চরকসংহিতা: প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্রের অমূল্য রত্ন

প্রাচীন ভারতে চিকিৎসাশাস্ত্রের যেসকল কীর্তি আজও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, তার মধ্যে অন্যতম হল চরক রচিত ‘চরকসংহিতা‘। এই মহাগ্রন্থটি শুধু ভারতবর্ষেই নয়, সারা বিশ্বের মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছে। বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়ার পাশাপাশি, এটি বহু চিকিৎসককে অনুপ্রাণিত করেছে এবং তাদের পথপ্রদর্শন করেছে।

charak sanghita
charak sanghita

চরকের পরিচয়

চরকসংহিতার রচয়িতা চরক সম্পর্কে বিশেষ কিছু তথ্য পাওয়া যায় না। তবে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী‘ সূত্রে তাঁর নাম উল্লেখিত আছে। ঐতিহাসিকদের মতে, চরক নামে দু’জন পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন – একজন সংহিতা রচনাকারী এবং অন্যজন চিকিৎসক। কেউ কেউ মনে করেন, চরক হয়তো কোনো গোত্রের নাম।
বৌদ্ধধর্ম গ্রন্থ ‘ত্রিপিটক‘-এর চীনা অনুবাদে চরকের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে তাঁকে কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের প্রধান চিকিৎসক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর আবির্ভাবকাল খ্রিস্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে বলে মনে করা হয়।

বিশ্বজুড়ে চরক সংহিতার খ্যাতি

খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে চরকের নাম বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। চতুর্থ শতকের শেষের দিকে রচিত ‘নবনীতক‘ নামক একটি চিকিৎসাশাস্ত্রের পুঁথিতে চরকের সিদ্ধান্তের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে চরক সংহিতা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় এবং এর মাধ্যমে তাঁর নাম বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি সারকান এবং ল্যাটিন চিকিৎসাবিদ্যায়ও চরকের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে। অল বেরুনী চরককে শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁর পুঁথিশালায় চরকসংহিতার আরবি অনুবাদ পাওয়া যায়।

চরকসংহিতার বিষয়বস্তু

আয়ুর্বেদশাস্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ চরকসংহিতায় মানবশরীরের বিভিন্ন রোগের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে, যা আধুনিক যুগের চিকিৎসকদেরও বিস্মিত করে। এই গ্রন্থটি আটটি ভাগে বিভক্ত:
১. দ্রব্যগুণ: এই ভাগে বিভিন্ন দ্রব্যের গুণাগুণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
২. লক্ষণ: এখানে বিভিন্ন রোগের লক্ষণ ও পরিচয় দেওয়া হয়েছে।
৩. শরীর: এই ভাগে মানুষের দেহ ও মনের পরিচয় বর্ণিত আছে।
৪. শারীরস্থান: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাগ, যেখানে শারীরবিজ্ঞানের ওপর আধুনিক আলোচনা করা হয়েছে।
৫. ইন্দ্রিয়স্থান: শরীরের কোন অংশে কোন লক্ষণ দেখা দিলে ভবিষ্যতে কি রোগ হতে পারে, তার বিবরণ রয়েছে এই ভাগে।
৬. চিকিৎসা: এই ভাগে রোগ ও ওষুধের দীর্ঘ বিবরণ দেওয়া আছে।
৭. কল্পস্থান ও সিদ্ধিস্থান: এই দুটি ভাগে চিকিৎসকদের কর্তব্য সম্পর্কে উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, চরকসংহিতায় একটি দার্শনিক মতবাদ লিপিবদ্ধ আছে, যেখানে চরক আত্মা ও আয়ু সম্পর্কে তাঁর মতামত জানিয়েছেন।

চরকসংহিতার আধুনিক সংস্করণ

কালের স্রোতে চরক সংহিতার একাধিকবার সংস্করণ করা হয়েছে। খ্রিস্টীয় নবম শতকে কাশ্মীরি আচার্য দৃঢ়বল এবং পরে রাগভট্ট এই গ্রন্থটির ব্যাপকভাবে সংস্কার করেন।
চরকের জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা না গেলেও, তাঁর রচিত চরকসংহিতা আজও চিকিৎসাশাস্ত্রের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই গ্রন্থটি তাঁর কৃতিত্বের উজ্জ্বল নিদর্শন।

READ MORE

সত্যেন্দ্রনাথ বসু |Satyendra Nath Bose Biography in Bengali

READ MORE

ভারতীয় রসায়নের জনক: আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় | Acharya Prafulla Chandra Roy discovered

Leave a Comment