়া গেল সেই মানুষটাকে।

অমল কুমার রায়চৌধুরী।

যাঁর সমীকরণ ছাড়া পেনরোজ-হকিংয়ের সিঙ্গুলারিটি থিওরেম হতো না। যাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ অপ্রচলিত — সিলেবাস নয়, মৌলিক চিন্তা। অশোক সেন তাঁর ক্লাসিকাল মেকানিক্সের পুরো কোর্সটা করতে পারেননি। কিন্তু তাঁর সহপাঠী সুমিত দাস আর পলাশ পালের নোট সংগ্রহ করলেন। সেই নোটই পরে একটি বিখ্যাত বই হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।

রায়চৌধুরী ক্লাসে আসতেন একটুকরো কাগজ হাতে নিয়ে। সেখানে মাত্র কয়েকটা লাইন। তার উপর ভিত্তি করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহাকর্ষ, স্থান-কালের জ্যামিতি বোঝাতেন — পাঠ্যপুস্তক না দেখে, সম্পূর্ণ নিজের মাথা থেকে। এই দেখাটা অশোক সেনের ভেতরে একটা গভীর ছাপ রেখেছিল। পরে যখন নিজে শিক্ষক হলেন, সেই একই দর্শন নিয়ে পড়াতেন।


IIT কানপুর থেকে আমেরিকা — নতুন জগতে প্রবেশ

নকশাল আন্দোলনের কারণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাপত্র বারবার পিছিয়ে যাচ্ছিল। স্নাতক ডিগ্রিই একবছর দেরিতে পেলেন। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে আর অপেক্ষা নয়। সহপাঠী বিদ্যুৎ ভট্টাচার্যের সাথে মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন IIT কানপুরে যাবেন। সেখানে গিয়ে একটা নতুন পৃথিবী।

আমেরিকান ধাঁচের সেমিস্টার সিস্টেম। প্রতিনিয়ত হোমওয়ার্ক, অ্যাসাইনমেন্ট। সারা ভারত থেকে আসা ছাত্রছাত্রী। সবার সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে হচ্ছে। ১৯৭৮ সালে M.Sc. শেষ করলেন। এরপর PhD-র জন্য আমেরিকা। Stony Brook University-তে ভর্তি হলেন। গবেষণার বিষয় — কোয়ান্টাম ক্রোমোডায়নামিক্স (QCD) এবং কোয়ার্কের আচরণ। জর্জ স্টেরম্যানের অধীনে।

একটা মজার ঘটনা — Stony Brook এবং Princeton এ আবেদন করার অন্যতম কারণ ছিল যে এই দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের সময় তাৎক্ষণিকভাবে ফি দিতে হতো না। বিজ্ঞানের জগতে যিনি পরে কোটি টাকার পুরস্কার পাবেন, তখন তাঁকে আবেদন ফি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে — এটাই বাস্তবতা। ১৯৮২ সালে PhD শেষ করলেন। আর এখানেই পরিচয় হলো সুমতি রাওয়ের সাথে — যিনি এক বছরের জুনিয়র, এবং পরে জীবনসঙ্গী হলেন।


প্রথম সুপারস্ট্রিং বিপ্লব — মোড় ঘুরে গেল

PhD-র পর Fermilab, তারপর SLAC-এ পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ। এই সময়েই তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে একটা বিশাল ঝাঁকুনি লাগল। মাইকেল গ্রিন আর জন শোয়ার্জ প্রমাণ করলেন — নির্দিষ্ট কিছু স্ট্রিং তত্ত্বে গাণিতিক অসঙ্গতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। এটাই “প্রথম সুপারস্ট্রিং বিপ্লব”।

অশোক সেন দেখলেন — এটাই তাঁর পথ। পার্টিকেল ফিজিক্স থেকে সরে এসে সম্পূর্ণভাবে স্ট্রিং তত্ত্বে মনোনিবেশ করলেন। আর এরপর যা হলো — সেটাই ইতিহাস।


১৯৮৮ — ভারতে ফেরার সিদ্ধান্ত

১৯৮৮ সাল। পাশ্চাত্যের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের সুযোগ ছিল। আন্তর্জাতিক স্তরে তখন ইতিমধ্যেই পরিচিত নাম। অনেকে থেকে যেতেন। কিন্তু অশোক সেন সিদ্ধান্ত নিলেন — ভারতে ফিরবেন। মুম্বাইয়ের Tata Institute of Fundamental Research (TIFR)-এ Faculty হিসেবে যোগ দিলেন। সাথে এলেন তাঁর স্ত্রী সুমতি রাও এবং বন্ধু সুনীল মুখী।

পাশ্চাত্যে শিক্ষিত প্রতিভাবান বিজ্ঞানীদের এভাবে দেশে ফেরা — এটাকে বলা হয় “Reverse Brain Drain”। ভারতের বিজ্ঞান গবেষণার ইতিহাসে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ১৯৯৫ সালে প্রয়াগরাজের হরিশ-চন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউট (HRI)-এ Distinguished Professor হলেন। তাঁর নেতৃত্বে HRI হয়ে উঠল বিশ্বমানের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান গবেষণার কেন্দ্র।


S-Duality — যে আবিষ্কার দ্বিতীয় সুপারস্ট্রিং বিপ্লব এনেছিল

১৯৯০-এর দশকের শুরু। স্ট্রিং তত্ত্বে একটা বড় সমস্যা। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছিলেন মহাবিশ্বে পাঁচ ধরনের আলাদা সুপারস্ট্রিং তত্ত্ব থাকতে পারে। কিন্তু মহাবিশ্বের “সব কিছুর তত্ত্ব” (Theory of Everything) তো একটাই হওয়ার কথা। পাঁচটা কেন?

এর চেয়েও বড় সমস্যা। এই তত্ত্বগুলো শুধু কাজ করত যখন কণাগুলোর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া খুব দুর্বল। মিথস্ক্রিয়া শক্তিশালী হলেই গণিত ভেঙে পড়ত। ১৯৯৪ সালে অশোক সেন একটা গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন Physics Letters B জার্নালে।

শিরোনাম দেখে সাধারণ মানুষ হয়তো কিছু বুঝবেন না — “Dyon-monopole bound states, self-dual harmonic forms on the multi-monopole moduli space, and SL(2,Z) invariance in string theory”। কিন্তু বিজ্ঞানী মহলে এটা বোমার মতো ফাটল।

তিনি প্রমাণ করলেন — শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়াযুক্ত একটি স্ট্রিং তত্ত্ব আসলে দুর্বল মিথস্ক্রিয়াযুক্ত অন্য একটি স্ট্রিং তত্ত্বের সমতুল্য। এই সম্পর্কের নাম S-Duality। মানে — শক্তিশালী এবং দুর্বল পরস্পরের আয়নায় প্রতিফলন মাত্র।

এই আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে পরে এডওয়ার্ড উইটেন দেখালেন — পাঁচটা আলাদা স্ট্রিং তত্ত্ব আসলে একই মূল তত্ত্বের পাঁচটা রূপ। সেই মূল তত্ত্বের নাম দেওয়া হলো M-Theory। এটাই হলো “দ্বিতীয় সুপারস্ট্রিং বিপ্লব”। আর এই বিপ্লবের মূল ভিত্তি? অশোক সেনের ১৯৯৪ সালের সেই পেপার।


Sen Conjecture এবং Tachyon Condensation — অস্থির মহাবিশ্বের গণিত

S-Duality-র পর মনোযোগ গেল আরেকটা সমস্যায়। স্ট্রিং তত্ত্বে D-Brane হলো বহুমাত্রিক তল — ওপেন স্ট্রিংয়ের প্রান্তগুলো এর সাথে যুক্ত থাকে। কিছু D-Brane স্থিতিশীল। কিছু স্বাভাবিকভাবেই অস্থিতিশীল। এই অস্থিতিশীলতার গাণিতিক প্রমাণ হলো “Tachyon” — এমন একটি কণার উপস্থিতি যার ভর কাল্পনিক। পাহাড়ের চূড়ায় রাখা পাথরের মতো — সামান্য ধাক্কায় গড়িয়ে পড়বে।

১৯৯৮ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে অশোক সেন একের পর এক পেপার প্রকাশ করলেন। প্রস্তাব দিলেন বিখ্যাত Sen Conjecture: যখন Tachyon গড়িয়ে সর্বনিম্ন শক্তিস্তরে পৌঁছায়, তখন সেই D-Brane সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যায়। ওপেন স্ট্রিংয়ের সব Degree of Freedom নিশ্চিহ্ন হয়। শুধু Closed String Vacuum টিকে থাকে।

এর মানে হলো — উচ্চমাত্রিক অস্থিতিশীল ব্রেন ভেঙে পড়ে নিম্নমাত্রিক স্থিতিশীল ব্রেন তৈরি করতে পারে। এটা শুধু গাণিতিক কৌতূহল ছিল না। এই Rolling Tachyon-এর ধারণা মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বে — বিশেষত Cosmic Inflation বোঝার ক্ষেত্রে — নতুন দরজা খুলে দিল।

Barton Zwiebach সহ অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সাথে মিলে String Field Theory দিয়ে এই Conjecture প্রমাণ করা হলো।


Black Hole Entropy Function — ব্ল্যাক হোলের গণিত মেলানো

স্ট্রিং তত্ত্বকে সত্যিকারের কোয়ান্টাম মহাকর্ষ তত্ত্ব হিসেবে প্রমাণ করার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হলো ব্ল্যাক হোলের তাপগতিবিদ্যা বোঝানো। Bekenstein-Hawking সূত্র বলে — ব্ল্যাক হোলের Entropy তার Event Horizon-এর ক্ষেত্রফলের সমানুপাতিক।

কিন্তু স্ট্রিং তত্ত্বে উচ্চ-মাত্রার Quantum Correction যোগ হলে সেই হিসেব জটিল হয়ে যায়। ২০০৫ সালে অশোক সেন প্রকাশ করলেন “Black Hole Entropy Function and the Attractor Mechanism in Higher Derivative Gravity”।

তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল চমৎকার। Extremal Black Hole-এর Event Horizon-এর কাছে স্থান-কালের গঠন সবসময় একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন মেনে চলে। এই প্যাটার্নের সুযোগ নিয়ে তিনি তৈরি করলেন Entropy Function। দুটো অসাধারণ ফলাফল পেলেন:

এক। এই ফাংশন Extremize করলে Event Horizon-এর ঠিক উপরে Scalar Field-এর সঠিক মান পাওয়া যায় — এবং এই মান ব্ল্যাক হোলের আধানের উপর নির্ভর করে, অসীম দূরত্বের Background Field-এর উপর নয়। এটাই Attractor Mechanism-এর প্রথম সার্বজনীন প্রমাণ — Supersymmetry ব্যবহার না করেই।

দুই। এই Extremum বিন্দুর মানটিই ব্ল্যাক হোলের নিখুঁত Quantum-Corrected Entropy।

পরে তাঁর দল এই কাঠামো ব্যবহার করে Macroscopic Entropy-র সাথে Microscopic String State-এর গণনার এমন মিল দেখাল যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। স্ট্রিং তত্ত্রের সত্যতার এই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।


Superstring Perturbation Theory — পুরনো সমস্যার নতুন সমাধান

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অশোক সেন ফিরে গেছেন পার্টার্বেশন তত্ত্বে — যেখানে PhD জীবনে হাতেখড়ি। স্ট্রিং তত্ত্বে কণার মিথস্ক্রিয়া বোঝানো হয় Riemann Surface-এর মাধ্যমে। কিন্তু উচ্চতর Loop Order-এ কিছু কৃত্রিম Mathematical Divergence দেখা দেয় — যা তত্ত্বের কাঠামো নড়বড়ে করে দেয়।

অশোক সেন World-sheet Conformal Field Theory, Picture Changing Operators এবং “Vertical Integration” নামক পদ্ধতি ব্যবহার করে এই Spurious Divergence-গুলো সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেওয়ার পথ খুঁজলেন। ফলাফল — Superstring তত্ত্ব যেকোনো Loop Order-এর জন্যই গাণিতিকভাবে সুসংগত এবং সসীম বলে প্রমাণিত হলো।

এই কাজ ছিল প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল — কিন্তু এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।


শিক্ষাদান — জ্ঞান যাঁর কাছে সম্পদ নয়, উপহার

অশোক সেনের বৈজ্ঞানিক অবদানের কথা বলতে গেলে তাঁর শিক্ষাদানের কথা না বললে ছবিটা অসম্পূর্ণ থাকে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন — তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বাঁচিয়ে রাখতে হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঠিকমতো তৈরি করতে হবে। তাঁর প্রতিটা Graduate Course-এর Lecture Notes এবং Video Recording ICTS ও HRI-র Website-এ বিনামূল্যে সবার জন্য উন্মুক্ত।

কোর্সবিষয়বস্তু
Quantum Mechanics (১ ও ২)উন্নত কোয়ান্টাম তত্ত্ব
General Relativityডিফারেনশিয়াল জ্যামিতি ও আইনস্টাইনের সমীকরণ
Quantum Field Theory (১ ও ২)গেজ তত্ত্ব ও Quantization
String Theory (১ ও ২)Bosonic String থেকে Superstring
Superstring Perturbation TheoryRiemann Surface ও Divergence দূরীকরণ
Cosmology (Inflation to Last Scattering)প্রারম্ভিক মহাবিশ্বের গতিশীলতা

বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের একজন ছাত্র, যাঁর কাছে ইন্টারনেট আছে — তিনি বিনামূল্যে অশোক সেনের কাছে পদার্থবিজ্ঞান শিখতে পারেন। এটা ছোট ব্যাপার নয়।


পুরস্কার ও সম্মাননা — তালিকা দীর্ঘ, অহংকার শূন্য

পুরস্কারসালকারণ
ICTP Prize১৯৮৯High-Energy Physics-এ প্রারম্ভিক কাজ
শান্তি স্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার১৯৯৪ভারতের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান পুরস্কার
Fellow of the Royal Society১৯৯৮হকিং কর্তৃক মনোনীত
পদ্মশ্রী২০০১বিজ্ঞানে অসামান্য অবদান
Pius XI Medal২০০৬Vatican-এর বিজ্ঞান পুরস্কার
Infosys Prize২০০৯Black Hole Entropy বিশ্লেষণ
Fundamental Physics Prize২০১২S-Duality প্রমাণ, ৩ মিলিয়ন ডলার
পদ্মভূষণ২০১৩ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ সম্মান
Dirac Medal২০১৪ICTP-র সর্বোচ্চ পুরস্কার
American Academy of Arts & Sciences২০২৪আজীবন আন্তর্জাতিক সম্মাননা

২০১২ সালের পুরস্কারের কথা একটু আলাদাভাবে বলা দরকার। রাশিয়ান বিলিয়নেয়ার ইউরি মিলনারের প্রবর্তিত Fundamental Physics Prize-এর প্রথম নয়জন বিজয়ীর একজন হলেন অশোক সেন। পুরস্কার — ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। নোবেলের প্রায় তিনগুণ।

Princeton-এর Institute for Advanced Studies-এ এডওয়ার্ড উইটেন বা জুয়ান মালদাসেনার মতো বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি ভারতের প্রয়াগরাজে বসে গবেষণা করা একজন বিজ্ঞানী এই পুরস্কার পেলেন। এটা ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় মুহূর্ত।

আর Royal Society Fellowship-এর মনোনয়নকারী ছিলেন স্বয়ং স্টিফেন হকিং — এটা অশোক সেনের ব্ল্যাক হোল গবেষণার গুরুত্বের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।


৩ মিলিয়ন ডলার পেয়ে কী করলেন?

জীবন বদলালেন না। বড় বাড়ি কিনলেন না। বিলাসবহুল গাড়ি কিনলেন না।

পুরস্কারের বড় অংশ দান করে দিলেন — শিক্ষার্থীদের বৃত্তির জন্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণার উন্নতির জন্য।এখনও সাইকেলে অফিস যান। অফিসের ঘরটা সাধারণ — ব্ল্যাকবোর্ড আর গবেষণাপত্রের স্তূপ। বাড়তি কোনো জৌলুস নেই।

অবসরে রান্না করেন। আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে গেলে জাদুঘর দেখেন। তরুণ প্রজন্মকে বলেন — বিজ্ঞান করার মূল কারণ হওয়া উচিত কৌতূহল আর ভালোবাসা। অর্থের পেছনে ছোটার মানসিকতা নিয়ে এই পথে এলে বেশিদূর যাওয়া যাবে না।


শিক্ষার পথরেখা — এক নজরে

স্তরপ্রতিষ্ঠানবছরবিশেষত্ব
স্কুলশৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়১৯৭৫-এর আগেরাজনৈতিক অস্থিরতায় স্ব-শিক্ষা
B.Sc.প্রেসিডেন্সি কলেজ১৯৭৫রায়চৌধুরীর সান্নিধ্য
M.Sc.IIT কানপুর১৯৭৮আন্তর্জাতিক প্রস্তুতি
Ph.D.Stony Brook University১৯৮২QCD গবেষণা, জর্জ স্টেরম্যানের অধীনে

অশোক সেন এবং অমল কুমার রায়চৌধুরী — দুই প্রজন্মের সেতু

এই দুজনের গল্পের মধ্যে একটা সুন্দর সংযোগ আছে। রায়চৌধুরী সমীকরণ ছাড়া হকিং-পেনরোজের সিঙ্গুলারিটি থিওরেম হতো না। আর হকিং-পেনরোজের কাজ না থাকলে ব্ল্যাক হোলের তাপগতিবিদ্যার যে প্রশ্নগুলো উঠল — সেগুলো অশোক সেনকে তাঁর Entropy Function-এর দিকে ঠেলে না-ও দিতে পারত।

দুজনেই প্রেসিডেন্সি কলেজের মানুষ। একজন শিক্ষক, আরেকজন ছাত্র। একজন কলকাতার স্যাঁতসেঁতে ল্যাবে একাকী মহাবিশ্বের জ্যামিতি লিখেছেন। আরেকজন তাঁর দেখানো পথে হেঁটে মহাবিশ্বের আরও গভীরে ঢুকেছেন। বিজ্ঞানের প্রবাহ এভাবেই চলে — প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।


শেষ কথা

অশোক সেনের গল্পটা শুধু একজন সফল বিজ্ঞানীর গল্প নয়। এটা হলো সেই মানুষের গল্প যিনি কলকাতার অস্থির রাজনীতির মাঝে ছয় মাস একাকী পড়েছেন, প্রেসিডেন্সি কলেজের ক্লাসে অমল কুমার রায়চৌধুরীর

একটুকরো কাগজ থেকে মহাবিশ্বের জ্যামিতি শিখেছেন, আবেদন ফি জোগাড় করার চিন্তায় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন সেটা ঠিক করেছেন — এবং শেষমেশ মহাবিশ্বের সবচেয়ে গভীর গণিতের কিছু অংশ উন্মোচন করেছেন।

৩ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার পেয়েও সাইকেলে অফিস গিয়েছেন। বিশ্বের সেরা পুরস্কার পেয়েও পুরস্কারের টাকা শিক্ষার্থীদের দিয়ে দিয়েছেন। নিজের জ্ঞান বিশ্বের সব ছাত্রের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।

মহাবিশ্বের রহস্য উদ্ঘাটনের পাশাপাশি তিনি আরেকটা সত্য প্রমাণ করেছেন — বিজ্ঞানের সবচেয়ে গভীর সত্য লুকিয়ে থাকে একটা সরল, কৌতূহলী মনের মধ্যে।


তথ্যসূত্র: অশোক সেনের জীবন ও গবেষণার উপর একাডেমিক বিশ্লেষণ, ICTS ও HRI-র অফিসিয়াল পোর্টাল, Physics Letters B (1994), Physical Review Letters (2005), Breakthrough Prize Foundation

আরো দেখুন : চক্রপাণি দত্ত: কিংবদন্তী চিকিৎসক ও পণ্ডিত

আরো দেখুন : থেলস: গ্রিক দর্শনের জনক ও বিজ্ঞানের আদি পথিকৃৎ

আরো দেখুন : ব্রহ্মগুপ্ত: বীজগণিতের জনক Brahmagupta

আরো দেখুন : চরকসংহিতা: প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্রের অমূল্য রত্ন

আরো দেখুন : জীবক: প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র

Leave a Comment