অটিস্টিক সন্তানের জন্য ট্রান্সফার আটকে রেখেছিল স্কুল — হাইকোর্ট যা বলল তা নজির গড়ল

অটিস্টিক সন্তানের জন্য ট্রান্সফার চেয়েছিলেন মা-শিক্ষিকা — স্কুল NOC দেয়নি, হাইকোর্ট এবার কড়া নির্দেশ দিল

একজন মা। একজন শিক্ষিকা। আর মাঝখানে একটা ৯ বছরের ছেলে — যে কথা বলতে পারে না ঠিকঠাক, একা থাকতে পারে না, প্রতিটা মুহূর্তে কারো সঙ্গ দরকার তার।

Beauti Baitha-র জীবনটা এইভাবেই চলছিল। প্রতিদিন সকালে উঠে ঘর থেকে বেরোতে হয় — গন্তব্য ২৩০ কিলোমিটার দূরের স্কুল। আর পেছনে পড়ে থাকে তাঁর ছেলে, যার ৬০% স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা আছে Autism Spectrum Disorder-এর কারণে।

এই কষ্টের কথা তিনি বারবার জানিয়েছেন। অটিস্টিক সন্তানের জন্য ট্রান্সফার জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ NOC দেয়নি। আর NOC ছাড়া DI অফিসও কিছু করতে পারছে না।

শেষমেশ কলকাতা হাইকোর্টে গেলেন তিনি। আর সেখানেই ঘটল একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা।


অটিস্টিক সন্তানের জন্য ট্রান্সফার মামলার শুরু কোথায়?

এটা Beauti Baitha-র দ্বিতীয় দফার লড়াই।

প্রথমবার তিনি সন্তানের চিকিৎসাগত কারণ ও দূরত্ব — দুটো ground একসাথে দেখিয়ে অটিস্টিক সন্তানের জন্য ট্রান্সফার আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদন বিবেচনাই করা হয়নি। হাইকোর্টে গিয়েছিলেন — WPA 3545 of 2025। কিন্তু সেই মামলা খারিজ হয়ে গেল, কারণ নির্ধারিত proforma-য় আবেদন করা হয়নি।

এবার তিনি আরো সতর্ক হলেন। শুধুমাত্র সন্তানের চিকিৎসাগত কারণে আবেদন করলেন — সঠিক proforma-তে। এবার পদ্ধতিগত কোনো ভুল নেই। কিন্তু তবুও স্কুল NOC দিচ্ছে না।

তাই আবার হাইকোর্ট। এবারের মামলা — WPA 15447 of 2025


আদালতে যুক্তির লড়াই — কোথায় আটকাল বিষয়টা?

WBCSSC-র তরফে Mr. Kanak Kiran Bandyopadhyay একটা সুনির্দিষ্ট আপত্তি তুললেন।

তাঁর বক্তব্য — ট্রান্সফারের জন্য Rule 4(a)-তে যে grounds উল্লেখ আছে, সেগুলো হলো শিক্ষক নিজে বা তাঁর পরিবারের কেউ malignant disease, severe heart disease, renal failure, thalassemia বা এই ধরনের রোগে ভুগলে। সন্তানের autism সেই তালিকায় নেই। তাই এই ground-এ ট্রান্সফার হওয়ার সুযোগ নেই।

যুক্তিটা শুনতে আইনসম্মত মনে হয়। কিন্তু আদালত একটু অন্যভাবে দেখল বিষয়টাকে।

Download PDF Order Copy 👈


হাইকোর্ট যা বলল — এটাই আসল নজির

বিচারক মনোযোগ দিলেন Rule 4-এর শেষ অংশটায় — clause (e): “Any other reasons.”

এই clause-টা কেন রাখা হয়েছে? শুধু কি সাজানোর জন্য? না।

আদালত বললেন — Rule 4(a) থেকে 4(d) পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু grounds বলা আছে। কিন্তু জীবন সবসময় নিয়মের বাঁধা তালিকায় চলে না। এমন অনেক পরিস্থিতি আসতে পারে যা আইন প্রণেতারা আগে থেকে ভাবতে পারেননি। সেই “অন্য কারণ”গুলোর জন্যই clause (e) রাখা হয়েছে।

এবং শুধু তাই নয় — আদালত আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন। Rule 4(a)-তে শুধু শারীরিক অসুস্থতার কথা ভাবা হয়েছে। কিন্তু একজন সন্তান যদি mentally differently-abled হয়, যার জন্য প্রতিমুহূর্তে caregiver দরকার — সেটা কি শিক্ষকের স্কুলে যাওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে না?

অবশ্যই করে।

আদালত আগের বেশ কিছু নজির তুলে ধরলেন —

  • Saurav Basu vs State of West Bengal (WPA 20742 of 2023)
  • Swati Pal vs State of West Bengal (WPA 9141 of 2025)
  • Sunita Nandan vs State of West Bengal (WPA 26829 of 2024)
  • Division Bench-এর Dipti Biswas vs State of West Bengal (MAT 1065 of 2024)

এই সব মামলায় বারবার বলা হয়েছে — Rule 4(a) এবং clause (e) একসাথে পড়তে হবে। এবং যে কোনো পরিস্থিতি যা শিক্ষককে স্কুলে আসতে বাধা দেয়, সেটাকে বিবেচনায় নিতে হবে।


২৩০ কিমি দূরে, সন্তান একা — এটাই ছিল আসল সমস্যা

Beauti Baitha-র ছেলের autism-এর কারণে ৬০% স্থায়ী অক্ষমতা আছে। Government of India-র disability certificate আছে — তারিখ ১৯ নভেম্বর ২০২৪।

এই ছেলেকে প্রতিদিন একা রেখে ২৩০ কিলোমিটার দূরে স্কুলে যাওয়া — এটা শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব। আদালত বললেন, এই পরিস্থিতি clearly Rule 4(a)-এর আওতায় পড়ে — কারণ এটা শিক্ষকের স্কুলে নিয়মিত উপস্থিত থাকার ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।


আদালতের নির্দেশ — স্কুলকে ৩১ মে-র মধ্যে NOC দিতে হবে

বিচারক স্পষ্ট নির্দেশ দিলেন —

স্কুল কর্তৃপক্ষকে ৩১ মে ২০২৬-এর মধ্যে petitioner-এর ক্ষেত্রে eligibility বিচার করে প্রয়োজনীয় certificate ও No Objection Certificate ইস্যু করতে হবে। সেই NOC পাওয়ার পর DI অফিস আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। আর Commission সেই আবেদন পাওয়ার ৬ সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করবে।

তবে আদালত একটা কথাও বললেন — এই রায় যেন precedent হিসেবে ব্যবহার না হয় প্রতিটা ক্ষেত্রে। এটা একটি বিশেষ মানবিক পরিস্থিতিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত।


এই রায়ের তাৎপর্য কী?

সহজ করে বললে — এই রায় বলছে, আইনের ভাষা যখন মানুষের বাস্তব কষ্টকে ধরতে পারে না, তখন আদালতের কাজ হলো সেই ফাঁকটা পূরণ করা।

অটিস্টিক সন্তানের মা-বাবা যদি শিক্ষকতার চাকরি করেন, এবং সন্তানের যত্নের কারণে তাঁরা দূরের স্কুলে যেতে সমস্যায় পড়েন — তাহলে সেটা এখন থেকে ট্রান্সফারের valid ground হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই রায় শুধু Beauti Baitha-র জন্য নয় — এটা রাজ্যের সেই সব শিক্ষক-অভিভাবকদের জন্য একটা আশার আলো, যারা বছরের পর বছর এই দ্বিধার মধ্যে বেঁচে আছেন।


তথ্যসূত্র: Calcutta High Court Order, WPA 15447 of 2025, Beauti Baitha vs The State of West Bengal & Ors., তারিখ: ২২/০৪/২০২৬

আরো দেখুন: বড় ধাক্কা! পশ্চিমবঙ্গের সব Sponsored স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বাতিল — তাৎক্ষণিক প্রভাব কী হবে?

আরো দেখুন: HS 2026 PPS/PPR আবেদন শুরু ১৫ মে — কীভাবে করবেন, কত টাকা লাগবে, সব জানুন এখনই

Leave a Comment